ডাক্তারবাবু এমন ভঙ্গিতে তাকালেন, যেন ভস্ম করে দেবেন। মুখে বললেন, ‘প্রাণ বাঁচানো বোধহয় আপাতত বেশি ভাইটাল। জ্ঞান ফিরুক, আই মিন, যদি আদৌ ফেরে। তারপর কথা বলবেন।’
কেসের সমাধান সহজেই হতে চলেছে, এমন ধারণা হলে একটা প্রাথমিক ঢিলেঢালা ভাব আসেই। যেটা নিমেষে কেটে গেল নিক্কুর দুর্ঘটনায়। দ্রুত স্থির হল তদন্তের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি। উঠে এল অনেক প্রশ্ন, সম্ভাব্য থিয়োরির জল্পনাকল্পনা।
এক, সিসিটিভি ফুটেজ আদ্যোপান্ত খতিয়ে দেখা দরকার। কে কে কখন ঢুকেছে, কখন বেরিয়েছে লুথরাদের ব্লক থেকে গত চব্বিশ ঘণ্টায়। কিন্তু মুশকিল, রিসেপশনের ক্যামেরার অবস্থানটাই এমন, কেউ রিসেপশনের কাছে এসে কোনও ফ্ল্যাটে যেতে চাইলে তবেই ছবি উঠবে। রোজকার পরিচিত কেউ, সে বাসিন্দাই হোন বা ফ্ল্যাটগুলির নিত্যদিনের কর্মচারী বা নিতান্ত অপরিচিত, পাশ দিয়ে চুপচাপ সরাসরি লিফটে উঠে গেলে ছবি ওঠার প্রশ্ন নেই। বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো।
অসিত লুথরার নিজের সিকিউরিটি এজেন্সির ব্যাবসা, এই গোড়ার গলদটা চোখে পড়েনি? যাক গে, ফুটেজ দেখতেই হবে খুঁটিয়ে। যা পাওয়া যায়।
দুই, সমস্ত নিরাপত্তারক্ষী ও কাজের লোকদের তালিকা তৈরি করতে হবে। আবাসনের দুটো ব্লকেরই। জানতে হবে তাদের ঠিকুজিকুষ্ঠি। কারওর কি অপরাধের গোপন পূর্বইতিহাস আছে? কারওর সঙ্গে কি কোনও কারণে শত্রুতা তৈরি হয়েছিল লুথরা দম্পতির? জানতে হবে। অসিত লুথরার পেশাগত দিকটাও দেখা দরকার, কোনও গুরুতর ব্যবসায়িক শত্রুতা ছিল কারও সঙ্গে?
তিন, আবাসিকরাও সন্দেহের বৃত্তে। দ্রুত গতির জীবনযাপনে বিশ্বাসী ছিলেন শ্রীমতী লুথরা। বস্তুত, আবাসনের অধিকাংশ পরিবারই। বিলাসবহুল গাড়ি, জিম-টেনিস-গলফ-ক্লাব-কিটি পার্টি।
খুনের দিনটাও মাথায় রাখতে হবে। ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেনটাইনস ডে। এখন তো বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই কোনও না কোনও দিবস। বছরটা সাতশো তিরিশ দিনের হলেই ভাল হত, মনে হয় এক এক সময়। দ্বিগুণ ‘অমুক ডে’, ‘তমুক ডে’ উদযাপনের সুযোগ পাওয়া যেত!
তখন, এগারো বছর আগে, এত হরেকরকম দিবসের চল ছিল না। বিত্তশালী মহলে ভ্যালেনটাইনস ডে-র ধুমধাম অবশ্য তখনকার দিনেও শুরু হয়ে গিয়েছে। লুথরাদের ফ্ল্যাটে পার্টি হয়েছিল সে-রাতে। মিস্টার লুথরার অনুপস্থিতিতে কে বা কারা এসেছিলেন প্রেমদিবসের নৈশবাসরে? কতক্ষণ ছিলেন? আবাসিকদের কেউ? না কি কোনও বহিরাগত? দুটো গ্লাস ছিল টেবলে। মিসেস লুথরা ছাড়া তা হলে কি একজনই ছিলেন? কে?
