—ওকে কাশ্মীরেই রেখে এলাম কিছুদিনের জন্য।
—কেন?
রোশনলাল বোঝানোর চেষ্টা করলেন যশোদাকে, যত শীঘ্র সম্ভব কলকাতায় ফিরিয়ে আনবেন মণিকে। বললেন, বিয়ের পর নববধূর মুখই দেখেননি তাঁর মা। তা ছাড়া মায়ের শরীরটা একেবারেই ভাল যাচ্ছে না। গিয়েই চলে এলে বড় বিসদৃশ দেখায়। শত হোক, রাজকুলবধূ, সামাজিকতারও দায় থাকে একটা। দায় থাকে আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে ন্যূনতম পরিচিতির।
দিনের পরে দিন যায়। সপ্তাহ যায়। আশঙ্কা আর অস্বস্তি ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছিল যশোদার। একদিন রোশনলালকে চেপে ধরলেন, ‘মণিকে নিয়ে এসো এবার। আমার কিচ্ছু ভাল লাগছে না।’
—আর সপ্তাহখানেক পরে কাজের চাপ কমলেই নিয়ে আসব। আপনি অযথা চিন্তা করছেন। আমাদের বাড়িতে আপনার মেয়ের কোনও অযত্ন হবে না, নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
নিশ্চিন্ত থাকতে বললেই কি আর থাকা যায়? যশোদা পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘বেশ তো, কিন্তু চিঠি লিখছে না কেন? এতদিন হয়ে গেল, একটা চিঠিও লিখবে না মেয়ে? সেই মেয়ে, যে মা-অন্ত প্রাণ একরত্তি বয়স থেকে?’
এ প্রশ্নের উত্থাপন একটা সময় অবধারিতই, বিলক্ষণ জানতেন রোশনলাল। প্রস্তুত রেখেছিলেন উত্তর।
—আসলে কী হয়েছে জানেন মা, কাশ্মীরের নিয়ম বাকি দেশের মতো নয়। ওখান থেকে ইংরেজি বা হিন্দিতে চিঠি পাঠানো যায় না। একমাত্র উর্দুতেই ও রাজ্য থেকে চিঠি পাঠানো যায়। মণির উর্দু শেখার ব্যবস্থা আমি করেই এসেছি এবার। ওখানের এক উর্দুর অধ্যাপক আমার বহুদিনের পরিচিত। উনি এক সপ্তাহ হল মণিকে উর্দু শেখানো শুরু করেছেন। চিঠি এল বলে।
যশোদা শুনলেন। এবং বিশ্বাস করার কণামাত্র কারণও খুঁজে পেলেন না। জামাতার বহুরূপী চরিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা হয়ে গিয়েছে ততদিনে। সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের থেকে যে ঘোর দূরবর্তী রোশনলালের অবস্থান, সেটা বুঝে গিয়েছিলেন। মুখের উপর মিথ্যেবাদী বলতে বাধে। যশোদা তাই বাক্যব্যয় করলেন না বিশেষ। রাত্রি গভীর হলে চিঠি লিখতে বসলেন ছোটভাই ভীমপ্রসাদকে। যাঁর জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল।
ভাইকে লেখা দিদির চিঠির অংশবিশেষ রইল।
স্নেহের ভীম,
আমার আশীর্বাদ নিয়ো। মণি দুই সপ্তাহ আগে রোশনলালের সঙ্গে কাশ্মীর গিয়েছিল। রোশন ন’দিন পরে ফিরে এসেছে মণিকে কাশ্মীরেই রেখে। মণি খুব অসুস্থ ছিল যাওয়ার সময়। আট মাস হয়ে গেছে গর্ভবতী। এখনও একটাও চিঠি লেখেনি। রোশন বলছে, উর্দু ভাষা ছাড়া ওখান থেকে চিঠি লেখা যায় না। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। তুমি একটু গণনা করে তাড়াতাড়ি জানিয়ো, মণি কী অবস্থায় আছে, কেমন আছে? ও ভাল আছে তো? আমি খুব কষ্টে আছি। দিনরাত শুধু কাঁদি। খাওয়াদাওয়া ত্যাগ করেছি। তুমি তাড়াতাড়ি জানিয়ো গণনা করে, মণি কেমন আছে। খুবই দুশ্চিন্তায় সময় কাটছে। তোমার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।
আশীর্বাদিকা দিদি
শাক দিয়ে মাছ ঢাকারও একটা সময়সীমা থাকে। সপ্তাহে দিনদুয়েক মনোহরপুকুর রোডের ফ্ল্যাটে এসে যথাসম্ভব স্বাভাবিক আচরণ করতেন রোশনলাল। এবং যখনই আসতেন, উদ্বিগ্ন যশোদা আকুল উৎকণ্ঠায় চেপে ধরতেন জামাতাকে, ‘মণিকে নিয়ে এসো এবার? বাচ্চার জন্মের সময় তো হয়ে এল।’ সন্দিগ্ধ বেলা প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করে দিতেন জামাইবাবুকে, ‘দিদি চিঠি লিখছে না কেন? দিদি ভাল আছে তো?’
