ব্যাগটা ফেলতে যাচ্ছেন জলে? ভদ্রলোক ওভাবে চারদিক দেখছেন কেন? উদ্বেগ কেন এত চোখেমুখে? কী ফেলতে যাচ্ছেন? কী আছে ব্যাগে? ত্রিলোচন থমকান দেখে। সন্দেহ হয়। হাঁক দেন বাজখাঁই গলায়, ‘কেয়া ফেকতা হ্যায় বাবু, কেয়া ফেকতা হ্যায়?’
‘ওরে বাবা দেখ চেয়ে, কত সেনা চলেছে সমরে!’
এ দৃশ্য আগে দেখেছে কলকাতা? স্রেফ একটা মামলার জন্য এহেন যুদ্ধং দেহি সাজ? টগবগ টগবগ ধ্বনি আলিপুর আদালতের সামনের রাস্তা জাজেস কোর্ট রোডে। ঘোড়াপুলিশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজপথে। সন্ত্রস্ত পথচারীরা দেখছে নিরাপদ দূরত্ব থেকে। পুলিশের গাড়ি এসে থামছে একে একে। আদালত প্রাঙ্গণে ‘পজিশন’ নিচ্ছেন উর্দিধারীরা। আজ রায় ঘোষণা হবে। ‘জাজমেন্ট ডে’।
‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ অবস্থা এজলাসে। বাইরের রাস্তাও জনাকীর্ণ। আরও অনেকে ঢুকতে চান, দেখতে চান, শুনতে চান। কোর্ট চত্বরের মূল প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। লালবাজারের তরফে পূর্ণাঙ্গ পুলিশি বন্দোবস্ত করা হয়েছে শ’য়ে শ’য়ে উৎসাহী জনতাকে দূরবর্তী রাখতে। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে নেহাতই স্বল্পপরিসরের ওই এজলাস, অবাধ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া মানে অনর্থকেই আমন্ত্রণ।
তর সইছে না জনতার। সত্যি কথা বলতে, পুলিশেরও। আর কত দেরি? যখন বিচারক পড়তে শুরু করলেন দীর্ঘ রায়, অনন্ত অপেক্ষার পর যখন পৌঁছলেন শাস্তিদানের অনুচ্ছেদে, এজলাসের দখল নিয়েছে পিনপতন নীরবতা। বেলা তখন প্রায় দ্বিপ্রহর।
‘Taking into account the facts and circumstances of the case…’
এ কাহিনি প্রায় সত্তর বছর আগের। সন ১৯৪৮, স্বাধীনতার সঙ্গে তখনও আলাপ-পরিচয়ের পর্ব চলছে দেশের।
রহস্যভেদের রোমান্স-রোমাঞ্চ অমিল এ আখ্যানে। তবু আলোচ্য মামলার মতো চাঞ্চল্যকর এবং বহুচর্চিত কেস এদেশের অপরাধ-ইতিহাসে খুব বেশি নেই।
পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে যাঁরা অশীতিপর, তাঁদের স্মরণে থাকলেও থাকতে পারে এই মামলা। স্মরণে থাকতে পারে ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সমসাময়িক জল্পনা-কল্পনা-চৰ্চার তীব্রতা। শুধু সমসময়ই বা লিখি কেন, দেশের বিভিন্ন পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আজও যখনই আলোচিত হয় স্বাধীনোত্তর যুগের সাড়া-জাগানো মামলাগুলির ইতিবৃত্ত, অবধারিত উল্লেখিত হয় সাত দশক আগের এই ঘটনা।
সমস্যা হল, মামলার বিস্তারিত নথিপত্রের অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে সময়ের প্রকোপে। একাধিক অফিসার বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্তের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যাঁদের কয়েকজনের নাম নির্দিষ্ট ভাবে জানা যায় না। যতটুকু জানা যায় এই মামলা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় পদস্থ অফিসারদের লেখালেখি থেকে, যতটুকু উদ্ধার করা যায় শতচ্ছিন্ন কেস ডায়েরির হলুদ হয়ে-আসা পাতাগুলির পাঠযোগ্য অংশ থেকে, পেশ করলাম।
