আয়ুব আরও পুরনো, বয়স প্রায় ষাট। লুথরাদের গাড়ি চালায় তেরো বছর হল। মিতা এবং সরস্বতী দুই দিনরাতের কাজের লোক। দু’জনেই ছুটি নিয়েছেন গত ১১ তারিখ থেকে। সাময়িক কাজ চালাতে রাধা বলে এক মহিলাকে দিন সাতেকের জন্য রাখা হয়েছে। প্রতিবেশীদের প্রশ্নের উত্তরে যিনি জানালেন, গত রাতে সাড়ে আটটায় মেমসাহেব ছেড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন আজ সকাল-সকাল চলে আসতে। যখন রাতে রাধা ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়েছিলেন, ঘরে এক ভদ্রলোক ছিলেন। নিক্কু তো ছিলই।
খুন এই আবাসিক বহুতলেই
কে ভদ্রলোক?
প্রদীপ লাল। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, টিনের কনটেনার তৈরির জমাটি ব্যবসা। থাকেন কাছেই, রোল্যান্ড রোডে। প্রদীপ ও তাঁর স্ত্রী সুনীলার বহুদিনের সামাজিক সখ্য লুথরা-পরিবারের সঙ্গে। অসিত লুথরার সঙ্গে আড্ডা দিতে প্রদীপ এসেছিলেন গতকাল সন্ধে সোয়া সাতটায়। অসিত নেই দেখে ঘণ্টাদেড়েক গল্পগুজব করেছিলেন মিসেস লুথরার সঙ্গে। খুনের খবর পেয়ে ত্রিপুরা এনক্লেভে চলে এসেছেন সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে। গতকাল সন্ধেবেলা এসেছিলেন, নিজেই বললেন প্রতিবেশীদের।
বেশ। কিন্তু নিক্কু কোথায়? ভ্যানিশ?
ত্রিপুরা এনক্লেভ। ৫৯, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড।
রবিন্দর কউর লুথরা হত্যা মামলা। বালিগঞ্জ থানা কেস নম্বর ১৭/২০০৭। তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি। ধারা ৩০২/৩৯৪ আইপিসি। খুন ও লুঠ।
বালিগঞ্জ থানার অফিসাররা পৌঁছলেন। একটু পরেই চলে এলেন হোমিসাইড শাখার অফিসাররা। কন্ট্রোল রুম মারফত খবর ছড়িয়ে গিয়েছে।
এলে কী হবে, ঢুকতে পারলে তো! কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক বন্ধ, সামনে জড়ো হয়েছেন আবাসিকরা। পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। প্রায় লাগোয়া বহুতল ‘সপ্তপর্ণী’-র বাসিন্দারাও খবর পেয়ে নেমে এসেছেন। শুনতে হচ্ছে, যা পুলিশকে সচরাচর শুনতে হয় এমন কোনও ঘটনার পর স্পটে গেলে।
এখন আর এসে কী লাভ, যা হওয়ার তো হয়ে গিয়েছে। কী করে আততায়ী এসে খুন করে যায় এভাবে? পুলিশের টহলদারি ভ্যানকে তো চোখেই পড়ে না এ তল্লাটে। আজ আটতলায় হয়েছে, কাল পাঁচতলায় হবে। পরশু চারতলায়।
এসবে অভ্যস্ত আমরা। বুঝিয়েসুঝিয়ে কোনওমতে ঢোকা হল। বাড়তি ফোর্স পৌঁছল লালবাজার থেকে।
ফ্ল্যাটে আঙুলের ছাপ মিলল একাধিক। আলমারিতে, গ্লাসে, সোফার হাতলে, বেডরুমের আয়নায়, ড্রয়ারে। নগরপাল প্রত্যাশিতভাবেই তদন্তের ভার দিলেন গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড শাখাকে। দায়িত্ব পড়ল তৎকালীন সাব-ইনস্পেকটর আশিক আহমেদের উপর, যিনি বর্তমানে তপসিয়া থানার ওসি।
