দায় ছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের চরিত্রবদলের ছবিটাও তুলে ধরার। খুন-ডাকাতি-লুঠপাট বা পরিচিত ছকের চুরি-বাটপাড়িতে তো আর সীমায়িত নেই আজকের অপরাধের দুনিয়া। প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চেহারা বদলেছে অপরাধের। বদলেছে প্রয়োগ-পদ্ধতি। বদলাচ্ছে রোজ।
সারা বিশ্বের পুলিশের কাছেই গত কয়েক দশকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে তর্কাতীতভাবে দেখা দিয়েছে ‘সাইবার ক্রাইম’। গুলি-বন্দুক-ছুরি নিয়ে ‘হা রে রে রে’ জাতীয় ডাকাতির প্রয়োজন পড়ে না আজকের ই-মেল-হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুক শাসিত পৃথিবীতে, হাতের কাছে যদি থাকে একটা ডেস্কটপ-ল্যাপটপ বা নিদেনপক্ষে একটা মোবাইল ফোন। মাউসের একটা ক্লিকে, মোবাইলের কি-প্যাডের খুচরো খুটখাটে দূরতম মহাদেশ থেকে আমার-আপনার মেল ‘হ্যাক’ হয়ে যেতে পারে যখন-তখন। নিমেষে লোপাট হয়ে যেতে পারে আজীবনের সঞ্চয়, হাতবদল হয়ে যেতে পারে আপনার যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্য। প্রতারণার ফাঁদ পাতা ইন্টারনেটের ভুবনে। যাতে পা দিয়ে বিশ্বজুড়ে রোজ বহু মানুষ অসাবধানতার মাশুল গুনছেন সর্বস্বান্ত হয়ে। পরিণতি, প্রযুক্তি-প্রহরা আজকের তদন্তকারীদের সিলেবাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার।
প্রযুক্তির উন্নতির সুবিধে-অসুবিধে, দুইয়ের সঙ্গেই এখন সংসার করতে হচ্ছে বাস্তবের ফেলু-ব্যোমকেশদের। নয়ের দশকের মাঝামাঝি ভারতে মোবাইল ফোন এসে যাওয়ার পর ‘ইলেকট্রনিক সার্ভেল্যান্স’-এর মধ্যস্থতায় অনেক অপরাধের কিনারা যেমন সহজতর হয়েছে, মুদ্রার অন্য দিকটাও উপেক্ষার নয়। প্রযুক্তিপটু সাইবার-অপরাধীদের কথা ছেড়েই দিলাম, নেহাতই ছিঁচকে চোরের মনেও একটা ধারণা হয়ে গিয়েছে মোবাইল ফোনের ‘কল ডিটেলস রেকর্ডস’ বা ‘ টাওয়ার লোকেশন’-এর ব্যাপারে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পুলিশ যাতে নাগাল না পায়, সেই ফন্দিফিকিরের খোঁজে নিত্যদিন ব্যস্ত থাকছে অপরাধ জগতের চুনোপুঁটি থেকে রাঘববোয়ালরা। ফল? টি-টুয়েন্টির আবির্ভাব যেমন অনেকটাই বদলে দিয়েছে প্রথাসিদ্ধ ক্রিকেটের ব্যাকরণ, তদন্তের সন্ধি-সমাসও তেমন অনেকাংশে পালটে দিয়েছে সাইবারস্পেস। দেশের ইতিহাসে অন্যতম চাঞ্চল্যকর সাইবার-অপরাধের একটি কাহিনির অন্তর্ভুক্তি তাই এই বইয়ে একরকম অনিবার্যই ছিল। যেমন অনিবার্য ছিল সূচিপত্রে স্টোনম্যান মামলার ঢুকে পড়া। বহু জটিল মামলার সমাধান যেমন কলকাতা পুলিশকে ‘স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড’ অভিধা দিয়েছে, পাশাপাশি কিছু কেস তো রয়েইছে, যার সমাধানে ব্যর্থ হয়েছি আমরা সর্বস্ব উজাড় করে ঝাঁপানো সত্ত্বেও। যে তালিকায় নিঃসংশয় শীর্ষবাছাই স্টোনম্যান মামলা। যা নিয়ে কৌতূহলের জোয়ারে এতটুকু ভাটা পড়েনি ঘটনার ত্রিশ বছর পরেও। যা ঘটেছিল, যেভাবে ঘটেছিল, প্রামাণ্য বিবরণ থাকল এই খণ্ডে।
