‘ধুন্ধুমার’ আজকাল মিডিয়ার খুব প্রিয় শব্দ। চ্যানেলে হোক বা খবরের কাগজে, দু’-চারজনের মধ্যে কোথাও সামান্য খুচরো খুনসুটির ঘটনা ঘটলেও অবলীলায় ব্যবহৃত হয় ‘ধুন্ধুমার’, পরিস্থিতি সে যতই হোক তেমন কিছুর যোজনখানেক দূরে।
থানা থেকে খুনের জায়গাটা খুব বেশি হলে পৌনে এক কিলোমিটার। পুলিশ যখন পৌঁছল, রামকমল স্ট্রিটে তখন আক্ষরিক অর্থেই ধুন্ধুমার। দোকানপাট যত ছিল রাস্তার দু’ধারে, ঝাঁপ পড়ছে দ্রুত। উদয় সিং-এর অনুগামীরা জড়ো হয়েছে শয়ে-শয়ে। হাতে লাঠি আর পাকানো বাঁশ। পথচলতি গাড়িঘোড়ায় এলোপাথাড়ি ভাঙচুরে ঘটছে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি চলছে লাগাতার।
এ অবস্থায় যা করতে হয়, যা করা উচিত, করল পুলিশ। বেধড়ক লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস এবং ধাওয়া করে ধরপাকড়, যতজনকে পারা যায়। প্রায় ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় যখন পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্তে এল, ফের শুরু হল যানচলাচল, খবর এল ক্যালকাটা হসপিটাল (বর্তমানের সিএমআরআই) থেকে। উদয় সিং মৃত। নরেশ লড়ছেন, তবে সে লড়াইয়ে হার প্রায় নিশ্চিত। ডাক্তাররা জানিয়েই দিয়েছেন একরকম, আর কয়েক ঘণ্টা বড়জোর।
.
ওয়াটগঞ্জ থানা, কেস নম্বর ২৭৫, তারিখ ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯৭। ধারা, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২/৩০৭/৪২৭/৩৪, খুন, খুনের চেষ্টা, সম্পত্তির ক্ষতি এবং একই অপরাধের উদ্দেশ্যে একাধিকের সম্মিলিত পরিকল্পনা,
২৫ (১বি)(A)/২৭ অস্ত্র আইন, ৩ এবং ৫ বিস্ফোরক পদার্থ আইন।
দুষ্কৃতীদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের পরিণতিতে গুলি, বোমাবাজি এবং খুন। ঘটনা আজ থেকে একুশ বছর আগের। এবং একেবারেই অভূতপূর্ব নয়। দুষ্কৃতীদের এলাকা দখলের লড়াইয়ে এমন ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। পরেও। উপরন্তু এ মামলাতে প্রথাগত রহস্য নেই, কিনারাপর্বে নেই মস্তিষ্কের কসরত।
তবু এ কাহিনি বহু আলোচিত কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে। তথাকথিত ‘ওপেন অ্যান্ড শাট’ মামলাও যে কী গভীর বিড়ম্বনায় কখনও কখনও ফেলে দিতে পারে বাস্তবের গোয়েন্দাদের, কী দুঃসহ পরীক্ষা যে নেয় ধৈর্যের-স্থৈর্যের-মনোবলের, আলোচ্য কেসের ইতিবৃত্ত তার প্রামাণ্য দলিল।
ঘটনায় ফিরি। যেমন ভাবা গিয়েছিল, উদয়ের সঙ্গী হলেন আহত নরেশও। মারা গেলেন বিকেল সোয়া চারটে নাগাদ। ময়নাতদন্তে নতুন কিছু পাওয়ার ছিল না। রুটিন কাটাছেঁড়ার পর রুটিন রিপোর্ট, শরীরের বিভিন্ন অংশে স্প্লিনটারের আঘাতে মৃত্যু।
মারমুখী জনতাকে হঠিয়ে দিয়ে যখন এলাকার দখল নিয়েছে পুলিশ, খবর এল, কাছেই মণিময় ব্যানার্জি রোডে গুরুতর জখম অবস্থায় পড়ে আছে এক যুবক। ওসি ছুটলেন।
ড্রেনের ধারে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা যুবকের শার্ট রক্তে মাখামাখি। পাশে একটা দেশি রিভলভার পড়ে আছে। তুলে দেখা গেল, সেমি-লোডেড। চেম্বারে এখনও তিন রাউন্ড গুলি। স্থানীয় মানুষ এসব ক্ষেত্রে এতটাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন, মুখ খুলতেই চান না কেউ। যাকেই জিজ্ঞেস করা হোক, কাটা রেকর্ডের মতো বাজতে থাকে, ‘আমি তো কিছু দেখিনি সেভাবে।’ স্বাভাবিকই। কে আর চায় খামোখা খুনখারাপির মামলায় জড়াতে? কিছু বললেই পুলিশ বয়ান নেবে। তাতে সইসাবুদ করতে হবে। কোর্টে ডাক পড়বে সাক্ষী দিতে। কী লাভ অত ঝামেলায় গিয়ে? এমনি এমনি কি আর বলে, ‘পুলিশে ছুঁলে…!’