কৃষ্ণহরি শর্মা। বয়স যখন কুড়ি, দার্জিলিং জেলার আর্মড পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন। বিয়ে করেছিলেন তারও বছর তিনেক পরে। যশোদাদেবীকে। এই দম্পতির তিন সন্তান। দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড়মেয়ের নাম মণি। ছোটমেয়ে বেলা। সবার ছোট হল অমল।
দীর্ঘ কর্মজীবনের মধ্যভাগে কৃষ্ণহরিকে গ্রাস করল বিবিধ রোগব্যাধি। ১৯৪১-এ যখন মারা গেলেন, বড়মেয়ে মণি তখন একুশ বছরের সুন্দরী যুবতী। দার্জিলিংয়ে কলেজের পাট চোকার পর নার্সিং কোর্সে ভরতি হয়েছেন সদ্য। ছোটমেয়ে বেলা তখন উনিশ। অমলের সবে ষোলো পেরিয়েছে।
স্বামীর মৃত্যুর পর সপরিবারে কলকাতায় চলে এলেন যশোদা। কলকাতায় যশোদার এক বোন থাকতেন। নাম ডলি। যাঁর বিয়ে হয়েছিল কিরণ দে নামের এক বঙ্গসন্তানের সঙ্গে। সম্ভ্রান্তবংশীয় কিরণ পদস্থ চাকুরে ছিলেন। সানন্দে আশ্রয় দিয়েছিলেন যশোদা এবং তাঁর তিন সন্তানকে। অমল এবং বেলা কলকাতার কলেজে ভরতি হল। মণির নার্সিং-এর পড়াশুনো চালু হল নতুন উদ্যমে। বঙ্গীয় জীবনধারার সঙ্গে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন যশোদা। মণি-বেলা-অমলও।
নিরুদ্বেগ জীবন কাটল কয়েক বছর। উদ্বেগের সূত্রপাত হল ১৯৪৬ সালে, যখন অমলের ফুসফুসে ধরা পড়ল যক্ষ্মা রোগের সংক্রমণ। যাদবপুর হাসপাতালে চিকিৎসায় অমলের কিছুটা স্বাস্থ্যোদ্ধার হওয়ায় যশোদা কিঞ্চিৎ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন বটে, কিন্তু সে স্বস্তি স্থায়ী হল স্বল্পকালই। ’৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বেঘোরে প্রাণ হারালেন কলেজপড়ুয়া অমল। একমাত্র পুত্রের অকালমৃত্যুতে যশোদা সাময়িক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। মণি এবং বেলা আপ্রাণ শুশ্রূষায় ক্রমে স্বাভাবিকতায় ফেরালেন মা-কে।
যশোদার বোন ডলি এর কিছুদিন পরেই মারা গেলেন মাত্র সপ্তাহখানেকের জ্বরে। মানসিকভাবে আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন যশোদা। ডলির স্বামী কিরণ আদ্যন্ত ভদ্রলোক ছিলেন। মুখে কখনও কিছু বলেননি, তবে ডলির মৃত্যুর পর আশ্রিতা হয়ে সপরিবারে তাঁর বাড়িতে বসবাস করার অস্বস্তি ক্রমে গ্রাস করল যশোদাকে। কিন্তু গেলেও যাবেনই বা কোথায়? কে জায়গা দেবে সপরিবারে দুই মেয়েকে নিয়ে থাকার? বাড়ি ভাড়া করে থাকার মতো আর্থিক সংগতি নেই। নিরুপায় আশ্রিতার দিনগত পাপক্ষয়কেই ভবিতব্য মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী আর?
’৪৬ সালেরই শেষ দিকে আলিপুর মিলিটারি হাসপাতালে নার্সের চাকরি পেলেন মণি। বেতন ভদ্রস্থ। যশোদা ভাবলেন, মানসিক কষ্ট কমাটা দুষ্কর, অন্তত অর্থকষ্টটা এবার কিছুটা কমবে।
