মৃত যে বাঙালি, সে তো জানাই হয়ে গিয়েছে। ধরে নেওয়া গেল, সম্ভাব্য আততায়ী ‘মতিলাল’-ও বাঙালি। কিন্তু এই তথ্যের থেকেও ঢের বেশি জরুরি প্রশ্ন, ভুল নাম-ঠিকানা কেন রেজিস্টারে? নিজেদের হিন্দিভাষী বলে প্রমাণ করার চেষ্টা কেন? অপরাধের মতলব ছিল কোনও? থাকলে কী অপরাধ? সেখানেই কি লুকিয়ে রহস্যভেদের ঠিকানা?
মৃতের পকেট থেকে পাওয়া নোটবুকের প্রতিটি নাম-ঠিকানা, প্রতিটি নম্বরের ঠিকুজিকুষ্ঠি নিয়ে পড়লেন গোয়েন্দারা। প্রায় সব নম্বরই উত্তর চব্বিশ-পরগনার। বিস্তর তথ্যতালাশ করে জানা গেল, নানা ধরনের জালিয়াতিই ছিল মৃত তপনের পেশা বলুন বা জীবিকা। চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে বেকার যুবক-যুবতীদের টাকা আত্মসাৎ করা, তাড়াতাড়ি ব্যাংক থেকে লোন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লোক ঠকানো, আরও এই জাতীয়।
পাওয়া গেল আরও একটি তথ্য। সম্প্রতি এক অভিনব প্রতারণা-চক্রের পান্ডাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল তপনের। অনেকের মনে থাকতে পারে, সেসময় ‘চাল টানা’-র গুজবে রীতিমতো হইচই পড়ে গিয়েছিল উত্তর চব্বিশ পরগনার গ্রামাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশে। কাগজেও লেখা হয়েছিল বিষয়টি নিয়ে। ‘চাল টানা’ মানে? গুজব ছড়িয়েছিল, পুরনো দিনের হাঁড়িকুড়ি-বাসনপত্র নাকি চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছে কাছাকাছি থাকা চালের স্তূপকে। আর যে বাসনপত্র চাল টানছে, তা যে ধাতু দিয়ে তৈরি তার দাম নাকি আন্তর্জাতিক বাজারে আকাশছোঁয়া। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে একরকম প্রতিযোগিতাই শুরু হয়ে গেল বাড়িতে বাড়িতে। যে যার বাসনপত্র আর চাল জড়ো করে হা-পিত্যেশ করে ‘চাল টানা’-র অপেক্ষায়। তৈরি হল অশিক্ষা, গুজব আর লোভের ত্রিভুজ।
সুযোগটা লুফে নিয়েছিল কিছু প্রতারক। যারা ধাতু বিক্রির এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দিয়ে ঘরে ঘরে ঢুঁ মারতে শুরু করল। এবং প্রতিশ্রুতি দিল, কিছু টাকা অগ্রিম দিলে তারা বাসনকোসনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করে দেবে। অনেকে বিশ্বাস করে ঠকলেন। উল্লেখ্য, শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের অন্যান্য রাজ্যেও বিভিন্ন সময়ে এই ‘rice pulling trick’-এর নামে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছিল।
উত্তর চব্বিশ পরগনায় ‘চাল টানা’-র সক্রিয় চক্রগুলির কয়েকটিকে পাকড়াও করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। কিন্তু লাভ হল না বিশেষ। শ্যামবর্ণ মাঝারি উচ্চতার মোটা লোকের কথা কেউ কেউ বলল বটে, কিন্তু ওটুকুই। নাম-ঠিকানার হদিশ মিলল না। যে তিমিরে ছিল, তদন্ত রয়ে গেল সেই তিমিরেই।
আপ্রাণ চেষ্টা করেও যখন সূত্র অধরা থাকে, তখন হতাশাগ্রস্ত না হয়ে পড়াটা দক্ষ তদন্তকারীর আবশ্যিক গুণের মধ্যে পড়ে। গোয়েন্দারা ঠিক করলেন, আবার শূন্য থেকে শুরু করবেন। ফিরে যাওয়া হল হোটেলে। শুরু হল আর এক প্রস্থ প্রশ্নোত্তর হোটেলকর্মীদের নিয়ে। ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনন্ত ধৈর্য লাগে একই প্রশ্ন অনেককে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অসংখ্যবার করতে। তবু করে যেতেই হয়, কার কথায় কী কখন বেরিয়ে আসে তার অপেক্ষায়। বারবার তোতাপাখির মতো আউড়ে যেতে হয়, আর একটু ভেবে দেখুন, আর কিছু মনে পড়ছে?