চার, আবাসিকদের প্রত্যেকের, সমস্ত গৃহকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে কল ডিটেলস আর টাওয়ার লোকেশন নিতে হবে। একজনও যেন বাদ না যায়। কে ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন, জানতে হবে সব, পুঙ্খানুপুঙ্খ। নিতে হবে প্রত্যেকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট, মিলিয়ে দেখতে হবে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত নমুনার সঙ্গে।
পাঁচ, সবসময়ের দুই কাজের লোক সরস্বতী ও মিতাকে ডেকে পাঠাতে হবে। দু’জনেরই একই সময় ছুটিতে যাওয়ার দরকার পড়ল? আর রাধাও তো সবে কাজে ঢুকেছে দিন পনেরো হল। এমন তো কতই হয়, উদাহরণ আছে অসংখ্য, বিত্তশালী পরিবারে গৃহকর্মী হিসেবে যোগ দিয়ে সব ঘাঁতঘোঁত জেনে নিয়ে ডাকাতির ছক।
ছয়, এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ, নিক্কুর দুর্ঘটনা। যদি নিক্কুই খুনি হত, যেমন ভাবা হয়েছিল শুরুতে, অনায়াসে সরে পড়তে পারত। যদুবাবুর বাজারের কাছে যখন মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখেন ট্রাফিক কনস্টেবল, সঙ্গে কোনও ব্যাগ-ট্যাগ ছিল না। টাকাপয়সা-গয়নাগাটি নিক্কুই নিয়ে থাকলে একটা কিছু তো দরকার সেগুলো ভরার জন্য। সিকিউরিটি গার্ড বলেছেন, নিক্কু পৌনে ছ’টা নাগাদ বেরিয়েছিল বড় চটের ব্যাগ নিয়ে। ব্যাগটা গেল কোথায়? নিক্কু কি এমন কিছু দেখে ফেলেছিল, দরকার ছিল পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়ার? প্রত্যক্ষদর্শী থাকাটা আততায়ীর পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারত?
না কি দুর্ঘটনাটা নিক্কুই সাজিয়েছে? সন্দেহভাজনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নই নেই, সে যতই চিকিৎসাধীন থাক। ভুললে চলবে না, যেভাবে খুনটা হয়েছে, যদি জড়িত থাকে একাধিকও, পরিচিত কাউকে থাকতেই হবে ষড়যন্ত্রে। হতেও পারে, নিক্কুই আততায়ীর জন্য দরজা খুলে দিয়েছিল গভীর রাতে।
সাত, আততায়ীর জন্য, না আততায়ীদের জন্য? মিসেস লুথরা শারীরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলেন। তাঁকে কাবু করা একজনের পক্ষে অত সহজ নয়। নিক্কুর সঙ্গে যোগসাজশে অন্য কেউ বা কারা খুনটা করল, এবং পাছে লুঠের বখরা দিতে হয় বা ব্ল্যাকমেলের শিকার হতে হয়, তাই সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হল নিক্কুকে? অথবা, লুঠপাট স্রেফ পুলিশকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে, আদৌ নয় “murder for gain”, অন্য কারণ আছে?
আট, লুথরাদের দাম্পত্য সম্পর্কে কি কোনও টানাপোড়েন ছিল? জানা জরুরি। প্রদীপ লালের ভূমিকাতেও প্রশ্ন। বলছেন, বন্ধু অসিতের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। নেই দেখে মিসেস লুথরার সঙ্গে দেড়ঘণ্টা গল্প করেছিলেন। মোবাইল ফোনের যুগে প্রদীপ জানতেন না, অসিত বাইরে আছেন? বিশ্বাসযোগ্য? আর যদি ধরেও নিই, খোঁজ নেননি সেভাবে, বন্ধুপত্নীর সঙ্গে সৌজন্যের হাই-হ্যালো বা চা-বিস্কুট-কোল্ডড্রিঙ্ক বড়জোর আধঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিটে মিটে যাওয়ার কথা। ঘণ্টাদেড়েকটা একটু বেশি ঠেকছে না?
