—বেরলি তো ভোর পৌনে ছ’টায়?
—হ্যাঁ, তার আগে বেরলে সন্দেহ করত সিকিউরিটিরা। শীতকাল ছিল, মাথার উপর দিয়ে একটা মাফলার জড়ালাম। যাতে আঁচড়গুলো তেমন চোখে না পড়ে। চটের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। বেরিয়ে STD booth থেকে বাবলুকে ফোন করলাম।
—কে বাবলু?
—বাবলু মন্ডল। বিহারে আমার জেলাতেই বাড়ি, পরিচিত। আলিপুরের অনন্ত অ্যাপার্টমেন্ট থাকে। নরেন্দ্র বাগলিয়া সাহেবের বাড়িতে রান্নার কাজ করে। ওর কাছে টাকাগয়না ভরতি ব্যাগটা রেখে এলাম কাগজে মুড়ে। বাবলু অসুস্থ ছিল কিছুদিন ধরে। ওকে ঘটনার কথা কিছু বলিনি। বলেছিলাম, পরে এসে ব্যাগটা নিয়ে যাব। ও সরল মনে বিশ্বাস করেছিল। চটের ব্যাগটা রাস্তায় ফেলে দিয়েছিলাম।
—চামড়ার ব্যাগটা বাবলুর কাছেই আছে?
—হ্যাঁ স্যার।
—এখনই যাব। তার আগে অ্যাক্সিডেন্টের গল্পটা বল।
—যদুবাবুর বাজারের কাছে ইচ্ছে করে সাইকেল নিয়ে ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা মেরেছিলাম। জানতাম, লাগবে। অজ্ঞান হয়ে যেতে পারি। চেয়েওছিলাম, অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি দু’দিন। এত তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়ে যাব, ভাবিনি।
—যদি মরে যেতিস বেকায়দায় লেগে?
—ওটুকু ঝুঁকি নিতেই হত স্যার। পালিয়ে গেলে তো সবাই আমাকেই সন্দেহ করত।
নিক্কু দম নেয় একটানে এতটা বলে। আশিক মোবাইলে ধরেন ডিসি ডিডিকে।
—স্যার, কেস ক্র্যাকড। নিক্কু কনফেস করছে। He only created the party scene.
রাতেই লালবাজার রওনা দিলেন গোয়েন্দাপ্রধান। এবং যখন মুখোমুখি হলেন নিক্কুর, আশিক বলে ফেললেন, ‘কঠিন জিনিস স্যার। শুনুন একবার গল্পটা। অস্কার না হোক, ফিল্মফেয়ারের বেস্ট অ্যাক্টর অ্যাওয়ার্ড এর বাঁধা।’
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এগোল প্রত্যাশিত পথে। সে-রাতেই অনন্ত অ্যাপার্টমেন্টে বাবলুর কোয়ার্টারে হানা দিল পুলিশ। বাবলুর কাছ থেকে পাওয়া গেল চামড়ার ব্যাগ। উদ্ধার হল সমস্ত টাকা-ডলার-গয়নাগাটি। যে বেল্টের ফাঁস দিয়ে খুন করেছিল রবিন্দর লুথরাকে, সেটা নিক্কু লুকিয়ে রেখেছিল ছাদের ঝরনার পাথরের চাঁইয়ের নীচে। পাওয়া গেল। পোস্টমর্টেম আর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতামত জানাল, মৃতার গলায় আঁচড়ের দাগ বেল্টের হুক থেকেই হয়েছিল খুব সম্ভব। আর আঙুলের ছাপ তো ছিলই একাধিক জায়গায়। যা হুবহু মিলে গিয়েছিল নিক্কুর সঙ্গে।
খুনের প্রত্যক্ষদর্শী অমিল। কিন্তু পারিপার্শ্বিক প্রমাণ ছিল এতটাই সংশয়াতীত, চার্জশিট-উত্তর বিচারপর্বে আলিপুর জেলা ও দায়রা আদালত নিক্কু যাদবকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলেন।
হাইকোর্টে আবেদন হল যথানিয়মে। সাজা কমে দাঁড়াল যাবজ্জীবন কারাবাসে।
ঘটনা ফিরে দেখলে মনে হয়, বিশ্বাস এক আশ্চর্য অনুভূতি। যখন সত্যিই করে কেউ, চেনা-পরিচয়ের সড়কপথে বেশ কিছুটা দূরত্ব অতিক্রমের পর, তা হয় শর্তহীন। ঠিক যেমন নিক্কুকে করেছিলেন মিসেস লুথরা। স্নেহ করতেন নিখাদ, বিশ্বাসও প্রশ্নহীন। টাকাপয়সা-গয়নাগাটি আলমারিতে খোলা রেখে বেরতেন নিশ্চিন্তে, নিক্কুর ভরসায়।
দূরতম কষ্টকল্পনাতেও ভাবেননি, বিশ্বাসভঙ্গ হবে প্রাণের বিনিময়ে। আর, কে ঘটাবে বিশ্বাসের অপমৃত্যু?
