ধোঁয়াশা অনেক, খটকা বিস্তর। কী কী জানা দরকার, কী কী করা দরকার, নোটবইয়ে তালিকা বানাচ্ছিলেন তদন্তকারী অফিসার আশিক। যত সহজ হবে ভেবেছিলেন, তেমন আর হল কই? পিঠে হাত রাখলেন ওসি হোমিসাইড, ‘কী রে, কী এত ভাবছিস?’
আশিক তাকালেন, ‘কমপ্লিকেটেড লাগছে স্যার।’
ঘটনার যা ঘনঘটা, বাস্তবের গোয়েন্দা তো বলবেনই, ২১, রজনী সেন রোডের বাসিন্দা হলেও নিশ্চিত বলে ফেলতেন, “গোলমাল লাগছে রে তোপসে!”
এসএসকেএম হাসপাতালে হত্যে দিয়ে পড়েছিলেন গোয়েন্দারা। নিক্কুর জ্ঞান ফিরল বিকেল নাগাদ। সৌভাগ্যের কথা, CT Scan-এর রিপোর্ট জানাল, মাথায় চোট আছে। তবে ইন্টারনাল হেমারেজ নেই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হবে ব্যথা কমার ওষুধ দিয়ে।
—ডাক্তারবাবু, ওর কাছে কিছু জানতে চাওয়ার ছিল। কথাবার্তা বলা যাবে?
—আজই বলতে হবে? পেশেন্ট ট্রমায় আছে এখনও।
—যদি সম্ভব হয়…
—দেখবেন, যেন বাড়তি স্ট্রেস না হয়…
ফের ডাক্তারবাবুর সেই ভস্ম-করা চাউনি। এবার উপেক্ষা করলেন অফিসার। ডাক্তার তাঁর কাজ করবেন। পুলিশ পুলিশের। নিক্কুর বয়ানেই রহস্যভেদের জাদুকাঠি লুকিয়ে থাকতে পারে, ডাক্তার কী করে বুঝবেন?
লালবাজারে তখন যুদ্ধকালীন ব্যস্ততায় কাজ চলছে। গোটা পঞ্চাশেক মোবাইল নম্বরের CDR (Call details record) এবং TL (tower location) সংগ্রহ করার কাজে নেমে পড়েছে technical wing। রাধা, আয়ুব আর নিরাপত্তারক্ষীদের বেশ কয়েকজনকে আনা হয়েছে লালবাজারে। যদুবাবুর বাজারের সবজির দোকানের মালিক মদন মাইতিকেও। তলোয়ার দম্পতি, অশোক পোদ্দার আর প্রদীপ লালও এসে পড়বেন কিছুক্ষণের মধ্যে। আর কাকে কাকে আজই ডাকা প্রয়োজন, তার তালিকা তৈরি হচ্ছে। কেউ না কেউ হয় মিথ্যে বলছেন নয় সত্য গোপন করছেন। বয়ানে অসংগতি খুঁজে বার করতে হবে।
আয়ুব কেঁদেই চলেছেন। এক স্থানীয় সোর্স খবর দিয়েছে, মাইনে বাড়ানো নিয়ে নাকি লুথরাদের সঙ্গে কিছুদিন আগে মনকষাকষি হয়েছিল আয়ুবের। চেপে ধরতে আয়ুব কেঁদে ফেললেন, ‘মেমসাহেব আমাকে খুব ভালবাসতেন। আমি এত বড় পাপ করতে পারি না স্যার!’
