মিলিটারি হাসপাতালে ইএনটি বিভাগে নার্স হিসাবে নিযুক্ত হলেন মণি। ওই বিভাগের দায়িত্বে তখন মেজর রোশনলাল সিং। মণি প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়লেন আপাদমস্তক, রোশনলালের চোখে দেখলেন নিজের সর্বনাশ।
দোষ দেওয়া যায় না মণিকে। একটা অমোঘ আবেদন ছিল রোশনলালের ব্যক্তিত্বে, যার চৌম্বকীয় আকর্ষণ উপেক্ষা করা কঠিন হত মেয়েদের পক্ষে। কাহিনি আরও অগ্রসর হওয়ার আগে, আসুন, আলাপ করিয়ে দিই রোশনলালের সঙ্গে।
রাজা রোশনলাল সিং সুয়েজভান— পুরো নাম। কাশ্মীরের মহারাজা সুয়েজভান সিং-এর বংশজাত। বরাবরই প্রখর মেধাবী। সসম্মানে ডাক্তারি পাশ করার পর যুবক রোশনলাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যোগ দিয়েছিলেন Indian Army Medical Corps-এ। অসামান্য কর্মদক্ষতা পথ সুগম করেছিল দ্রুত পদোন্নতির। ডাক্তার রোশনলাল মেজর পদে উন্নীত হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালে। কলকাতার আলিপুরে সেনাবাহিনীর হাসপাতালে E. N. T. বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
রোশনলালের চরিত্রের কাটাছেঁড়ায় মনে পড়তে বাধ্য ১৮৮৬ সালে রচিত রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের সেই কালজয়ী উপন্যাস, ‘Strange Case of Dr. Jekyll and Mr. Hyde’।
Dr. Henry Jekyll, শান্ত, ধীরস্থির, হৃদয়বান এক চিকিৎসক। যিনি দিনের বেলায় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, কিন্তু এক রাসায়নিক তরলের প্রভাবে রাত্রিবেলা জেগে ওঠে যাঁর অন্য সত্তা। Dr. Jekyll হয়ে ওঠেন Mr. Edward Hyde, যিনি স্বভাবে-আচারে-আচরণে Dr. Jekyll-এর সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে। নৃশংস-বিবেকবর্জিত-দয়ামায়াহীন এক খুনি। একই মানুষ, দ্বৈত সত্তা।
রোশনলালও ছিলেন তা-ই। এক গবেষণাযোগ্য চরিত্র। একই অঙ্গে দ্বৈত রূপ। দীর্ঘদেহী সুঠাম চেহারার তরুণ ডাক্তার। সুদর্শন। চশমার পিছনে বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ। চলনে-বলনে-পোশাকে-আশাকে দৃশ্যমান, রাজরক্ত বইছে এই লোকটির শরীরে।
এক একজন থাকেন, যে-কোনও সামাজিক সমাবেশে হাজির হলেই সব আলো কেড়ে নেন অবলীলায়। রোশনলাল ছিলেন সেই গোত্রের। সাহিত্য বলুন বা বিজ্ঞান, দর্শন বলুন বা নৃতত্ত্ব, যে-কোনও বিষয়ে পাণ্ডিত্য ছিল প্রশ্নাতীত। যখন কথা বলতেন মার্জিত বাচনভঙ্গিতে, লোকে শুনত মন্ত্রমুগ্ধ। যখন রোগীর চিকিৎসায় নাওয়া-খাওয়া ভুলে হাসপাতালে কাটিয়ে দিতেন রাতের পর রাত, সহকর্মীদের শ্রদ্ধা-সম্ভ্রম কুড়িয়ে নিতেন অনায়াসে।
নিজের লেটারহেডে ছাপিয়ে রেখেছিলেন, ‘Worship God by servicing the ailing humanity’। দুঃস্থ মানুষকে দানধ্যান করতেন নিয়মিত। মদ-সিগারেটের সঙ্গে কোনওরকম সংস্রব ছিল না নিত্যদিন পূজাপাঠ করা রোশনলালের। হুবহু ড. জেকিল। যাঁর প্রেমে না পড়ে উপায় ছিল না মণির। জানতেন না প্রেমিকপুরুষের দ্বৈতসত্তার কথা। যখন জেনেছিলেন, দেরি হয়ে গিয়েছিল বিস্তর।
