প্রতি পদে রোশনলাল বুঝিয়ে দিতে লাগলেন, মাঝে মাঝে শরীরী চাহিদা মেটানোর ভোগ্যবস্তুর বেশি মর্যাদা তিনি মণিকে দিতে নারাজ। মণি যখনই বিয়ের রেজিস্ট্রির কথা তুলতেন, নির্বিচার গালিগালাজ করতেন রোশনলাল। সমাজের চোখে সুভদ্র হিসাবে পরিচিত ডাক্তারবাবুর মুখ থেকে অকথা-কুকথার বন্যা বয়ে যেত। কথায় কথায় মণির গায়ে হাত তোলা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল রোশনলালের। একটা পর্যায়ের পর মণি বুঝে গিয়েছিলেন, বিবাহিতা স্ত্রী-র স্বীকৃতি পাবেন না কোনওদিনই। কানাঘুষোয় শুনতেন অন্য একাধিক নারীর সঙ্গে স্বামীর ঘনিষ্ঠতার কথা। এমনও হত, রাতের পর রাত বাড়িই ফিরতেন না রোশনলাল। প্রশ্ন করলে বরাদ্দ থাকত উপেক্ষা এবং ঔদাসীন্য।
বিনিদ্র রাতে মণি চোখের জল ফেলতেন আর ভাবতেন, কী পরিচয়ে তা হলে দিন কাটাচ্ছেন রোশনলালের সঙ্গে? সোজা বাংলায়, রক্ষিতাই তো! জীবন কি এ ভাবেই কাটবে, অবহেলা-অনাদর-অত্যাচারের গ্লানি মুখ বুজে সহ্য করে? ছেলেমেয়ে এখনও দুধের শিশু। তাদের পরিচর্যার দায়িত্ব সামলে নার্সের চাকরির চেষ্টা করাটাও অসম্ভবের পর্যায়েই। আরও অসম্ভব, কারণ, এরই মধ্যে ফের সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েছেন।
পরিস্থিতির চাপে দিশেহারা মণি দাঁতে দাঁত চেপে তবু মেনে নেওয়ার এবং মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেই যাচ্ছিলেন। এবং হয়তো করেই যেতেন, যদি না এক সন্ধেয় হঠাৎই দেখে ফেলতেন ওঁদের দু’জনকে।
বেশ কয়েক মাস ধরে পাওলিন নামের এক অতীব সুন্দরী মহিলার গলার সংক্রমণের চিকিৎসা করছিলেন রোশনলাল। রাঁচির টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অপারেটরের কাজ করতেন তেইশ বছরের পাওলিন। মাঝেমধ্যে রোশন-মণির ফ্ল্যাটেও আসতেন। মুন্না-মুন্নির জন্য উপহার আনতেন। রান্না করেও আনতেন ভালমন্দ।
এমনই এক সন্ধেয় এসেছেন পাওলিন। ঘণ্টাদুয়েক গল্পগুজবের পর বেরলেন। রোশনলাল কিছুটা এগিয়ে দিতে গেলেন পাওলিনকে। বেশ কিছুক্ষণ পরও যখন ফিরলেন না, কৌতূহলবশত মণি বাইরের ঘরের জানালায় চোখ রাখলেন। এবং আধো অন্ধকারেও স্পষ্ট বুঝলেন, কোয়ার্টারের গেটের কাছে রোশনলাল আর পাওলিন পরস্পরের আলিঙ্গনবদ্ধ। দু’জনের ঠোঁটের মধ্যে ব্যবধান অন্তর্হিত।
সে-রাতে বাদানুবাদ হল রোশন-মণির। একটা সময় রোশনলাল নিরুত্তাপ গলায় বললেন, ‘পাওলিন আমার বোনের মতো। ভাই-বোনে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়ায় দোষের কিছু নেই। নিজের মান্ধাতার আমলের চিন্তাভাবনা বদলাও।’
স্বামীর এহেন ব্যাখ্যায় বাক্রুদ্ধ হয়ে গেলেন মণি। পরনারীতে রোশনলালের আসক্তির ব্যাপারে আন্দাজ করতেন মণি, সন্দেহও। কিন্তু নিজের ফ্ল্যাটের চৌহদ্দির মধ্যেই যখন চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন ঘটল, মণি মনস্থির করে ফেললেন।
পরের দিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে রওনা দিলেন কলকাতায়। উঠলেন মতিলাল নেহরু রোডের সেই ভাড়ার ফ্ল্যাটে, যেখানে যশোদাদেবী বসবাস করতেন ছোটমেয়ে বেলার সঙ্গে। মণির মুখে সব শুনলেন যশোদা। অদৃষ্টকে দোষারোপ আর অশ্রুপাত ছাড়া কী-ই বা করার ছিল প্রৌঢ়ার?