নিক্কুকে যখন লালবাজারে আনা হল, ধুঁকছে। চোখেমুখে যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট। দ্বিধায় পড়লেন অফিসাররা, একে বেশিক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা ঠিক হবে? হাঁটতেই তো পারছে না ভাল করে। জলটল খাওয়ার পর নিক্কু যেটুকু বলল, তাতে ফের নাটকীয় মোড় নিল তদন্ত।
‘মিস্টার লাল গত রাতে ন’টা নাগাদ চলে গিয়েছিলেন। রাধা সাড়ে আটটার সময়। এক পুরুষ এবং এক মহিলা রাত এগারোটা নাগাদ আসেন। মেমসাহেব নিজেই দরজা খুলেছিলেন। মহিলা জিনস আর টপ পরে ছিলেন। ভদ্রলোক কুর্তা-পাজামা, দু’জনকে আগে কখনও দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না।
মেমসাহেব খুব ভাল রান্না করতেন। চাইনিজ-কন্টিনেন্টাল-মোগলাই, সব রকম রান্না আমাকে শিখিয়েছিলেন। রাতের খাওয়ার পর আমাকে কিচেনেই থাকতে বলেছিলেন। গেস্ট আসার কথা আছে, বলেছিলেন সোয়া দশটা নাগাদ।
ওই দু’জন আসার পর আমাকে কাবাব, পকোড়া বানাতে বললেন। বানালাম, স্যালাডও তৈরি করলাম। মেমসাহেব আর ভদ্রলোক ড্রিঙ্ক করছিলেন। অন্য মহিলা শুধু জল চেয়ে খেয়েছিলেন। আমি ট্রে–আইসবক্স সব সাজিয়ে দিয়েছিলাম। ফ্ল্যাটে প্রায়ই বেশি রাত অবধি পার্টি হত, জাগতে হত আমায়। ভোর রাত অবধি পার্টি চলছিল গতকাল। আমি কিচেনে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল। তখন ক’টা বাজে মনে নেই। আড়াইটে-তিনটে হবে। মেমসায়েবের সঙ্গে ওই মহিলার তর্ক হচ্ছিল। ভদ্রলোক থামাতে চেষ্টা করছিলেন। মহিলা রেগেমেগে বেরিয়ে গেলেন। কুর্তা-পাজামা পরা ভদ্রলোক থেকে গেলেন। তারপর আর ঘুম হয়নি।
মেমসাহেব আমাকে বলেছিলেন, ভোরভোর বেরিয়ে পুজোর ফুল আর কিছু ওষুধ আনতে। আমি সাড়ে পাঁচটা-পৌনে ছ’টার মধ্যে বেরিয়ে পড়েছিলাম সাইকেল নিয়ে।’
—তখনও ভদ্রলোক ছিলেন?
—হ্যাঁ, মেমসাহেব আর উনি বেডরুমে ছিলেন। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল।
—তারপর?
—যখন যদুবাবুর বাজারের দিকে যাচ্ছি ফুল কিনতে, পিছন থেকে একটা বাইক এসে ধাক্কা দিল। মেরে বেরিয়ে গেল। ল্যাম্পপোস্টে মাথা ঠুকে গেল। ফুটপাথে পড়ে গেলাম। তারপর আর মনে নেই।’
গোয়েন্দারা ধন্দে পড়লেন। সকালের শিফটের নিরাপত্তারক্ষীর বয়ানের সঙ্গে নিক্কুর বেরনোর সময়টা মিলে যাচ্ছে। যিনি নিক্কুকে বেরতে দেখেছিলেন ব্যাগ হাতে। খুনটা কি তা হলে হয়েছে নিক্কু বেরিয়ে যাওয়ার পর? না কি তারও আগে, বন্ধ বেডরুমে? মহিলা কে, যিনি রেগেমেগে চলে গেলেন আড়াইটে-তিনটে নাগাদ? কুর্তা-পাজামা পরিহিতেরই বা কী পরিচয়?
—ভদ্রলোককে দেখলে চিনতে পারবি? মহিলাকে?
—নিশ্চয়ই স্যার। একবার দেখলেই পারব।
ছবি-আঁকিয়েকে ডাকা হল সঙ্গে সঙ্গে। বর্ণনা অনুযায়ী শুরু হয়ে গেল ‘Portrait Parle’ আঁকা। পুরুষ-মহিলা, দু’জনেরই। সমস্ত আবাসিকদের ও কর্মীদের দেখানো হবে সেই ছবি, স্থির হল।
সেই দুপুর থেকে টানা চলছে খোঁজখবর, একে-তাকে জিজ্ঞাসাবাদ। দুপুর-বিকেল-সন্ধে গড়িয়ে রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। ঠিক হল, আজ রাতের মতো ইতি টানা যাক জিজ্ঞাসাবাদে। Technical wing-এর বিশ্লেষণ থেকে কিছু নির্দিষ্ট দিশা আবাসিকদের গতিবিধি সম্পর্কে মিলতে বাধ্য কাল সকালের মধ্যে। সরস্বতী-মিতাকে খবর পাঠানো হয়েছে। কাল এসে পড়বে। অন্য আবাসিকদের বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ বাকি, কাল হবে।
