রোশনলালের প্রতি মণির ভালবাসা ছিল নিখাদ। স্বামীর বিশ্বাসভঙ্গে চিন্তাতীত আঘাত পেয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু সে আঘাত মণির মানসিক কাঠিন্যের বুনিয়াদ অনেকটাই পোক্ত করে দিয়েছিল। রোশনলালকে বললেন, প্রায় তিন বছর স্বামী-স্ত্রী হিসাবে একত্রে বসবাসের পর, দুই সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর এবং তৃতীয়বার সন্তানসম্ভবা হওয়ার পরও যদি বিয়েকে আইনি বৈধতা দেওয়া নিয়ে এতটা দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন রোশনলাল, তা হলে তো এই সম্পর্কের কোনও মানেই দাঁড়ায় না। পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই অনাচারের বিচার চাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না আর। নিজের মানসম্মানের দায়িত্ব তখন রোশনলালকে নিজেকেই নিতে হবে।
রোশনলাল সব শুনলেন চুপ করে। এই প্রথম স্বামীর শরীরী ভাষায় অনুতাপের চিহ্ন দেখলেন মণি। দেখলেন, চোখ আর্দ্র হয়ে এসেছে রোশনলালের। মণিকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, ‘বেশ, তুমি যা চাইছ, তা-ই হোক। এতে যদি তুমি শান্তি পাও, তবে তা-ই হোক। আমি রেজিস্ট্রেশনের দিনক্ষণ ঠিক করছি। কাশ্মীরের বাড়িতে আজই টেলিগ্রাম করব। আমাদের রাজবাড়িতেই রেজিস্ট্রেশন হবে বিয়ের। তারপর ধুমধাম করে অনুষ্ঠান। তুমি শুধু আমাকে আগের মতোই ভালবেসো।’ শোনামাত্র মণি কেঁদে ফেললেন স্বামীর বুকে মাথা রেখে। প্রেম বড় বিষম বস্তু।
রোশনলাল ভক্তিনিষ্ঠ প্রণাম করলেন শাশুড়িকে। চোখের জল বাধা মানল না যশোদারও। দিদির মানসিক কষ্টের অবসানের সম্ভাবনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন বেলাও।
দিনক্ষণ স্থির হল কাশ্মীর যাওয়ার। মণি যখন মা-কে প্রণাম করে বেরচ্ছেন রোশনলালের সঙ্গে, যশোদাদেবী ঘোরতর দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, মেয়ের সঙ্গে এই তাঁর শেষ দেখা।
হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে রোশনলাল মণিকে বললেন, ‘চলো দু’-একদিনের জন্য পুরী ঘুরে আসি। সেখান থেকে কাশ্মীর যাব।’ হঠাৎ এই প্ল্যান পরিবর্তন? জানতে চাইলেন মণি। রোশন হাসলেন, ‘তুমি কি এখনও আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না? আমরা কোথাও কখনও একসঙ্গে বেড়াতে যাইনি। তাই ভাবলাম, দু’দিন সমুদ্রের ধারে একটু সময় কাটাই দু’জনে। আমি তোমাকে সারপ্রাইজ় দিতে চেয়েছিলাম। তুমি রাজি হবে না জানলে টিকিট কাটতাম না।’
মণি রাজি হলেন রোশনের কথায়। সন্দেহ হয়েছিল কি কিছু? হয়তো হয়েছিল। তবু রাজি হয়েছিলেন, বহুকাঙ্ক্ষিত রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে পাছে মত বদলান রোশন, সেই আশঙ্কাতেই সম্ভবত। ট্রেনে উঠে বসলেন দু’জনে।