কূটবুদ্ধির অভাব আছে, রোশনলালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তাঁর চরম শত্রুর পক্ষেও করা অসম্ভব ছিল। মণি কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পর ছক কষলেন বরফশীতল মস্তিষ্কে। অসম্ভব ইমেজ-সচেতন মানুষ ছিলেন রোশনলাল। জানতেন, মণি যদি তাঁর কীর্তিকলাপের ব্যাপারে আলোচনা করেন পরিচিত মহলে, সামাজিক প্রতিপত্তিতে আঁচড় পড়তে পারে। তাই মণির আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই আপাতত প্রধান কর্তব্য বলে স্থির করলেন। দুটো চিঠি লিখলেন মণিকে। পাঁচ দিনের ব্যবধানে। অগস্টের ১৪ এবং ১৯ তারিখে। যা লিখলেন, তুলে দিচ্ছি অংশবিশেষ।
১৪.০৮.৪৮
‘প্রিয়তমা মণি,
… তুমিই আমার জীবন, আমার সব কিছু। তুমি আমাকে চিঠি লিখছ না কেন? তোমার চিঠি না পেলে আমার নিজেকে শূন্য মনে হয়। ডার্লিং প্লিজ়, এবারের মতো আমায় মাফ করে দাও। দেখবে, আমি অনেক বদলে গেছি। ভুল বুঝো না আমায়। তোমার কোনওরকম ক্ষতি হয় এমন কাজ আমি কখনও করব না। মন থেকে প্লিজ় সমস্ত সন্দেহ দূর করে দাও… দেখবে আমরা আগের মতো সুখী জীবন কাটাতে পারব। আমাদের তৃতীয় সন্তান কিছুদিন পরেই পৃথিবীতে আসতে চলেছে। অন্তত তার কথা ভেবে সমস্ত ভুল বোঝাবুঝিকে চলো মুছে ফেলি আমরা…
তোমার রোশন’
১৯.০৮.৪৮
‘ডার্লিং,
…তোমাকে আমি আর কতবার বলব যে আমি তোমাকে মিথ্যে বলার কথা ভাবতেও পারি না। আমি তোমাকে কখনও ঠকাব না। আমি তোমাকে ভালবাসি… এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভালবাসব।
আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় যে বিয়েতে রেজিস্ট্রিটাই সব? বিয়ের আসল জিনিস তো ভালবাসা। রেজিস্ট্রি বিয়েতে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, ডিভোর্স করতে পারে। কিন্তু প্রকৃত ভালবাসার যে বিয়ে, তাতে কখনও ছাড়াছাড়ি হয় না। আমার কথাগুলো মন দিয়ে ভেবে দেখো।
তোমারই রোশন’
এই কুম্ভীরাশ্রুতে যে বিশেষ বরফ গলছে না, বুঝতে পারছিলেন রোশনলাল। একটি চিঠিরও উত্তর দিচ্ছিলেন না মণি। এবং উদ্বেগ বাড়ছিল রোশনলালের। সিদ্ধান্ত নিলেন কলকাতায় আসার। রাঁচির সেনা হাসপাতালের চাকরিটা ছাড়লেন। কলকাতায় এসে যোগ দিলেন লেক মিলিটারি হাসপাতালে। উঠলেন হাসপাতালের নির্দিষ্ট কোয়ার্টারেই। কলকাতায় পৌঁছনোর সন্ধেতেই গেলেন মতিলাল নেহরু রোডের ফ্ল্যাটে মণির সঙ্গে দেখা করতে। এবং বুঝলেন, যা আশঙ্কা করছিলেন, সত্যিই। এ মণি আর সেই মণি নয়, যিনি স্বামীর মিষ্টি কথার জাদুতে আগের মতো মোহাবিষ্ট হয়ে পড়বেন।
