শুধু ‘হোলি হ্যায়’ চিৎকারটাই যা বাকি!
আবির হরেক রঙের। লাল-নীল-সবুজ, বেপরোয়া উড়ছে হাওয়ায়। আলিপুর কোর্ট প্রাঙ্গণে উদ্দাম উল্লাসে ঊর্ধ্ববাহু একদঙ্গল যুবক। দুধসাদা পাজামা-পাঞ্জাবি সবার। হাতে ঠোঙা ভরতি আবিরের স্টক অফুরান। অকৃপণ ওড়াচ্ছে জয়োৎসবে। ফুর্তির উপলক্ষ? তিন যুবক, যারা নায়কোচিত ভঙ্গিতে বেরচ্ছে এজলাস থেকে।
একটু আগে রায় ঘোষণা করেছেন বিচারক। ওরা তিনজন বেকসুর খালাস পেয়েছে খুনের মামলা থেকে। বছর চারেক জেলবন্দি থাকার পর। আদালত চত্বরে ভিড় জমানো অনুরাগীরা সাদরে স্বাগত জানাচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্ত অভিযুক্তদের। আবিরে নিমেষে রংবেরং করে দিচ্ছে একে-অন্যের সাদা পাঞ্জাবি।
অতনু দেখছিলেন স্তব্ধ হয়ে। অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়, লালবাজারের গোয়েন্দাবিভাগের হোমিসাইড শাখার তরুণ সাব-ইনস্পেকটর। জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছিল ’৯৭-এর ৬ ডিসেম্বর। রায় বেরল আজ, ২০০১-এর ৩০ অগস্ট। খুনের কিনারা তো ঘটনার দিনই হয়ে গিয়েছিল। মাথা খাটানোর বিশেষ ব্যাপার ছিল না। খুনটা যারা করেছিল, ধরতে খুব একটা কাঠখড় পোড়াতে হয়নি।
কিন্তু এটা কী হল? কী ভাবে সম্ভব? হোমিসাইড শাখার চার্জশিট চিরাচরিত ভাবে নিশ্ছিদ্র হয় বলেই গুরুত্বপূর্ণ খুনের মামলার ভার গোয়েন্দাবিভাগের উপর পড়ে। ডিপার্টমেন্ট ধরেই নেয়, হোমিসাইড কেসটা দেখছে মানে অভিযুক্তদের শাস্তি একশো শতাংশ নিশ্চিত। কোনও গল্পই থাকবে না সাক্ষ্যপ্রমাণের চক্রব্যূহ ভেদের।
এই কেসের ‘মেমো অফ এভিডেন্স’ আর চার্জশিটে মাছি গলার মতো ফাঁকও রাখেননি অতনু। গত রাতেও নিশ্চিত ছিলেন, চার অপরাধীর দোষী সাব্যস্ত হওয়া তো স্রেফ নিয়মরক্ষা। মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা নেই, তবে যাবজ্জীবন তো অবধারিত।
অথচ সব হিসেব উলটে গিয়ে বেকসুর খালাস! তাচ্ছিল্যের হাসি ছুড়ে দিচ্ছেন অভিযুক্তদের আইনজীবী। যাঁর শরীরী ভাষায় দিব্যি পড়া যাচ্ছে, ‘কী? কেমন দিলাম!’ ইচ্ছে করেই গা ঘেঁষে মুঠো মুঠো আবির ওড়াচ্ছে খালাস হওয়া তিন যুবকের চেলাচামুন্ডারা। উড়ে আসছে কান গরম করে দেওয়া বক্রোক্তি, ‘লালবাজার তো ফুটে ফুলকপি রে!’ বাকিরা সুর করে গলা মেলাচ্ছে সোৎসাহে, ‘ফুটে কী? ফুটে ফুলকপিইইই!’
ক্ষোভ-দুঃখ-অপমান একত্রে সঙ্গী হলে যা হয়, মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে ছত্রিশ বছরের অতনুর। কালকের খবরের কাগজে ফলাও করে বেরবে এই রায়, ‘পুলিশি তদন্তে ফাঁক, মুক্তি পেল উদয় সিং হত্যামামলার অভিযুক্তরা, তীব্র ভর্ৎসনা তদন্তকারী অফিসারকে’ ইত্যাদি প্রভৃতি। ডিপার্টমেন্টে মুখ দেখাবেন কী করে? পরিশ্রমী এবং অনুসন্ধিৎসু স্বভাবের জন্য ওসি হোমিসাইড বিশেষ স্নেহ করেন অতনুকে। জটিল মামলা এলে খোদ ডিসি ডিডি প্রায়ই বলে থাকেন, ‘এটা অতনু করুক!’ এ যা হল, কেরিয়ারেই তো কালো দাগ পড়ে গেল!
