আশিক ভাবছিলেন, যতটুকু দেখা হয়েছে সিসিটিভি ফুটেজ, কুর্তা-পাজামা এবং জিনস-টপ পরা মহিলার ছবি ধরা পড়েনি। তা হলে? অবশ্য সিসিটিভির যা পজিশন, ফাঁকি দিয়ে ঢোকা যায় সহজে। না কি ওই দু’জন ওই ব্লকেরই কোনও আবাসিকদের অতিথি, নিক্কু চিনত না? অনেক ফ্ল্যাটেই ভ্যালেনটাইনস ডে-র খানাপিনা-নাচাগানা হয়েছে সে-রাতে। অপরিচিত অতিথি এসেছিলেন অনেক। তাঁদের মধ্যেই কেউ?
রাত পৌনে বারোটা। তলোয়ার দম্পতি, অশোক পোদ্দার আর প্রদীপ লাল নিজেদের গাড়িতে বেরিয়ে গেলেন আর এক প্রস্থ জিজ্ঞাসাবাদের পর। রাধা-আয়ুব-নিক্কুর জন্য লালবাজারের ট্রান্সপোর্ট সেকশন থেকে গাড়ি ডাকা হল।
আশিক তখন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তিনজনেই যেন কাল দশটার সময় উপস্থিত থাকে ত্রিপুরা এনক্লেভে। কথা আরও বাকি আছে। গাড়িতে ওঠার সময় কাঁধে হাত রেখে নিক্কুকে বললেন, ওষুধগুলো খাবি ঠিক করে।
নিক্কু মাথা নাড়ে, এবং একই সঙ্গে মুখ থেকে ছিটকে বেরোয়, ‘উঃ!’
আশিক কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নেন, ‘কী হল রে?’
—চোট আছে স্যার। ও কিছু নয়।
গাড়িতে উঠতে যাওয়ার মুহূর্তে থামান আশিক।
—এক মিনিট দাঁড়া। কোথায় চোট?
—ঘাড়ের কাছে।
এই সেই মুহূর্ত, ক্লান্তি-শ্রান্তি-ক্ষুধা-তৃষ্ণা বন্ধক রেখে তদন্তকারীর স্নায়ু নিজের অজান্তেই অতিসক্রিয় হয়ে ওঠার।
—দেখা তো, কোথায় চোট?
—পুরনো চোট স্যার।
—পুরনো কি নতুন, আমরা বুঝব। জামাটা খোল।
জামা খোলায় প্রবল অনীহা নিক্কুর চোখমুখে। এতক্ষণের যন্ত্রণাপীড়িত মুখে হঠাৎই দ্বিধা আর উদ্বেগের আঁকিবুকি।
ট্রান্সপোর্ট বিভাগের গাড়ির আর স্টার্ট দেওয়া হল না। তিনজনকেই ফের নিয়ে যাওয়া হল ইন্টারোগেশন রুমে। শার্ট খোলার পর নিক্কুর ঘাড়ের কাছে দেখা গেল গভীর আঁচড়ের দাগ। নখ চেপে বসলে যেমন হয়। ডাক্তাররা স্বাভাবিকভাবেই নিক্কুর মাথার আঘাত নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন, হয় গুরুত্ব দেননি ওই আঁচড়কে, নয় নজর এড়িয়ে গিয়েছিল।
—এটা কী করে হল?
—পড়ে গিয়ে স্যার। ওই যে বাইক ধাক্কা মারল সকালে…
—তবে যে বললি, পুরনো চোট? পড়েছিস তো মুখ থুবড়ে। ঘাড়ের পিছনে লাগল কী করে?
নিক্কু ঘামতে শুরু করেছে তখন। আশিকের এক সহযোগী অফিসার তেড়ে যান নিক্কুর দিকে, ‘কী হয়েছিল বল? স্যার, দুটো ঠিকঠাক পড়লেই সব উগরে দেবে গড়গড় করে। দেব?’