রোশনলালের দুঃসহ ঠেকছিল এই অতলান্ত চাপ। যা থেকে পরিত্রাণের একটাই উপায় ছিল। সেটাই কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিলেন রোশনলাল।
১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৯। বিকেল পাঁচটা নাগাদ মতিলাল নেহরু রোডের চারতলার ফ্ল্যাটে গেলেন রোশনলাল। বেলা অফিসে। সদ্য চাকরি পেয়েছেন বেঙ্গল টেলিফোনস-এ। ফিরবেন ছ’টার পরে। ফ্ল্যাটে যশোদা এবং রোশনলাল-মণির দুই সন্তান, মুন্না এবং মুন্নি। খেয়ালখুশিতে খেলছে দু’জন। যেমন খেলে রোজ।
যশোদা চা করে আনলেন রোশনলালের জন্য। ফের মণি-প্রসঙ্গ পাড়তে যাবেন, এমন সময় রোশনলাল ঝাঁপিয়ে পড়লেন শাশুড়ির উপর। গলা টিপে ধরলেন। সবলদেহী রোশনলালের বিরুদ্ধে ক্ষণস্থায়ী হল মধ্যপঞ্চাশের যশোদার যৎসামান্য প্রতিরোধ। প্রাণবায়ু নিঃশেষিত হল। মুন্না এবং মুন্নি আতঙ্কে বাক্রুদ্ধ হয়ে রইল। যশোদার দেহ ছাদে নিয়ে গেলেন রোশনলাল। মাদুরচাপা দিয়ে রাখলেন এক কোণায়। মুন্না-মুন্নিকে চকোলেট আর খেলনা দিয়ে খানিক শান্ত করে অন্য একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন। এবং অপেক্ষায় থাকলেন বেলার ফেরার। যশোদার ছোটমেয়েকে বাঁচিয়ে রাখার ঝুঁকি নেওয়া চলে না।
বেলা অফিস থেকে ফিরলেন সাড়ে ছ’টা নাগাদ। অপেক্ষায় ছিলেন রোশনলাল। ঘরে ঢুকতেই ভারী হাতুড়ি দিয়ে পিছন থেকে মারলেন মাথায়। আকস্মিক আঘাতের তীব্রতায় জ্ঞান হারালেন বেলা। এরপর সংজ্ঞাহীন বেলার গলা টিপে খুন করা তো কয়েক মিনিটের ব্যাপার মাত্র। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উপর্যুপরি দুটো খুনের পর রোশনলাল শুরু করলেন অধীত চিকিৎসাবিদ্যার নিখুঁত প্রয়োগ।
প্রস্তুতিতে কোনও ফাঁক রাখেননি রোশনলাল। নিয়ে এসেছিলেন চপার, দা, তার, দড়ি, রেশনের ঢাউস ব্যাগ, ডাক্তারির ছুরি-কাঁচি। ভেবেই রেখেছিলেন, ছাদের উপর পড়ে থাকা কাঠের পাটাতনটা ব্যবহার করবেন যথাসময়ে। করলেনও। পাটাতন নিয়ে এলেন ছাদ থেকে। রাখলেন বিছানার উপর। বেলার মৃতদেহ শুইয়ে দিলেন কাঠের উপর। ‘অপারেশন থিয়েটার’ সম্পূর্ণ।