.
দুম! দ্রাম!
প্রথমে বিকট শব্দে গোটাকয়েক বোমা। ধোঁয়ায় ধোঁয়াক্কার চারদিক। তারপর গুলি কয়েক রাউন্ড।
ফ্ল্যাশব্যাকে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯৭। সকাল দশটা। ওয়াটগঞ্জ থানা এলাকার রামকমল স্ট্রিটের লাগোয়া রকে বসেছিলেন উদয় সিং। রোজকার মতো আড্ডা দিচ্ছিলেন চায়ের কাপ হাতে। পাশে সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী নরেশ, কল্যাণ, বোম্মাইয়া। উলটোদিকের ফুটপাথে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছিলেন উদয়ের ছোটভাই রঞ্জিত আর স্থানীয় যুবক নিতাই, যিনি উদয়ের ব্যবসায় দীর্ঘদিনের কর্মী।
হঠাৎই হাতে বোমা-পিস্তল নিয়ে আবির্ভাব চার যুবকের। সোজা উদয়ের দিকে ধেয়ে এসে বোমা-গুলির দুম-দ্রাম, নির্বিচারে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল, বোমা নয়। একাধিক স্প্লিন্টার ঢুকল উদয় আর নরেশের শরীরে। রক্তাক্ত শরীর দুটো ঢলে পড়ল মাটিতে। অল্পের জন্য অক্ষত থাকলেন আড্ডার অন্য দুই সঙ্গী, কল্যাণ আর বোম্মাইয়া।
আতঙ্কের ঘোর কাটিয়ে উলটোদিকের ফুটপাথ থেকে যতক্ষণে রঞ্জিত-নিতাই ছুটে এসেছেন রাস্তার এপারে, গুলি ছুড়তে ছুড়তে তখন ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে চার আততায়ী। ঘটনা যেখানে ঘটছে, সে-রাস্তা দিনভর ব্যস্ত থাকে লোকজনের আনাগোনায়। তার উপর সময়টা ভাবুন, সকাল দশটা! জনতা ধাওয়া করল ঘাতক চতুষ্টয়ের পিছনে। তিনজন পালাল নাগালের বাইরে। চতুর্থ আততায়ী পিছিয়ে পড়ল কিছুটা, পিছনে রে-রে করে ছুটে আসা দঙ্গলটার সঙ্গে কমতে থাকল ব্যবধান।
উদয় আর নরেশের রক্তে ভেসে যাওয়া শরীর দুটো যখন স্থানীয়রা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে তুলছেন, ততক্ষণে আশেপাশে খবর ছড়িয়ে পড়েছে উল্কাগতিতে। উদয় সিং বোমার আঘাতে গুরুতর আহত, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। সেই উদয় সিং, যার অঙ্গুলিহেলনে চালিত হয় বন্দর এলাকার একটা বড় অংশের অন্ধকার জগৎ। স্থানীয়দের কাছে যিনি হয় ‘উদয় ভাই’, নয় ‘উদয় ভাইয়া’।
সোয়া দশটা নাগাদ ফোনে খবর এল ওয়াটগঞ্জ থানায়। উদয় সিং-এর উপর গুলিবোমার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে এলাকায়, আন্দাজ করতে তিরিশ সেকেন্ডের বেশি লাগল না ওসি-র। প্রথম ফোনটা করলেন ডিসি পোর্টকে, দ্বিতীয়টা লালবাজার কন্ট্রোল রুমে। ডিসি রওনা হলেন রামকমল স্ট্রিটের উদ্দেশে। পোর্ট ডিভিশনের সমস্ত থানার ওসিদের ওয়ারলেস মারফত জরুরি নির্দেশ পাঠালেন ডিসি হেডকোয়ার্টার, ‘স্পটে যান।’ গার্ডেনরিচ-একবালপুর-মেটিয়াবুরুজ-নর্থ পোর্ট-ওয়েস্ট পোর্ট-সাউথ পোর্ট, সব থানার গাড়ি ছুটল। হাতের কাছে যা ফোর্স-অফিসার আছে, তাই নিয়ে। লালবাজার থেকেও তড়িঘড়ি ওয়াটগঞ্জে রওনা দিল RAF।