সম্ভাব্য সূত্র বেরিয়েও এল এক কর্মীর কথায়। রুম সার্ভিসে কাজ করেন। জানালেন, ৬ তারিখ দুপুরে এক প্লেট চিকেন পকোড়া আর স্যালাডের অর্ডার এসেছিল ১০২ নং রুম থেকে। এ তথ্য আমরা হোটেলের নথি থেকে আগেই পেয়েছিলাম, অজানা ছিল না। প্রথম অর্ডারের কিছুক্ষণ পর রুম সার্ভিসে এসেছিল দ্বিতীয় অর্ডার, চিকেন পকোড়া আর এক প্লেট। এটাও জানাই ছিল। বাড়তি কিছু জানালেন কর্মীটি। বললেন, দ্বিতীয় বার যখন খাবার দিয়ে বেরিয়ে আসছেন, দুই বোর্ডারের মধ্যে তর্কাতর্কি হচ্ছিল। কী নিয়ে তর্ক? কর্মীটির যতদূর মনে পড়ছে, ‘সার্কাস’ শব্দটি শুনেছিলেন কয়েকবার।
‘সার্কাস’? এ-ই কি তা হলে সেই কাঙ্ক্ষিত সূত্র? এরা কি সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল কোনও ভাবে? ঘটনার আগের দিন সার্কাস দেখেছিল? ঠকিয়েছিল কোনও সার্কাসের কর্মীকে?
আজকাল সার্কাসের সেই রমরমা নেই। যখনকার কথা লিখছি, তখন ছিল। শহরে তো বটেই, গ্রামেগঞ্জেও তুমুল জনপ্রিয় ছিল সার্কাস। খুনের ঘটনা ফেব্রুয়ারি মাসের, শীত তখনও ছুটি নেয়নি। সার্কাসের দলগুলিও তাঁবু গোটায়নি। হইহই করে বেরিয়ে পড়া হল, চষে ফেলা হল শহর ও আশেপাশের জেলার নামী-অনামী সার্কাস। সম্ভাব্য আততায়ীর ছবি (বিবরণ অনুযায়ী হাতে আঁকা) দেখিয়ে অনুসন্ধান হল যতরকম ভাবে সম্ভব। ফল কিন্তু শূন্য, আততায়ীর পরিচয়ের সামান্যতম ইঙ্গিতও পাওয়া গেল না।
এ বার? কূলকিনারা পাওয়ার আর রাস্তা কই? হতাশ তদন্তকারী দল ফিরছিল নৈহাটির একটি সার্কাসের খোঁজখবর নিয়ে, শূন্য হাতেই। কেসের কিনারা বোধহয় আর হল না, এই আক্ষেপকে সঙ্গী করে। কিন্তু ওই যে, “কখনও সময় আসে, জীবন মুচকি হাসে, ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা…”। কলকাতা ফেরার পথেই কিনারাসূত্র এল আচম্বিতে, পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতোই।
গাড়ি ছুটছিল নৈহাটি পেরিয়ে জগদ্দলের দিকে, ঘোষপাড়া রোড ধরে। পরিশ্রান্ত অফিসারেরা ঠিক করলেন, কোথাও গাড়ি থামিয়ে একটু চা খাবেন। ড্রাইভারের বাড়ি নোয়াপাড়ায়। বললেন, সামনেই সার্কাস মোড়। ওখানে দাঁড় করাচ্ছি, ভাল দোকান আছে। গাড়ি দাঁড়াল জগদ্দলের সার্কাস মোড়ে। চা খেতে খেতে হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখলেন এক অফিসার। অন্যদের বললেন, আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে, রুম সার্ভিসের ছেলেটা পুরোটা খেয়াল করেনি। সার্কাস মোড়ের ‘সার্কাস’-টুকু শুধু স্মৃতিতে থেকে গিয়েছে। আততায়ী যে প্রতারকদের সঙ্গে ওঠাবসা করেছিল, সবই তো উত্তর চব্বিশ পরগনার। সার্কাস মানে এই সার্কাস মোড় নয় তো? অন্যরা ভাবলেন, সত্যিই তো, কর্মীটি তো আর আড়ি পাততে ঘরে ঢোকেনি। অত খেয়াল করা বা মনে রাখার কথাও নয়। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর ‘সার্কাস’-ই হয়তো শুধু মনে করতে পেরেছে। খোঁজ নিয়ে দেখাই যাক না সার্কাস মোড়ের সংলগ্ন এলাকায়।
