হইহুল্লোড়ের পার্টি শেষে যেমন চেহারা হয় উচ্চবিত্তের বসার ঘরের। সোফার কুশন অবিন্যস্ত। কাচের সেন্টার টেবলে প্লেট গোটাতিনেক, কাঁটাচামচ সমেত। একটায় চিকেন রেশমি কাবাব দু’ টুকরো। পনির পকোড়ার আধখাওয়া অংশ আর একটায়। শসা-পেঁয়াজ-টমেটোর কয়েক কুচি তিন নম্বর প্লেটে। ফেলে ছড়িয়ে খাওয়ার পর যেমন পড়ে থাকে অবশিষ্ট। হাত মোছার পর দাগ ধরে যাওয়া পেপার ন্যাপকিন পড়ে ইতিউতি। দুটো গ্লাসে সোনালি তরলের তলানি, হুইস্কি।
তিনটে রংবেরং মোমবাতি জ্বলছে টেবিলে। গড়পড়তা সাইজের নয়, পেল্লায়। ক্রিকেটের উইকেটের থেকে একটু ছোট। পুড়তে সময় লাগে বেশ কয়েক ঘণ্টা। নেভেনি এখনও, জ্বলছে।
এহ বাহ্য। বিশাল ফ্ল্যাটের তিনটে প্রশস্ত বেডরুমের একটার দৃশ্য আমোদপ্রমোদের চিহ্নহীন। একটা লেপে বুক অবধি মোড়ানো, মহিলা পড়ে আছেন মেঝেতে। প্রাণ নেই আর, ঝলকের দেখাতেই বোঝা যায় দিব্যি। ডাক্তার না হলেও চলে।
বয়স যে পঞ্চাশ ছাড়িয়ে একান্ন, বোঝাই যায় না। দেখলে মনে হবে, খুব বেশি হলে কত আর, মাঝচল্লিশ। বয়সানুপাতে মহিলার চেহারা নির্মেদ। শরীরচর্চার অভ্যেস ছিল?
নিজেকে বাঁচাতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু আততায়ীর কাছে বিনা যুদ্ধে জমিও ছাড়েননি, স্পষ্ট। লড়েছিলেন আপ্রাণ, প্রমাণ ধরা রয়েছে ডান হাতের মুঠোর মধ্যে আটকে থাকা কয়েক গাছি চুলে। এ চুল খুনির, বুঝতে গোয়েন্দা হওয়ার প্রয়োজন নেই। গলায় শুধু ফাঁসের দাগ নয়। হুক জাতীয় কিছুর আঁচড়ও দেখা যাচ্ছে। নখের কোণে ময়লার ছোপ। নিশ্চিত, ওই ছোপও ঘাতককে প্রতিরোধকালীন। বাঁচতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন, জানান দিচ্ছে চোখ-মুখ-ঘাড়-গলায় আত্মরক্ষাজনিত আঘাতের আভাস।
শ্বাসরোধ করে খুন, নির্মম এবং পরিকল্পিত। কে এভাবে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলল? কে, না কারা?
একটা ল্যাডার দরকার।
হ্যাঁ, তা ছাড়া তো আর উপায়ও নেই। দাঁড়ান, দেখছি।
দুধের প্যাকেটগুলো পড়ে আছে ফ্ল্যাটের বাইরে, মাটিতে। রোজ বাস্কেট থাকে রাখার জন্য। আজ নেই। অযত্নে পিঠোপিঠি পড়ে আছে টাইমস অফ ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার পত্রিকা আর ইকনমিক টাইমস। দুধ যিনি দেন রোজ, কাগজ যিনি বিলি করেন দৈনিক, বেল বাজিয়ে বাজিয়ে ধৈর্য হারিয়ে চলে গিয়েছেন। আরও কত বাড়ি যাওয়ার আছে। সময় কোথায় অপেক্ষার? অন্যদিন একবার বেল বাজালেই দরজা খুলে দেয় নিক্কু। দীর্ঘদিনের কর্মচারী এ বাড়ির। আজ খোলেনি।
ঝাঁকা নিয়ে সবজিওয়ালা অবশ্য অপেক্ষায়। এ বাড়ি তার চেনা। ‘বালিগঞ্জের ভাবি’ প্রতি সপ্তাহেই টেলিফোনে অর্ডার দেন টাটকা শাকসবজির। যদুবাবুর বাজারের ‘মাইতি ভেজিটেবলস’-এর কর্মীকে হুকুমমাফিক সবজি দিয়ে যেতে হয় ফি হপ্তায়। অপেক্ষায় আরও দু’জন। কাজের লোক রাধা আর ড্রাইভার আয়ুব। সকাল ন’টা বেজে গেল। এমন হয়নি কখনও, হওয়ার তো কথা নয়। মেমসাহেবের যদি ঘুম কোনও কারণে না-ও ভেঙে থাকে, নিক্কু তো অন্তত খুলবে। সে কী করছে?