মণির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ল রোশনলালের। মানসিক এবং শারীরিক। ’৪৬-এর ডিসেম্বরে মণি সন্তানসম্ভবা হলেন। এবং রোশনলালকে বললেন, ‘এবার বিয়েটা করে নেওয়া দরকার।’ যখন বলেছিলেন, জানতেন না রোশনলালের গোপন করে যাওয়া দুটি তথ্য। এক, রোশনলাল বিবাহিত। স্ত্রী-র নাম কৌশল্যা। দুই, ওঁদের একটি পুত্রসন্তানও বর্তমান। নাম, সুদর্শন কুমার।
মণির বিবাহ-প্রস্তাবে রোশনলাল রাজি হলেন এক কথায়। নির্দিষ্ট দিনে এক বন্ধুর বাড়িতে উপস্থিত হলেন মণিকে নিয়ে। এক পুরোহিত বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ করলেন, সাক্ষী রইল অগ্নিকুণ্ড। মণি যারপরনাই অবাক হলেন বৈবাহিক ক্রিয়াকর্মের রীতিনীতিতে। আত্মীয়স্বজনের বিয়েতে আশৈশব দেখে এসেছেন হিন্দু ধর্মমতে বিয়ের পরিচিত আচারবিধি। এ তো আলাদা সম্পূর্ণ!
রোশনলাল স্মিতহাস্যে জানালেন, হিন্দুমতে বিবাহের আয়োজন যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। ব্যয়বহুলও। তার চেয়ে আপাতত এই ভাল। আর্যসমাজ মতে এভাবেই হয় বৈবাহিক প্রক্রিয়া। মণি তখন মোহাচ্ছন্ন রোশনলালের প্রেমে। প্রিয়তম পুরুষের প্রতি সন্দেহের ন্যূনতম অবকাশই নেই।
মণি যখন প্রশ্ন করলেন বিয়ের আইনসিদ্ধ রেজিস্ট্রি নিয়ে, রোশনলাল ফের সহাস্যে বললেন, ‘ওটা তো যে-কোনওদিন করে নেওয়া যাবে। সত্যি বলো তো, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?’ আবেগবিহ্বল মণি আনন্দাশ্রু ব্যয় করলেন কিছু। সমর্পণ সম্পূর্ণ হল।
পরের বছর, ’৪৭-এ জন্ম হল রোশনলাল-মণি-র শিশুপুত্রের। নাম রাখা হল মুন্না। ’৪৮-এ ফের গর্ভবতী হলেন মণি। এবার কন্যাসন্তান। মুন্নি। ’৪৭-এর মাঝামাঝি রোশনলাল ফ্ল্যাট ভাড়া করলেন ৪/ডি মতিলাল
নেহরু রোডে একটি বাড়ির চারতলায়। যশোদা-মণি-বেলা উঠে এলেন দেশপ্রিয় পার্কের থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বের
সেই ফ্ল্যাটে। পরাশ্রিত থাকার থেকে মেয়ে-জামাইয়ের সংসারে দিনাতিপাতই শ্রেয়তর মনে করলেন যশোদা।
রোশন-মণির সম্পর্কে চিড় ধরা শুরু দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের কিছুকাল পর থেকে। মণির সঙ্গে রোশনলাল ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন স্রেফ শরীরী আকর্ষণে। মন ছিল বহু আলোকবর্ষ দূরে। আর্যসমাজ মতে বিয়ের ছদ্মচিত্রনাট্য সাজিয়েছিলেন মণি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ায়।
মানসিক সংযোগ না থাকলে ‘আদিম রিপু’-র তাড়না একটা সময় স্তিমিত হয়ে আসেই। শরীরী মোহ কাটিয়ে ওঠার পরই নিজমূর্তি ধরলেন রোশনলাল। বদলির নির্দেশ এল রাঁচির নামকুম হাসপাতালে। মণি এবং দুই সন্তানকে নিয়ে পাড়ি দিলেন রাঁচি। যেখানে অন্য রোশনলালকে চিনতে শুরু করলেন মণি। যিনি আর ডক্টর জেকিল নন। সর্বার্থেই মিস্টার হাইড।