যাঁর উৎসাহ ছাড়া এই বই পাঠকের কাছে পৌঁছনো অসম্ভব ছিল, তিনি কলকাতার নগরপাল শ্রীরাজীব কুমার। যাঁকে অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতাই জানাতে পারি শুধু। পারিবারিক দায়িত্ব একপ্রকার বিসর্জন দিয়েই বিনিদ্র রাতের লেখায় শর্তহীন সমর্থন পেয়েছি স্ত্রী-পুত্র-কন্যার। ধন্যবাদ দেওয়ার সম্পর্ক নয়। দিলাম না।
এর বেশি আর কী লেখার? মৌলিকতার ন্যূনতম দাবি নেই এই বইয়ের। যা আছে, দ্বিমুখী উদ্দেশ্য। এক, গ্রন্থিত রাখা গোয়েন্দাপীঠ লালবাজারের রহস্যভেদের ঐতিহ্য। দুই, তদন্তপথের কিছু দিকনির্দেশ লিপিবদ্ধ রাখা ভাবীকালের স্বার্থে।
উদ্দেশ্য আদৌ কিছুমাত্র সাধিত হল কি না, বিচার পাঠকের। দিনের শেষে পাঠকই পরম।
১ জানুয়ারি, ২০১৯
কলকাতা
২.০১ ডক্টর জেকিল, না মিস্টার হাইড?
[রোশনলাল মামলা
একাধিক অফিসার যুক্ত ছিলেন। প্রাপ্ত নথি থেকে নিশ্চিতভাবে যাঁদের নাম জানা যায় না।]
—‘কেয়া ফেকতা হ্যায় বাবু? কেয়া ফেকতা হ্যায়?’
দৃশ্যটা দেখে সহসা থমকে গিয়েছিলেন ত্রিলোচন। কম দিন তো হল না এ তল্লাটে। এই জায়গাটা বরাবরই নির্জন। আজ যেন একটু বেশিই শুনশান, হাঁটতে হাঁটতেই মনে হয়েছিল ত্রিলোচনের। গত রাতের তুলকালাম বৃষ্টির জন্য? লোক একটু কম যেন? অন্তত অন্যদিনের তুলনায়?
দক্ষিণ কলকাতার বহুপরিচিত সরোবর-প্রাঙ্গণ। সাধারণের কথ্যভাষায়, লেক। যেখানে দৈনিক প্রাতঃভ্রমণে আসেন নগরবাসীরা। যাঁদের স্বাস্থ্যরক্ষার তাগিদের সাক্ষী থাকাটা একরকম অভ্যাসেই পরিণত হয়েছে ত্রিলোচনের।
আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে লেক এলাকার নিরাপত্তারক্ষীর চাকরিটা পেয়েছিলেন। সেই থেকে একই রুটিন দৈনন্দিন। সূর্য আড়মোড়া ভাঙতে না ভাঙতেই বেরিয়ে পড়া, লেকের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাক দেওয়া পদব্রজে। দিনের পর দিন একই কাজ একই রাস্তায় বছরের পর বছর করে গেলে যা হয়, চোখ বেঁধে দিলেও এই রোজকার টহলদারি মোটেই কষ্টসাধ্য হবে না, জানেন ত্রিলোচন।
যেখানে থমকে গেলেন ত্রিলোচন, সেই জায়গাটা লেকের এক প্রান্তে। এই সীমা পর্যন্ত খুব স্বল্পসংখ্যক হাতেগোনা মানুষই আসেন। বস্তুত, সচরাচর কেউ আসেনই না এতদূর। সংগত কারণ ছিল ত্রিলোচনের অবাক হওয়ার। উনি কে? ওই ভদ্রলোক? বেঞ্চে বসেছিলেন এক মহিলার পাশে। হঠাৎ উঠে এদিক-ওদিক তাকালেন, হাতে একটা বড় চটের ব্যাগ নিয়ে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন লেকের ধারে। ফের সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন চারপাশে।