অতি পুরাতন ভৃত্য!
২. গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার – ২য় খণ্ড
মুখবন্ধ
প্রথম দুটি বই বেস্টসেলার হওয়ার পর নিজের তৃতীয় বইটি লেখার সময় সুপ্রতিম কতটা চাপে ছিল সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই, তবে এই বইটির মুখবন্ধে কী লেখা উচিত সেটা ভাবতে গিয়ে যেন হঠাৎই বেশি সচেতন হয়ে পড়েছি। যদিও খুব বেশিসংখ্যক মনোযোগী পাঠক মুখবন্ধ পড়েন না বলেই আমার দৃঢ় ধারণা, তবু, কোন মুখবন্ধ-লেখকই বা চান হংসমধ্যে বকযথা হয়ে থাকতে? তা ছাড়া, যে বইয়ের প্রভাব যতটা বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তার মুখবন্ধটি পাঠকের চোখে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে তুলনামূলক ভাবে বেশি। সে কারণেই এই লেখাটি লিখতে বসে বাড়তি সচেতনতা, সংগত উদ্বেগ।
সুপ্রতিমের লিখনশৈলী অবশ্য এতটাই সহজাত, আগের দুটি বইয়ের সাফল্য এবং পরবর্তীর প্রত্যাশা পূরণের কোনও চাপ এই বইটির লেখাগুলোয় চোখে পড়েনি আমার।
‘গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার’-এর প্রথম খণ্ডের সার্থক উত্তরসূরি এই দ্বিতীয়টি, যাতে ধরা আছে কলকাতা পুলিশের মহাফেজখানা থেকে বেছে নেওয়া এগারোটি চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্যকথা। প্রথম খণ্ডের তুলনায় এবারের কাহিনিগুলি তুলনায় বেশি সাম্প্রতিক। পাঠক নিশ্চিত লক্ষ করবেন, এই খণ্ডে স্থান পাওয়া মামলাগুলির তদন্তপ্রক্রিয়ায় কীভাবে ধরা পড়েছে বদলে-যাওয়া সময়ের ছাপ, ধরা পড়েছে প্রযুক্তির প্রভাব।
প্রযুক্তির প্রসার আজকের দুনিয়ায় একদিকে যেমন প্ররোচনা দেয় দুঃসাহসিক অপরাধে, আবার রহস্যভেদে তদন্তকারীর হাতিয়ারও হয়ে ওঠে সেই প্রযুক্তিই, যার সৌজন্যে ন্যায়বিচারের পথটিও প্রশস্ত হয়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তদন্তপ্রক্রিয়ায় কতটা নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে, তার সেরা উদাহরণ রয়েছে হাতের সামনেই। এ বছরেই ঘটে যাওয়া একটি নৃশংস খুন, যা সাড়া ফেলে দিয়েছিল গোটা বিশ্বে। খুনটি একটি গোয়েন্দা সংস্থা করিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল।
সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যার কথা বলছি, যিনি নিয়মিত লিখতেন ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকায়। খাসোগিকে শেষবার জীবিত দেখা গিয়েছিল তুরস্কে, সৌদি আরবের দূতাবাসে ঢোকার সময়। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর প্রেমিকা হ্যাটিস সেনগিজ। তুরস্কের নাগরিক হ্যাটিসের কাছে গচ্ছিত ছিল খাসোগির আই ফোন এবং অন্যান্য জিনিসপত্র।