কথাবার্তা বলে তবু জানা গেল যতটুকু, এই আহত যুবককে ধাওয়া করেছিল জনা কুড়ি-পঁচিশের একটা দল। হাতে রিভলভার উঁচিয়ে পালাচ্ছিল যুবক। একটা সময় আর পেরে ওঠেনি দৌড়ে। ধরে ফেলেছিল পিছু-নেওয়া জনতা। কিল-ঘুষি-লাথি কিছুক্ষণ চলেছিল যা খুশি, যেমন খুশি। কৌতূহলী স্থানীয় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকলে ওই অবস্থায় যুবককে ফেলে রেখে উধাও হয়ে যায় ওই কুড়ি-পঁচিশ।
রক্তপাত হয়েছে প্রচুর। তবে যুবক তখনও বেঁচে। গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। তবে তার আগেই জানা হয়ে গেছে পরিচয়। ওসি একঝলক দেখেই চিনেছিলেন। এর নাম বাদল। বাদল মুখার্জি। বেহালার পাঠকপাড়ায় বাড়ি। খিদিরপুর এলাকায় একটা দোকান আছে। আগে একাধিকবার ধরা পড়েছে তোলাবাজি-মারদাঙ্গার অভিযোগে। উদয়ের বিরোধী গোষ্ঠীর মস্তানদের মধ্যে এই বাদল বরাবরই প্রথম সারিতে। নির্ঘাত উদয়কে যারা মারতে এসেছিল, তাদের মধ্যে ছিল। পালাতে পারেনি, মার খেয়েছে বেধড়ক। মরেই যেত আর একটু হলে। অবশ্য চোট-আঘাতের যা অবস্থা, মরে যে যাবে না, গ্যারান্টি নেই কোনও।
বাদল পালাতে পারেনি। কিন্তু যারা পেরেছে, তারা কারা? কোথায় পালাল? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নিয়ে চিন্তিত দেখাচ্ছিল না ওসি-কে। দিনের আলোয় মেরেছে। পালানোর সময় একজন গণপিটুনিতে হাসপাতালে। অন্যদের নাম জানা যাবে দ্রুতই। এবং জানার পর গ্রেফতার তো স্রেফ সময়েরই ব্যাপার। গ্যাং-ওয়ারের ঘটনায় যেমন হয়।
খুনিরা পালিয়ে যাবেই বা কোথায়? আর গেলেই বা কতদিন? এখন ঢের বেশি জরুরি এলাকার আইনশৃঙ্খলার স্থিতাবস্থা, ফের যাতে গোলমাল না বাধে, সেটা নিশ্চিত করা। কোথায় কোথায় পুলিশ পিকেট বসবে আগামী সাতদিন, টহলদারি গাড়ি কোথায় কোথায় নজর রাখবে বেশি, ওসি তৈরি করতে শুরু করলেন ব্লু প্রিন্ট। থানার এত কাছে গুলি-বোমা-খুন, এমনিতেই লজ্জার। ফের একটা কিছু ঘটে গেলে চাকরি নিয়েই টানাটানি হওয়ার সম্ভাবনা।
