যেন নাম-কা-ওয়াস্তে নিযুক্ত হয়েছেন অভিযুক্তের তরফের আইনজীবী। যাঁর ভূমিকা বস্তুত ক্রীড়নকের। যিনি কখন কী বলবেন, কোন যুক্তির প্রতিরোধে তুলবেন কোন তর্ক, কোন সওয়ালের প্রত্যুত্তরে আশ্রয় নেবেন কোন জবাবের, সব তো ঠিক করে দিচ্ছেন অভিযুক্ত নিজেই। রোশনলাল স্বয়ং। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েই হোক বা বা কোর্ট লক-আপে বন্দি অবস্থায়। অত্যুৎসাহে কখনও কখনও আইনজীবীকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে তর্ক জুড়ছেন। থামাতে হচ্ছে বিচারককে। কখনও দু’ পক্ষের যুক্তিজাল শুনতে শুনতে ভ্রুকুঞ্চিত। কখনও আবার ফেটে পড়া অট্টহাস্যে। মামলার চড়াই-উতরাইয়ে অশেষ আগ্রহী কখনও, কখনও নিরাসক্ত নিস্পৃহ। এক উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিককে আদালতে দাঁড়িয়েই কথায় কথায় বলেছিলেন, দিব্যি উপভোগ করছেন ‘… fun of a trial.’
সমাজের সর্বস্তরে প্রবল কৌতূহল উৎপন্ন হয়েছিল এই মামলার গতিপ্রকৃতি বিষয়ে। বিচার চলাকালীন রোশনলালের আচরণে সেই ঔৎসুক্য তীব্রতর হয়েছিল। বিচারের দিনগুলিতে আলিপুরের দায়রা আদালতের স্বল্পপরিসর বিচারকক্ষে পা রাখার জায়গা হত না। এজলাসে ঠাসা ভিড় থাকত আমজনতার। যাঁদের যত না কৌতূহল ছিল বাদী-বিবাদীর প্রশ্নোত্তরে, তার ঢের বেশি ঔৎসুক্য ছিল রোশনলালকে একবার চোখের দেখা দেখায়। সেই লোকটিকে দেখায়, যে অচিন্তনীয় নৃশংসতায় হত্যা করেছে স্ত্রী-শাশুড়ি-শ্যালিকাকে। এবং অন্তত বহিরঙ্গে যাঁর বিন্দুমাত্র বহিঃপ্রকাশ নেই অনুতাপ-অনুশোচনার। বরং মরিয়া প্রয়াস রয়েছে নিজেকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করার।
নিধননাট্যের খুঁটিনাটি কাটাছেঁড়ার পর রায় যেদিন ঘোষিত হল, আলিপুর কোর্টের ভিড় সেদিন কল্পনাতীত মাত্রাছাড়া। পরিস্থিতি আঁচ করে আগেভাগেই মোতায়েন বাড়তি পুলিশ। কৌতূহলী জনজোয়ার নিয়ন্ত্রণে নজিরবিহীনভাবে আদালতের বাইরের রাস্তায় ঘোড়সওয়ার পুলিশের দাপাদাপি। যানবাহনের গতি বাধ্যতই শ্লথ, সংলগ্ন রাস্তাগুলিতেও।
জুরিদের মতামতের সঙ্গে সহমত হয়ে বিচারপতি কে এন ভট্টাচার্য যখন ঘোষণা করতে চলেছেন চূড়ান্ত রায়, উত্তেজনার পারদ তখন বেহিসেবি রকমের ঊর্ধ্বমুখী। ‘Taking into consideration the facts and circumstances of the case…’ বিচারসিদ্ধান্ত পাঠ যখন শুরু হল, এজলাসে নীরবতা নিশ্ছিদ্রতম।
‘As the accused deliberately and in cold blood murdered Jashoda Sharma, Moni Sharma and Bela Sharma and as there are no extenuating circumstances, the only sentence that can be awarded to the accused in this case is death. I, therefore, sentence the accused Roshanlal to death and direct that he be hanged by the neck till he is dead…’
ফাঁসির হুকুম শোনার পর যখন জনতার সহর্ষ উল্লাস এজলাসকক্ষে, মুহূর্তের জন্য বিচলিত দেখিয়েছিল রোশনলালকে। কিন্তু ওই মুহূর্তের জন্যই। সামলে উঠে ক্ষণিক পরেই দৃপ্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন আইনজীবীকে, ‘Let’s appeal to higher courts.’ পাওলিন দোষী সাব্যস্ত হননি। আদালতের বিচারে বেকসুর খালাস।
উচ্চতর আদালতে রোশনলাল আবেদন করেছিলেন শাস্তি হ্রাসের। কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি স্যার ট্রেভর হ্যারিস পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছিলেন সে আর্জি। বড়লাটের শরণাপন্ন হয়েছিলেন রোশনলাল। ক্ষমাভিক্ষা করেছিলেন এবং প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। ‘ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা’, সেখানে নিষ্ঠুর হতে পেরেছিলেন বড়লাট। অপরিবর্তিত থেকেছিল মৃত্যুদণ্ডাদেশ। যা কার্যকর হয়েছিল ১৯৫১ সালের ২০ অক্টোবরের উষাকালে।
হাতে গোনা কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী কারাকর্মীর বয়ান অনুযায়ী, ফাঁসিকাঠের পাটাতনে পা রাখার ঘণ্টাখানেক আগেও রোশনলাল ছিলেন শান্ত-স্থিতধী। বলেছিলেন, ‘যা করেছি, তাতে ফাঁসিই উপযুক্ত শাস্তি।’
ডক্টর জেকিল।
কিন্তু মৃত্যুমুহূর্ত যখন উপস্থিত হয়েছিল, সহসা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, ‘আমি হিন্দু। আমি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি। আমার মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আমি হাজারবার জন্ম নেব।’
মিস্টার হাইড।
কী হয়েছিল মুন্না-মুন্নির? রোশন-মণির দুই সন্তানের? ‘Society for the Protection of Children in India’ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দুই শিশুর পরিচর্যার। মুন্না এবং মুন্নি প্রত্যক্ষদর্শী ছিল দিদা যশোদাদেবীর খুনের। শক-এর তীব্রতায় বাক্শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল মুন্না। কেউ কাছে এলেই পরিত্রাহি চিৎকার করে কাঁদত শুধু। কিছু খেতে চাইত না। ১৯৫০ সালে মারা গিয়েছিল ক্যাম্পবেল হাসপাতালে। বাঁচেনি মুন্নিও। রোগজীর্ণ অবস্থায় দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিল এক বছর পর।
আরও লেখাই যায়। লিপিবদ্ধ তো রয়েইছে দুই শিশুর তিলেতিলে মৃত্যুযাপনের রোজনামচা। লেখাই যায়, কীভাবে আক্ষরিক অর্থেই জীবন্মৃত হয়ে গিয়েছিল অভিভাবকহীন দুই শিশু। লেখাই যায় আরও।
থাক। মৃত্যু-রোমন্থন থাক।
‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে?’
২.০২ মেলাবেন তিনি মেলাবেন
[উদয় সিং হত্যা
অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়, গোয়েন্দাবিভাগের সহ নগরপাল। ২০০৪ সালে ভারত সরকারের প্রদত্ত ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল’-এ সম্মানিত। ২০০৯ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ‘প্রশংসা পদক’। কর্মক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রশংসনীয় দক্ষতার জন্য ‘রাষ্ট্রপতি পদক’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে।]
