অপারেশন থিয়েটার, না কসাইখানা? দৃশ্যপট বলবে, দ্বিতীয়টাই। কেসের কিনারা হওয়ার পরে ওই ঘরের ফরেনসিক পরীক্ষা চলাকালীন উপস্থিত ছিলেন, এমন এক পদস্থ অফিসারের ভাষায়, ‘The room bore a horrid look. It had the impression of a butcher’s shop kept uncleaned with blood and fat and pieces of flesh sticking to the floor and wall, stinking with putrid smell.’
রোশনলাল চপার দিয়ে গুঁড়োগুঁড়ো করে দিলেন বেলার হাড়। হাতে উঠে এল surgical knife। টুকরো টুকরো করে কাটলেন বেলার দেহ। দেহাংশ মুড়ে রাখলেন রেশনের ব্যাগে। তার দিয়ে বাঁধলেন ব্যাগের মুখটা। জল দিয়ে ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করলেন মেঝেতে বইতে থাকা রক্তস্রোত, যতটা সম্ভব। টুকরো হাড়, অস্থি-মজ্জা-চর্বি, মৃতার শরীর থেকে নির্গত বর্জ্য তরল.. সব মিলিয়ে ওই ঘর তখন চূড়ান্ত বিবমিষা উদ্রেককারী। কসাইখানাই!
বেলার দেহাংশ ব্যাগে ভরে মুন্না-মুন্নিকে নিয়ে রোশনলাল ঘর তালাবন্ধ করে বেরিয়ে এলেন রাত্রি দশটা নাগাদ। যশোদার লাশ পড়ে রইল ছাদে। রোশনলাল ভেবেছিলেন, আগে তো বেলার গতি করা যাক, যশোদার কাটাছেঁড়া কাল করা যাবে। তারপর ধোয়ামোছা সাফসুতরো করবেন ঘর। তালাবন্ধই থাকছে। কেউ ঢোকার নেই।
ফিরলেন কোয়ার্টারে। হাসপাতালেরই এক ইলেকট্রিক মেকানিকের জিম্মায় রাখলেন দুই শিশুকে। বললেন, ‘কিছু সমস্যা হয়েছে। ওদের মা হাসপাতালে। দিনদুয়েকের জন্য তোমার কাছে থাক।’
পাওলিনকে টেলিগ্রাম করে দিয়েছিলেন রোশনলাল ১৩ তারিখ দুপুরেই, ‘Come quickly’। পাওলিন রাঁচি থেকে এসে পৌছলেন ১৫ তারিখের কাকভোরে। রোশনলাল স্টেশনে গেলেন আনতে। সঙ্গে রেশনের ব্যাগ। যাতে বেলার দেহাংশ। পাওলিনকে নিয়েই সরাসরি পৌঁছলেন দক্ষিণ কলকাতার লেকে।
আজকের লেকের যে সুসজ্জিত পরিপাটি রূপ দেখে আমি-আপনি অভ্যস্ত, সূর্যের আলো ফুটতে না ফুটতেই মর্নিং ওয়াকে আসা নারীপুরুষের যে জনস্রোত দেখে চোখ সয়ে গেছে, তেমনটা ছিল না তখন। শহরবাসী আসতেন প্রাত্যহিক, তবে কাতারে কাতারে নয়। স্বল্পসংখ্যায়। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কাঠের বেঞ্চ যা ছিল, তার সংখ্যাও খুব বেশি নয়। শান্ত সরোবর ঘিরে গাছগাছালির অবশ্য তেমন অভাব ছিল না। কোলাহলশূন্য পরিবেশ। প্রকৃতি অবকাশই পেত না পরিশ্রান্ত হওয়ার।
নির্জন জায়গা দেখে সবে ব্যাগটা ফেলতে যাবেন জলে, ত্রিলোচন নামের এক নিরাপত্তাকর্মীর নজরে পড়ে গেলেন রোশনলাল, ‘কেয়া ফেকতা হ্যায় বাবু, কেয়া ফেকতা হ্যায়?’
