একাধিক অভিজ্ঞ সোর্স লাগানো হল জগদ্দলে, যারা সিঁধিয়ে গেল এলাকার অলিগলি-মহল্লায়। দিন দুয়েকের মধ্যেই খোঁজ মিলল একজনের, জগদ্দলেই বাড়ি। ‘মতিলাল’-এর চেহারার বর্ণনার সঙ্গে মিল প্রচুর, এলাকায় সুনাম নেই তেমন। আটক করা হল। আসল নাম জানা গেল, বাপি মুখার্জি। খুচরো চড়-থাপ্পড়ও দেওয়ার দরকার পড়েনি। লালবাজারের ‘ইন্টারোগেশন রুমে’ কড়া পুলিশি ধমকেই কাজ হল। এবং বাপির মুখ থেকে বেরোল সেই পাঁচটি শব্দ, যার থেকে বেশি শ্রুতিমধুর কিছু তদন্তকারী অফিসারদের কাছে হতে পারত না, ‘মারবেন না, সব বলছি স্যার!’
যে খুন হল এবং যে খুন করল, দু’জনেই ছিল ঝানু প্রতারক। বাপির সঙ্গে তপনের আলাপ হয় মাসখানেক আগে জগদ্দল স্টেশনে, চোরে চোরে মাসতুতো ভাই, হওয়ারই ছিল। কিন্তু পরিণতি যে এত বিয়োগান্ত হতে যাচ্ছে, দু’জনেরই বোধহয় কল্পনার বাইরে ছিল। তপন একটা বিলিয়ন ডলারের জাল নোট পেয়েছিল তার কোনও প্রতারক বন্ধুর থেকে। এমন জাল মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের নোট বিক্রি করার চেষ্টা করে ধরা পড়ার বেশ কিছু ঘটনা ইন্টারনেট ঘাঁটলেই পাবেন। অতীতে ঘটেছে দেশের বিভিন্ন প্ৰান্তে, ঘটেছে বিদেশেও। বাপির লোভ হয় দেখে। জানত না, এমন নোটের অস্তিত্ত্বই নেই। আবার তপনও ছিল এলেমদার জালিয়াত, ‘চাল-টানা’-র ঠগবাজির সঙ্গে বাপি জড়িত জানতে পেরে দুষ্টুবুদ্ধি খেলে যায় মাথায়। বাপিকে বলে, এই ব্যবসায় সে পুরনো খিলাড়ি। তার অনেক চেনাজানা এজেন্ট আছে, যারা দুর্মূল্য ধাতুর বেচাকেনার কারবার করে। বিলিয়ন ডলার নোটপ্রাপ্তি তো এই কারবার করেই। কিছু টাকা দিলে বাপির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবে তাদের।
তপন বুনো ওল হলে বাপিও ছিল বাঘা তেঁতুল। বিশ্বাস অর্জনের জন্য কিছু টাকা দিয়েও দেয় তপনকে। তপনও প্রতিশ্রুতিমতো বাপিকে নিয়ে রওনা দেয় কলকাতায় এজেন্টের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবে বলে। সম্ভবত ভেবেছিল, ভুলভাল কিছু লোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে আরও কিছু টাকা হাতিয়ে নেবে। বাপি অন্য ছক কষেছিল, হোটেলে রাত্রে তপন ঘুমিয়ে পড়লে বিলিয়ন ডলারের নোটটি হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দেওয়ার। দুই প্রতারক একে অপরকে ঠকানোর উদ্দেশ্যে এসে উঠল হোটেলে, নিজেদের আসল নাম গোপন করে।
ঘটনার দিন দুপুরে বিয়ার খেতে খেতেই বাগবিতণ্ডার সূত্রপাত। এজেন্টের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য আরও টাকা দাবি করে তপন। ক্ষিপ্ত বাপি উত্তরে আগে দেওয়া টাকা ফেরত চায়। স্পষ্ট বলে দেয়, তার মনে হচ্ছে, পুরোটাই ধাপ্পাবাজি। দরকার নেই তার বহুমূল্য ধাতু বেচে বিলিওনেয়ার হওয়ার। তর্কাতর্কি থেকে হাতাহাতি। তপনের বিলিয়ন ডলার নোট ছিনিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে বাপি। ধস্তাধস্তি শুরু হয় প্রবল। একসময় মরিয়া বাপি গলা টিপে ধরে তপনের। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে। ঠান্ডা মাথায় ঘরে চাবি দিয়ে বেরিয়ে যায় সূর্য ডোবার পর, পকেটে নোটটি নিয়ে। পালানোর আগে সকালে কেনা ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর একটি পাতা বার করে নিয়েছিল। তাতে মুড়ে রেখে দিয়েছিল চাবিটি, যা উদ্ধার হয় জগদ্দলের বাড়ি থেকেই।
নোটটির কী হল? কয়েকবার একে-ওকে বিক্রি করার ব্যর্থ চেষ্টার পর বাপি বুঝে যায়, কানাকড়িও মূল্য নেই ওই কাগজের টুকরোর। ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল হতাশায়।
কিনারা তো হল, কিন্তু শাস্তি? গ্রেফতার-পরবর্তী তদন্ত একদিনের ক্রিকেট নয়, টি-২০-র বিনোদনী জগঝম্প তো নয়-ই। এ হল ধ্রুপদী টেস্ট ক্রিকেট, যা চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয় ক্রিকেটারের ধৈর্য-সংকল্প-মনোসংযোগ-অধ্যবসায়ের। রান আসছে না ওভারের পর ওভার, বোলার দাপট দেখাচ্ছে নিরঙ্কুশ, তবু দাঁত কামড়ে লোটাকম্বল নিয়ে বাইশ গজে পড়ে থাকা। উইকেট পড়ছে না কিছুতেই, নির্বিষ পিচে আয়েশি আধিপত্য কায়েম করছে ব্যাটসম্যান, তবু লেংথ-লাইন অভ্রান্ত রেখে বোলারের অপেক্ষা করা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা অসতর্ক স্ট্রোকের জন্য। তদন্ত-ও তাই, হতাশার জায়গা নেই কোনও। লেগে থাকতে হবে, নয়তো বিচারের শেষে হাতে থাকবে শুধু পেনসিল। মিথ্যে হয়ে যাবে প্রাক্-গ্রেফতার পর্বের ঘাম ঝরানো।
হোমিসাইড বিভাগের সাব-ইনস্পেকটর শুভাশিস ভট্টাচার্য তদন্ত করেছিলেন। পদোন্নতির পর বর্তমানে ইনস্পেকটর হিসেবে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অ্যান্টি-চিটিং শাখায় কর্মরত। তুখোড় তদন্ত করেছিলেন।
‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর বাকি পাতাগুলি এবং খোওয়া যাওয়া পাতাটি যে একই কাগজের, সেটা প্রমাণ করতে হয়েছিল ফরেনসিক পরীক্ষায় । অভিযুক্তের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহ করে তার সঙ্গে হোটেলের রেজিস্টারে থাকা লেখার তর্কাতীত সাদৃশ্য প্রমাণ করা হয়েছিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। যে চাবি দিয়ে ঘরের তালা বন্ধ করে পালিয়েছিল খুনি, বাজেয়াপ্ত হওয়া চাবিটি যে সেটিই, প্রমাণ করতে হয়েছিল তা-ও। চার্জশিটের জাল কেটে বেরনোর পথ ছিল না। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয় অপরাধী, এখন সংশোধনাগারে।
মামলার নির্যাস? বিষে বিষে বিষক্ষয়!
১.১২ অতি পুরাতন ভৃত্য
(লুথরা হত্যামামলা
তদন্তকারী অফিসার আশিক আহমেদ)
হুইস্কি, রাম, ভদকা, ওয়াইন, ব্র্যান্ডি। পরিপাটি সাজানো সুদৃশ্য ড্রয়িং রুমের লিকার ক্যাবিনেটে। দেশি নয়, বহুমূল্য বিদেশি ব্র্যান্ডের সব। সাধারণ পানীয়পিপাসুর নাগালের বাইরে।