উলটোদিকের ফ্ল্যাট থেকে চিন্তিত মুখে বেরিয়ে এলেন অশোক পোদ্দার। অসিতমোহন লুথরা ব্যবসার কাজে দক্ষিণ ভারত গিয়েছিলেন গত পরশু। ভাইজ্যাগ থেকে ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে গত সন্ধেতেও। আজ সকাল থেকে মোবাইলে ফোন করে যাচ্ছেন সহধর্মিণীকে। নো রিপ্লাই। ল্যান্ডলাইনও নিরুত্তর। উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করেছেন প্রতিবেশী মিস্টার পোদ্দারকে। —দেখুন না একটু, কী হল?
ঘড়ির কাঁটা তখন সোয়া ন’টা ছাড়িয়েছে। অশোকের ফোনেই আয়ুবের সঙ্গে কথা বললেন অসিত লুথরা।
—গাড়িগুলো গ্যারেজে আছে?
—আছে সাব।
‘গাড়িগুলো’ বলতে দুটো। একটা টয়োটা করোলা, অন্যটা হন্ডা সিটি। দরজা খুলছে না দেখে আধঘণ্টা আগেই একতলার গ্যারেজে ঢুঁ মেরে এসেছেন আয়ুব। এই ভেবে, মেমসাহেব নিজেই কোথাও বেরিয়েছেন হয়তো জরুরি কাজে। সাহেব-মেমসাহেব দু’জনেই তো ভাল ড্রাইভিং জানেন।
গাড়ি গ্যারেজেই? দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল মিস্টার লুথরার।
—আয়ুব, এক্ষুনি পারভিন ম্যাডামের বাড়ি যাও। খোঁজ নাও ওখানে আছে কি না।
—জি সাব।
ডোভার রোডে বাড়ি তলোয়ার দম্পতির। সুদেশ আর পারভিন। দু’জনেই সদ্য পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। সুদেশের ব্যবসা চামড়ার সামগ্রী রফতানির। স্ত্রী পারভিন বাড়িতেই জিম চালান বেশ কয়েকবছর ধরে। লুথরা পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা তলোয়ারদের। একে অন্যের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত। পারভিনের জিমে সপ্তাহে তিনদিন ঘাম ঝরাতেন অসিতের স্ত্রী রবিন্দর কউর লুথরা।
না, তলোয়ারদের বাড়িতেও নেই। আয়ুবের সঙ্গেই সুদেশ-পারভিন ছুটে এলেন লুথরাদের ফ্ল্যাটে। ভিড় জমে গিয়েছে ততক্ষণে কেয়ারটেকার আর নিরাপত্তাকর্মীদের। বেরিয়ে এসেছেন অন্যান্য ফ্ল্যাটের আবাসিকরাও। কৌতূহল-উদ্বেগ-আশঙ্কা, গাঢ় হচ্ছে ক্রমশ।
জি প্লাস সেভেন বহুতল। আটতলায়, টপ ফ্লোরেই ফ্ল্যাট লুথরাদের। মূল দরজায় অটোমেটিক লক। পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ছাদে। ছাদের মাঝামাঝি একটা বেশ উঁচু দেওয়াল। টপকে এদিক-ওদিক পারাপার অসম্ভব। দেওয়ালটা ছাদকে ভাগ করে দিয়েছে। পশ্চিম অংশটা লুথরাদের ব্যক্তিগত মালিকানায়। সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে কেউ যে ওই অংশে ঢুকে পড়বে, জো নেই।