বিপদ বুঝে রোশনলাল দৌড়লেন ব্যাগ ফেলে। ধাওয়া করে ধরে ফেললেন নিরাপত্তাকর্মী। ব্যাগ থেকে আবিষ্কৃত হল দেহাংশ। খবর গেল টালিগঞ্জ থানায়। পুলিশ এল। রোশনলাল-পাওলিনকে নিয়ে যাওয়া হল থানায়। তারপর লালবাজারে।
একঝাঁক গোয়েন্দাদের জেরার মুখোমুখি হয়েও রোশনলাল প্রাথমিক ভাবে না ভাঙলেন, না মচকালেন। আজগুবি গপ্পো ফাঁদলেন একের পর এক। ‘খুন আমি করিনি। করেছেন পি কে কাপুর বলে এক ব্যবসায়ী, যাঁর সঙ্গে বেলার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ঘনিষ্ঠতার ফলে বেলা গর্ভবতী হয়ে পড়েন। কাপুর নামের ভদ্রলোক বেলাকে বিয়ে করায় নারাজ ছিলেন। তিনিই খুনটা করেছেন। কাপুর আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত। ওঁর কথায় ব্যাগটা লেকের জলে ফেলতে এসেছিলাম। খুনটা আমি করিনি।’ উন্মাদেও বিশ্বাস করবে না এই গাঁজাখুরি গল্প, তবু একচুলও নড়ছিলেন না মেজর রোশনলাল।
মতিলাল নেহরু রোডের ফ্ল্যাটের ছাদ থেকে যশোদার দেহ উদ্ধারের পরেও রোশনলাল ছিলেন অবিচলিত।
—মণি কোথায়? আপনার স্ত্রী?
—আমি কী করে বলব? আমাকে বলে তো যায়নি। আমার ওর চরিত্রের ব্যাপারে বরাবরই সন্দেহ হত। অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে গেলে অবাক হব না।
ফ্ল্যাটে পাওয়া গিয়েছিল বিভিন্ন সময়ে দিদি যশোদাকে লেখা ভীমপ্রসাদের চিঠি। পুলিশ টেলিগ্রাম করে ডেকে পাঠাল ভীমপ্রসাদকে। যিনি কলকাতায় এলেন সাম্প্রতিক অতীতে দিদির লেখা চিঠিগুলি নিয়ে। যার মধ্যে একটা ..‘মণি দুই সপ্তাহ আগে রোশনলালের সঙ্গে কাশ্মীর গিয়েছিল ..’
সেই চিঠির ব্যাখ্যা যখন চাওয়া হল, রোশনলাল দেখলেন, মিথ্যাচারে লাভ নেই আর। অস্বস্তির হাসি হেসে বললেন ‘Ok gentlemen, enough of it. No more waste of time. I have murdered Moni and left her buried under the sand at Puri.’ যখন স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, কৃতকর্মের জন্য লেশমাত্র অনুতাপের আভাসও খুঁজে পাননি গোয়েন্দারা। সাধে কী লিখেছি আগে, গবেষণাযোগ্য চরিত্র!
রোশনলালকে সঙ্গে নিয়ে গোয়েন্দারা পাড়ি দিলেন পুরী। বয়ান অনুযায়ী হোটেলের পাশের সেই কুয়ো থেকে উদ্ধার হল মণির স্লিপার-চুড়ি-নেকলেস, যা চিহ্নিত করলেন ভীমপ্রসাদ। বালির স্তূপের ভিতর থেকে উদ্ধার হল মণির দেহাবশেষ। হাড়গোড়ই মূলত। মণিকে নিয়ে যে ওই হোটেলে উঠেছিলেন রোশনলাল, তার সাক্ষী তো ছিলেনই হোটেলকর্মীরা। পারিপার্শ্বিক প্রমাণের আর বাকি ছিল না কিছু।
চার্জশিট জমা পড়ার পর যথানিয়মে শুরু হল বিচার। আদালতকক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সাক্ষ্যদান এবং সওয়াল-জবাবের প্রক্রিয়ায় উত্তেজনার উপাদান থাকে না সিংহভাগ ক্ষেত্রে। রোশনলালের মামলার বিচারপর্ব অবশ্য দেখা দিল ব্যতিক্রমী চেহারায়। যেমনটা আদালতে অদৃষ্টপূর্ব।
