ঢুকতে হলে ফ্ল্যাটের ভিতরের সিঁড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে। যা বসার ঘরের পাশ দিয়ে উঠে গিয়েছে ছাদে। ছাদে লুথরাদের দিকের অংশে একটা গেট থাকে তালাবন্ধ, ভিতর থেকে। ফ্ল্যাটের ভিতরের সিঁড়ির মুখে একটা দরজা, তার পাশে চাবি রাখা থাকে গেটের। সেটা নিয়ে কেউ ছাদে উঠে গেট খুলে দিলে তবেই দেওয়ালের ওপার থেকে লুথরাদের অংশে আসা সম্ভব।
ছাদটা ভারী সুন্দর, চোখের আরাম। এক দিকে সার্ভেন্টস্ কোয়ার্টার, যেখানে নিক্কু থাকে। কাচ দিয়ে ঘেরা একটা ঘর পাশেই। পোষা দুটো ল্যাব্রাডর, ‘ফ্যান্ডি’ আর ‘বিগল’-এর রাত্রিবাস ওই ঘরেই। ঘাসের এক চিলতে লন, ফুলের বাগান ছিমছাম। পাথরের স্তূপের মধ্য থেকে কৃত্রিম ঝরনা। জল উছলে পড়ছে অনর্গল। মন ভাল হয়ে যায় দেখলে, আরও একটু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।
তিনটে গেট আবাসনের। একটা গাড়ি এবং লোকজনের ঢোকার। একটা বেরনোর। তৃতীয়টা ইমার্জেন্সি গেট, বন্ধই থাকে সাধারণত। আবাসিকরা থাকেন দুটো ব্লকে। ‘এ’ আর ‘বি’। দুটো ব্লকই আটতলার। একতলায় পার্কিং-এর ব্যবস্থা। ‘এ’ ব্লকে প্রতি তলায় তিনটে করে ফ্ল্যাট। Unit-I, Unit –II আর Unit-III। ‘বি’ ব্লকে দু’তলায় একটা ফ্ল্যাট। বাকি ফ্লোরগুলোয় দুটো করে। নাম ওই ‘Unit’ দিয়েই। সব মিলিয়ে চৌত্রিশটা ফ্ল্যাট, দুটো ব্লক মিলিয়ে। লুথরারা থাকতেন ‘বি’-তে।
নিরাপত্তায় বিনিয়োগে কার্পণ্য করেননি আবাসিকরা। দায়িত্ব দিয়েছিলেন ‘ম্যাক সিকিউরিটি সার্ভিস’ নামের বেসরকারি নিরাপত্তাসংস্থাকে। গেটে এবং দুটো ব্লকের একতলার রিসেপশনে তিন শিফটে চব্বিশ ঘণ্টা পাহারায় থাকতেন একজন সুপারভাইজার এবং তিনজন নিরাপত্তাকর্মী।
লিফট এবং সিঁড়ি, দুটো করে প্রতি ব্লকে। একটা লিফট ইমার্জেন্সির জন্য, বন্ধ থাকত। লিফটম্যান ছিল না। আবাসিকরা নিজেরাই লিফট অপারেট করতেন। রিসেপশনে বন্দোবস্ত ক্লোজ় সার্কিট ক্যামেরার। যার সংযোগ প্রতিটি ফ্ল্যাটের সঙ্গে ভিডিয়ো লিঙ্কেজের মাধ্যমে। অপরিচিত কেউ কোনও ফ্ল্যাটে যেতে চাইলে রিসেপশন থেকে ছবি পাঠানো হত সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটে, জানানো হত ইন্টারকমে। সবুজ সংকেত পেলে তবেই ছাড়পত্র মিলত লিফট বা সিঁড়িতে ওঠার। রোজকার পরিচিত গৃহকর্মীদের ছাড় ছিল এই সুরক্ষাবলয় থেকে। আবাসিকদের পরিচিত আত্মীয়বন্ধুদেরও, নিয়মিত যাতায়াতে যাঁদের মুখচেনা হয়ে গিয়েছে।
ফ্ল্যাটে ঢুকতে হলে ছাদে উঠে দেওয়াল টপকানো ছাড়া উপায় নেই, ল্যাডার দরকার একটা। জোগাড় হল। ওই মই বেয়ে কোনওমতে দেওয়াল টপকালেন আয়ুব। চাবি রাখা ছিল যেখানে থাকার। ফ্ল্যাটের ভিতর দিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ির পাশে। গেট খোলার পর বাকিরা ঢুকলেন। নিক্কু কই? নেই কোত্থাও।