পুরী। আজকের পুরীর সঙ্গে সে-কালের পুরীর তফাত ছিল আকাশপাতাল। শহরের যত্রতত্র হোটেল গজিয়ে ওঠেনি গায়ে গা লাগিয়ে। হরেক পশরা সাজিয়ে তট বরাবর মাথা তোলেনি অসংখ্য দোকানপাট। পর্যটকদের ভিড়ে তখন অষ্টপ্রহর থইথই করত না সমুদ্রতট। নির্জনতাই নিরঙ্কুশ।
সমুদ্রের ধারেই একটি সাদামাটা ছিরিছাঁদহীন হোটেলে ঘর ভাড়া নিলেন রোশনলাল। হোটেলের রেজিস্টারে মিথ্যে নাম-ঠিকানা লিখলেন নিজের আর মণির।
সমুদ্রতীরে পাশাপাশি বসে সন্ধেটা দিব্যি কাটল দু’জনের। হোটেলে ফেরার আগে রোশন প্রস্তাব দিলেন, ‘চলো, একটু হেঁটে আসি।’
মণি তখন আট মাসের গর্ভবতী। বালিপথ ধরে হাঁটাহাঁটির ইচ্ছে ছিল না বিশেষ। তবু রোশনকে বিমুখ করতে মন চাইল না। স্বামীর হাত ধরে ধীরপায়ে হাঁটা দিলেন। যখন ফিরে আসছেন, পেটে ব্যথা শুরু হয়েছে তীব্র। রোশন যন্ত্রণাকাতর স্ত্রী-কে ভরসা দিলেন, ‘এ সময় এমন হয়। এই অবস্থায় এতটা না হাঁটলেই বোধহয় ভাল হত। আমারই দোষ। যাক গে, চিন্তা কোরো না। স্বামী যখন ডাক্তার, চিন্তা কীসের? হোটেলে ফিরেই ব্যথা কমার ওষুধ দিচ্ছি।’
ওষুধ দিলেন রোশনলাল। ডাক্তারি ব্যাগ থেকে বার করলেন ইনজেকশন। বিছানায় শুয়ে তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন মণি, ‘কই, ওষুধটা দাও, খুব কষ্ট হচ্ছে!’ মণির হাতে সূচ ফোটালেন রোশনলাল। সূচ বেয়ে তরল প্রবেশ করল মণির শরীরে। ছড়িয়ে গেল শিরা-উপশিরায়। মরফিয়া!
রোশনলাল মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন মণির, ‘ওষুধ পড়েছে, দেখো এবার, যন্ত্রণা কমবে। ঘুম এসে যাবে।’
ঘুম এল মণির। গভীর ঘুম। রোশনলাল নিজের গলার স্কার্ফটা খুললেন। পেঁচিয়ে ধরলেন ঘুমন্ত মণির গলায়। সর্বশক্তি দিয়ে। শ্বাসরোধ করে খুন। একটা নয়, দুটো। মণির গর্ভস্থ সন্তানের দিনের আলো দেখার সময় তো হয়েই এসেছিল প্রায়।
রাত বাড়তে মণির দেহ একটা বেডশিটে মুড়ে বেরলেন ঘর থেকে। নিরাপত্তারক্ষীর বালাই থাকে না এসব সস্তার হোটেলে। অর্ধেক ঘরও খালি পড়ে থাকে। কেউ কারও খোঁজ রাখে না। নিরাপদে বেরিয়ে গেলেন গেট দিয়ে, দেহ পুঁতে দিলেন সমুদ্রতটে বালির স্তূপের নীচে। যেটা চিহ্নিত করে রেখেছিলেন বিকেলেই। মণির স্লিপার, চুড়ি, মুক্তোর নেকলেস এবং ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ফেলে দিলেন হোটেল-সংলগ্ন একটা মজে যাওয়া কুয়োয়।
ফিরে এলেন ঘরে, এবং নিজের জিনিসপত্র নিয়ে সন্তর্পণে বেরিয়ে গেলেন হোটেল থেকে। রাত তখন সোয়া তিনটে। কোনও সাক্ষী থাকল না গভীর রাতের অন্তর্ধানের। সমুদ্র ছাড়া কে-ই বা জেগে থাকে ওই নিশুত রাতে?
রোশনলাল ফিরে এলেন কলকাতায়। মতিলাল নেহরু রোডের ফ্ল্যাটে গেলেন তারও সপ্তাহখানেক পরে। জামাইয়ের সঙ্গে মেয়েকে না দেখে যশোদা অবাক, ‘ভালয় ভালয় সব মিটে গেছে তো? মণি কই?’