নিরস্ত করেন আশিক, ‘আঃ, হেড ইনজুরি আছে ওর। ছাড়ো, এমনিতেই বলবে।’
এমনিতেই বলল। একটা মিথ্যে ধরা পড়ে গেলে পোড়খাওয়া অপরাধীরও রক্ষণ ভেঙে পড়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা, অভিজ্ঞতা আমাদের। নিক্কু তো তুলনায় নেহাতই আনাড়ি, কী করে ব্যতিক্রম হবে? বলতে শুরু করল, আর স্তম্ভিত গোয়েন্দারা শুনতে থাকলেন।
—বেশ কিছুদিন ধরে প্ল্যান করেছি স্যার। যা মাইনে পেতাম, ওতে কোনওমতে সংসার চলত। বিহারের বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে নিজের হাতে আর কিছু থাকত না। ভাবতাম, এভাবেই কি চাকরগিরিতে জীবনটা কেটে যাবে? সাহেব বাড়িতে থাকলে সম্ভব হত না কিছু করার। মাঝেমাঝেই ব্যবসার কাজে বাইরে যেতেন সাহেব। তেমন একটা সুযোগ খুঁজছিলাম।
—বুঝলাম। কিন্তু খুনটা করলি কেন? চুরি করেও তো পালাতে পারতিস?
—কোথায় পালাতাম স্যার? আপনারা বাড়ি থেকে ধরে আনতেন। ছবি আর ঠিকানা তো সাহেবের কাছে ছিলই। আমার ইচ্ছে ছিল গ্রামে জমিজমা কিনে চাষবাসের। তাই এমন কিছু করতে হত যাতে টাকাটা হাতে আসে, আর ধরাও না পড়ি।
—হুঁ…
—গত কাল সন্ধেয় মিস্টার লাল এলেন, চলে গেলেন পৌনে ন’টা নাগাদ। রাধা তার আগেই চলে গিয়েছিল। আমি খেয়েদেয়ে শুতে গেলাম। মেমসাহেবও ডিনার করে শুয়ে পড়লেন। ফ্যান্ডি আর বিগলসকে রাত্রি সাড়ে এগারোটা নাগাদ ছাদের কাচের ঘরে বন্ধ করে দিলাম। ওদের গলার বেল্টটা নিজের কাছে রাখলাম।
—বলে যা।
—একটা নাগাদ ছাদের কোয়ার্টার থেকে নেমে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম। মেমসায়েবের বেডরুমে নক
করলাম। উনি বেশ কিছুক্ষণ পরে ভিতর থেকে বললেন, ‘কে?’ বললাম, ‘নিক্কু। প্রচণ্ড শরীর খারাপ লাগছে। খুব মাথা ব্যথা করছে। একটা ওষুধ দেবেন?’ উনি দরজা খুলে দিলেন। ঝাঁপিয়ে পড়লাম ওঁর উপর। উনি প্রস্তুত ছিলেন না, হকচকিয়ে গেলেন। আমি ধাক্কা দিয়ে ওঁকে মেঝেতে ফেলে বেল্ট দিয়ে গলায় ফাঁস দিলাম। উনি জিম করতেন, খুব ফিট ছিলেন। ঘাড়ে-পিঠে আঁচড়ালেন। হাতে হিরের আংটি পরে থাকতেন, চোখে খুব জোরে ঘুষি মারলেন।
—চোখের ওই রক্ত জমে যাওয়াটা তা হলে ঘুষি থেকেই?
—স্যার।
—বলতে থাক।
—মেমসাহেব পারলেন না। শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল একটু পরে। এরপর আলমারির চাবি খুলে টাকাপয়সা-গয়নাগাটি নিয়ে ড্রয়ারে থাকা একটা চামড়ার ব্যাগে ভরলাম। সেদিন ভ্যালেনটাইন না কী যেন ছিল। ইশক-মহব্বতের দিন। বেলুন টাঙানো হয়েছিল অনেক ফ্ল্যাটে। প্রায়ই পার্টি হত তো ফ্ল্যাটে। ভাবলাম, পার্টির মতো করে সাজাই বসার ঘরটা।
মেমসাহেব যখন পড়ে আছেন বেডরুমে, আমি কিচেনে ঢুকে রান্না শুরু করলাম। চিকেন কাবাব, পনির পকোড়া। ক্যাবিনেট থেকে বোতল বার করে দুটো গ্লাসে মদ ঢাললাম অল্প। মোমবাতি রান্নাঘরেই ছিল, জ্বালালাম। ন্যাপকিন-কাঁটাচামচ সাজিয়ে টেবিলে এমন ভাবে রাখলাম, যাতে মনে হয় অনেক রাত অবধি পার্টি চলেছিল। সে রাতে রাধা চলে যাওয়ার পর আর কেউ আসেনি ফ্ল্যাটে। সব বানিয়ে বলেছি।