পোষা কুকুর দুটো কাচের ঘরে। তালাবন্দি, অস্থির। দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে, চিৎকার করছে। কখনও ফ্যান্ডি আর বিগলসকে এভাবে আটকে থাকতে হয় না। প্রতিটা ঘরে দিনভর স্বচ্ছন্দ বিচরণ বাধাহীন। সোচ্চার প্রতিবাদ স্বাভাবিকই।
বসার ঘরে গ্লাস-প্লেট-পানীয় আর বেডরুমে রবিন্দর কউর লুথরার মৃতদেহ। বিবরণ দিয়েছি শুরুতে। বাড়তি যেটুকু বলার, লেপ সরিয়ে দেখা গেল, মৃতার শরীরে ফুলফুল নীলরঙা ম্যাক্সি। পায়ে মোজা। গলায় ফাঁসের দাগ ছাড়া অন্য কোনও শারীরিক হেনস্থা হয়নি।
বেডরুমের আলমারি-ড্রয়ার লন্ডভন্ড। মিসেস লুথরা হাতে হীরের আংটি পরে থাকতেন সবসময়। সেটা তো গেছেই, সঙ্গে ড্রয়ার আর আলমারিতে থাকা প্রচুর গয়নাগাটি। নগদ সাড়ে তিন লক্ষ টাকা, যা ছিল চামড়ার ব্যাগে। এবং প্রায় চারশো মার্কিন ডলার। মোদ্দা কথা, মূল্যবান যা ছিল, সব লোপাট।
পুলিশে ইনফর্ম করা দরকার ইমিডিয়েটলি, আতঙ্কের ঘোর কাটিয়ে প্রথম মুখ খুললেন অশোক পোদ্দার। সায় দিলেন সুদেশ তলোয়ার, জাস্ট আ মিনিট। লালবাজার কন্ট্রোলের নম্বর সেভ করা আছে আমার। পারভিনের কাছে নম্বর ছিল বালিগঞ্জ থানারও। ফোনের কনট্যাক্টস লিস্টে তিনিও চোখ বোলাচ্ছেন দ্রুত।
সোয়া দশটায় ফোন বাজল কলকাতা পুলিশের কন্ট্রোল রুমে। তারও মিনিটখানেক আগে বালিগঞ্জ থানায়।
—মার্ডার, শিগগিরি আসুন, অ্যাজ় আর্লি অ্যাজ় পসিবল। ওসি আছেন?
—মার্ডার? কোথায়?
ত্রিপুরা এনক্লেভ। ৫৯, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড। শহরের অন্যতম অভিজাত এলাকায় উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা আবাসন। পূর্বদিকে এগোলেই বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ। পশ্চিমে হাঁটা দিলে সেন্ট লরেন্স হাইস্কুল আর বালিগঞ্জ মিলিটারি ক্যাম্প।
সিকিউরিটি এজেন্সির রমরমা ব্যবসা ছিল চুয়ান্ন বছরের অসিত লুথরার। GI Securities। পরিধি বিস্তৃত দেশের বিভিন্ন শহরে, এমনকী বিদেশেও।
মিসেস লুথরা
সুখী পরিবার। বড়ছেলে কবীরের বয়স পঁচিশ। দক্ষিণ ভারতের ব্যবসা দেখাশোনা করেন। ছোট অঙ্গদ, কুড়ির কোঠা পেরিয়েছেন সদ্য। পড়াশোনা করেন লন্ডনে। ব্যবসার কাজে মিস্টার লুথরাকে প্রায়ই ট্যুরে যেতে হয়। যেমন গিয়েছিলেন ১৩ ফেব্রুয়ারি। ফেরার কথা ছিল একুশে। ফিরতে হল ১৫ তারিখ দুপুরের ফ্লাইটে, নৃশংসভাবে স্ত্রীর খুন হওয়ার খবর পেয়ে।
ফ্ল্যাটে যার থাকার কথা ছিল এবং নেই, সেই নিক্কু যাদব বছর চব্বিশের যুবক। বিহারের বাঁকা জেলায় বাড়ি। গত সাত বছর ধরে এ বাড়িতে কাজ করছে। যখন স্রেফ ষোলো-সতেরোর কিশোর, তখন থেকে। রান্নাবান্না করে, পাশাপাশি বাজারহাট, টুকটাক ফাইফরমাশ খাটা।