হইচই হওয়ার কথা খবর ছড়িয়ে পড়ার পর। হচ্ছিলও। মাত্র তো বছর এগারো আগের কথা। শুরু হয়ে গিয়েছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রমরমা। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে সার দিয়ে সংবাদমাধ্যমের গাড়ি। গোটাদুয়েক ওবি ভ্যানও। ‘ব্রেকিং নিউজ়’ টিভি খুললেই, ‘বহুতলে নৃশংস হত্যা, অন্ধকারে পুলিশ’ কিংবা ‘নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে লালবাজার’। এবং নানা মুনির নানা মত।
হোমিসাইড শাখা অবশ্য এসবে বিচলিত হওয়ার কারণ দেখছিল না কোনও। খুব খাটাখাটনি যাবে না কিনারায়। আগামীকাল বা পরশুর হেডলাইন চোখ বুজলেই দেখতে পাচ্ছিলেন আশিক, ‘চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কিনারা মহিলা খুনের, ধৃত গৃহভৃত্য।’
সমাধান তো স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সোজা মামলা, ‘open and shut case’। ওই নিক্কু বলে চাকরটা খুন করে গয়নাগাটি-টাকাপয়সা হাতিয়ে পালিয়েছে। মার্ডার ফর গেইন। কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়, আর কতক্ষণই বা?
মোবাইল ফোন ভারতে এসে গিয়েছে ঘটনার বারো বছর আগে। মুঠোফোন তখন সবার হাতে। নিক্কুরও ছিল। পাওয়াও গিয়েছে নম্বর। যদি বন্ধও করে দেয়, শেষ টাওয়ার লোকেশন আর কল ডিটেলস নিয়ে খুঁজে বার করতে বড়জোর আটচল্লিশ ঘণ্টা। কপাল ভাল থাকলে তারও কম। কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে technical surveillance-এর। বাংলা কী হবে? প্রযুক্তি-প্রহরা?
আত্মতুষ্টির ঘোর কাটল লুথরাদের ফ্ল্যাটে বসে বেডরুমের স্কেচ ম্যাপ তৈরি করার সময়ই। ফোন বাজল ল্যান্ডলাইনে।
‘হ্যালো, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল থেকে বলছি। একজন বাইশ-তেইশের যুবককে এখানে ভরতি করা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। ট্রাফিকের লোক দেখতে পেয়ে অ্যাডমিট করেছে। রোড অ্যাক্সিডেন্ট, হেড ইনজুরি আছে। মানিব্যাগে আই ডি কার্ড থেকে ফোন নম্বরটা পেলাম। ছবিও আছে। নাম নিক্কু যাদব। আপনাদের বাড়ির কেউ? আমরা পেশেন্টকে এসএসকেএম-এ ট্রান্সফার করছি, কন্ডিশন আনস্টেবল।’
এটা কী হল? নিক্কু দুর্ঘটনাগ্রস্ত! হিসেব মিলছে না তো! আরও বড় অঙ্ক আছে খুনের নেপথ্যে, যার পরিণতি নিক্কুর প্রাণনাশের চেষ্টা?
টিম ছুটল এসএসকেএম-এ। নিক্কু কথা বলার অবস্থায় নেই, অচৈতন্য। চোখের কোণে জমাট বাঁধা রক্ত। ডাক্তার বললেন, সাইকেল থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছে ফুটপাথে। ছড়ে গিয়েছে চোখমুখ। শক্ত কিছুতে আঘাত লেগেছে মাথায়। পেশেন্টের CT Scan জরুরি অবিলম্বে। জ্ঞান ফেরা দরকার। মাথার আঘাত বেশি হলে নিউরোলজিতে রেফার করা হবে, বাড়াবাড়ি হলে আইসিইউ তো রয়েইছে।
তদন্তকারী দলের একজন বললেন, ‘জ্ঞান ফিরলে ওর সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার। একটু আর্জেন্ট। শুনেছেন তো, একটা ব্রুটাল মার্ডার হয়েছে বালিগঞ্জে। ওই বাড়িতে কাজ করত ছেলেটি। ওর স্টেটমেন্ট ভাইটাল।’
