খাসোগি সৌদি দূতাবাস থেকে আর বেরিয়ে আসেননি। সৌদি আধিকারিকরা দাবি করেছিলেন, খাসোগি অন্য কোনও গেট দিয়ে দূতাবাসের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছেন।
খাসোগির মতো দেখতে একজন ইস্তাম্বুলের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এমন সিসি টিভি ফুটেজও ঘটনার কয়েকদিন পর বাজারে ছেড়েছিলেন সৌদি অফিসাররা, কিন্তু তাতে এতটুকু চিঁড়ে ভেজেনি। সারা দুনিয়া অচিরেই জেনে গিয়েছিল খাসোগি-হত্যার চিত্রনাট্য। ঘটনার একদিন আগে রিয়াধ থেকে একটি বিশেষ বিমানে সৌদি সরকারের ‘সিক্রেট সার্ভিস’-এর পনেরো সদস্যের একটি দল যে তুরস্কে এসেছিল, এবং খাসোগির দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে দেহাংশ পুড়িয়ে ফেলেছিল অ্যাসিড দিয়ে, সবই প্রকাশ্যে এসেছিল।
সত্যিটা প্রকাশ্যে আসত না প্রযুক্তি সহায় না হলে, চাপা পড়ে যেত সৌদি আরব আর তুরস্কের পারস্পরিক চাপান-উতোরে। খাসোগির অন্তর্ধানের রহস্যভেদ করেছিল তাঁরই ঘড়ি, তাঁরই ফোন। ‘অ্যাপল’-এর ঘড়ি পরতেন খাসোগি। ব্যবহার করতেন আই ফোন। দূতাবাসে ঢোকার আগে খাসোগি ঘড়ির সঙ্গে নিজের ফোনকে ‘কানেক্ট’ করে নেন, প্রযুক্তি-সংযোগে যা এক সেকেন্ডের ব্যাপার। তারপর হাতের ঘড়িকে ‘রেকর্ডিং মোড’-এ রেখে ঢোকেন দূতাবাসের ভিতরে। ফোন রেখে যান বাইরে অপেক্ষমাণ প্রেমিকার কাছে। যিনি ফোনটি তুরস্কের আধিকারিকদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন খাসোগি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার দিনকয়েক পরে।
বলা বাহুল্য, খাসোগির সঙ্গে দূতাবাসের ভিতরে যা যা ঘটছিল, যা যা কথোপকথন হচ্ছিল, সবই রেকর্ড হয়ে যাচ্ছিল ফোনেও। খাসোগির মৃত্যুর বেশ কিছুক্ষণ পরও সক্রিয় ছিল ঘড়িটি। খাসোগির জামাকাপড় সহ ঘড়িটিও অ্যাসিডে পুড়িয়ে ফেলার পরই তা নিষ্ক্রিয় হয়। খাসোগি-হত্যার অকাট্য প্রমাণ যখন প্রকাশ্যে আসে ফোনের রেকর্ডিং-এর মাধ্যমে, সৌদি আরব হত্যার দায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়। এবং দাবি করে, খাসোগিকে খুনের সিদ্ধান্ত ‘জুনিয়র লেভেল’-এর আধিকারিকরা নিয়েছিলেন।
কল্পনার ক্রাইম থ্রিলারে ব্যর্থতার স্থান নেই। সব মামলারই সমাধান হয়ে যায় সেখানে। বাস্তব আলাদা। সেখানে সাফল্যের গা ঘেঁষেই থাকে ব্যর্থতাও। এই বইয়ে আমাদের ব্যর্থতার কাহিনিও ঠাঁই পেয়েছে। সুপ্রতিম এই খণ্ডে ‘স্টোনম্যান’ মামলার কথা লেখায় খুশি হয়েছি। এই সূত্রেই পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই আর একটি ‘সিরিয়াল-কিলিং’ মামলার প্রতি, যা ঘটেছিল ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রানসিসকো বে-তে।
আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনা। ১৯৬৮ সালের ২০ ডিসেম্বর দু’জন স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী গুলিতে খুন হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেক হেরম্যান রোডে। এরপর কিছুদিনের মধ্যে আরও অন্তত তিনটি খুন হয় একই কায়দায়। সিরিয়াল-হত্যার এই মামলাগুলির নেপথ্যঘাতককে ‘Zodiac Killer’ নাম দিয়েছিলেন তদন্তকারীরা। তামাম আমেরিকায় সাড়া ফেলে দিয়েছিল খুনগুলি। ‘Zodiac Killer’-কে নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের কৌতূহলকে উস্কে দিতে তৈরি হয়েছে হলিউড ছবি, টিভি সিরিজ।
‘Zodiac’ সাংকেতিক ভাষায় পুলিশকে এবং সংবাদপত্রে চিঠিও পাঠাত। প্রথম চিঠিটির অর্থ বোঝা গেলেও দ্বিতীয়টির মর্মার্থ উদ্ধার করা যায়নি।
পুলিশ একটা পর্যায়ের পর মামলার তদন্ত থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কিছু নতুন তথ্য পাওয়ার পর, তদন্তপদ্ধতির প্রযুক্তিগত প্রসারের পর, মামলাটির তদন্ত নতুন করে শুরু হয় ২০০৪ সালে। ‘Zodiac’-এর আসল পরিচয় অবশ্য এখনও অজ্ঞাত, এখনও তদন্তকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যান সংকেত-সমাধানের। একটি চিঠিতে ‘Zodiac’ তার নিজের নামও সাংকেতিক ভাষায় জানিয়েছিল বলে দাবি করেছিল। পাঠকের হাতে তুলে দিলাম সেই বহুচর্চিত ‘কোড’, যার রহস্যভেদ আজও অধরা।
কলকাতা পুলিশও সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন করে ‘স্টোনম্যান’ মামলা নিয়ে ভাবনাচিন্তার, নতুন ভাবে তথ্যানুসন্ধানের। আশা করি, মামলাগুলির যৌক্তিক নিষ্পত্তির পথে এগোতে পারব আমরা।
এই বই পাঠকের মনে রোমাঞ্চ জাগাক।
রাজীব কুমার, আই. পি. এস
নগরপাল, কলকাতা
২০ ডিসেম্বর, ২০১৮
.
লেখকের কথা
একের পরে দুই। প্রথম খণ্ডের পর দ্বিতীয়। ‘গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার’, আবার।
লেখকের দৃষ্টিকোণে ভাবলে, এ ধরনের সিরিজ লেখার ভাল-খারাপ দুইই আছে। ভাল এই, প্রথমটা পাঠকদের সমর্থন পেলে দ্বিতীয়তে হাত দেওয়ার ভরসা জোটে কিছুটা। উৎসাহ মাথাচাড়া দেয়, তা হলে দেখাই যাক লিখে। আর খারাপটা হল, আশঙ্কা। দ্বিতীয়টা যদি পাঠক-প্রশ্রয় না পায় প্রথমের মতো, অবচেতনে এই উদ্বেগ।
দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে শেষমেশ লিখে ফেলা গেল, দুই মলাটে বাঁধা পড়ল এগারোটি মামলার নেপথ্যকথা।
এই খণ্ডের মামলাগুলির সময়কাল বিস্তৃত ১৯৪৮ থেকে হালের ২০১০ পর্যন্ত। খুব পুরনো মামলা বলতে একটিই, ওই স্বাধীনোত্তর ’৪৮-এর। বাকিগুলি গত তিন দশকের সময়সীমায়।
মামলাগুলি বাছার কাজটা সহজসাধ্য ছিল না, স্বীকার্য অকপটে। লালবাজারের মহাফেজখানায় মামলার সংখ্যা তো নেহাত কম নয়। সমস্যা সংখ্যা নিয়ে নয়। সমস্যা শ’খানেক মামলার কেস ডায়েরি ঘেঁটে এমন ঘটনাগুলি বাছাই করা, যাতে বাস্তবের তদন্তপ্রক্রিয়ার অচেনা-অজানা দিকগুলোর সঙ্গে কিছুটা আলাপ করিয়ে দেওয়া যায় রহস্যপিপাসু পাঠকের। কল্পনার রহস্যগল্পের সংকলন যেহেতু নয়, যেহেতু আদতে মামলাগুলির আখ্যান ‘Police Procedural’ শ্রেণিভুক্ত, তাই আজ এবং আগামীর তদন্তশিক্ষার্থীদের ভাবনার রসদ জোগানোর একটা দায়ও ছিল বাছাইপর্বে।
