কেস নম্বর ৪৯, তারিখ ০৭.০২.২০০৩। থানা, আগেই লিখেছি, বউবাজার। খুনের মামলা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায়।
ধর্মতলা থেকে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ধরে উত্তর দিকে হাঁটা দিলে ডান হাতে পড়ে যদুনাথ দে রোড। মধ্য এবং উত্তর কলকাতার বহু পুরনো রাস্তাগুলি যেমন হয়। চাকচিক্য নেই, আভিজাত্য আছে। নতুনের দেখনদারি নেই, পুরনো সেই দিনের কথা আছে। ‘হোটেল পেঙ্গুইন’ এই রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই। এ অঞ্চলে যথেষ্ট নামডাক আছে এই হোটেলের। গুগল ম্যাপে ‘যদুনাথ দে রোড’ লিখে সার্চ দিলে দুটো কাছাকাছি দিকচিহ্ন পাবেন। একটা সেন্ট জোসেফস্ কলেজ, অন্যটা এই হোটেল পেঙ্গুইন।
৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৩। সকাল গড়িয়ে একটু বেলার দিকে ফোন বাজল বউবাজার থানায়, স্যার, হোটেল পেঙ্গুইন থেকে বলছি। তাড়াতাড়ি আসুন, মার্ডার! থানা থেকে গাড়িতে খুব বেশি হলে পাঁচ মিনিটের দূরত্ব, অফিসাররা ছুটলেন। খবর গেল ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে। তড়িঘড়ি রওনা দিলেন হোমিসাইড শাখার গোয়েন্দারাও।
কী ব্যাপার? হোটেলের দু’তলায় রুম নম্বর ১০২, ডাবল-বেড। ৬ তারিখ সকালে দু’জন এসে ওই রুমে ওঠেন। রেজিস্টারে নাম রয়েছে, সুমন বিহারি আর মতিলাল সাউ। সন্ধের দিকে মতিলাল হোটেল থেকে বেরিয়ে যান। রাতে ফিরতে দেখেনি কেউ। পরের দিন সকালে হোটেলের হাউসকিপিং-এর কর্মীরা নিয়মমাফিক ঘরে ঘরে যাওয়া শুরু করলেন। শুধু ১০২ নম্বরের দরজা কিছুতেই খুলছে না, বারবার বেল বাজানো আর ‘নক’ করা সত্ত্বেও। কর্মীরা অপেক্ষাও করলেন কিছুক্ষণ। হয়তো বেশি রাত করে শুয়েছেন বোর্ডাররা, গভীর ঘুম ভাঙছে না সহজে। আধঘণ্টা পর আবার ডাকাডাকি, দরজায় শুধু টোকা নয়, এবার রীতিমতো ধাক্কা। তবু কোনও সাড়াশব্দ নেই। সন্দেহ এবং আশঙ্কা গাঢ় হল। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন ম্যানেজার।
হোটেল পেঙ্গুইন
ঘরের ভিতরের দৃশ্য এইরকম। অবিন্যস্ত একটি বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছেন সুমন বিহারি। নাড়ি টেপার দরকার নেই, এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, প্রাণহীন শরীর। মৃতের শরীরে সাদা শার্ট, হাফ-হাতা ক্রিমরঙা সোয়েটার, ছাই রঙের ট্রাউজার। নাকমুখ দিয়ে চুঁইয়ে পড়া রক্ত জমাট বেঁধে আছে আশেপাশে। শরীরে আর কোথাও কোনও ক্ষতচিহ্ন নেই। লক্ষণ যা, সম্ভবত শ্বাসরোধ করে খুন। একটি খালি বিয়ারের বোতল ঘরের এক কোণে। আর ঘরের ডেস্কের উপর ৬ তারিখের ‘সংবাদ প্রতিদিন’ কাগজটি পড়ে। বারো পাতার কাগজের একটি পাতা নেই।
অনেকেই জানেন হয়তো, অপরাধের ঘটনাস্থলকে পুলিশি পরিভাষায় বলে P.O. (Place of Occurrence)। যে-কোনও অপরাধের তদন্তে P.O. হল সেই প্রথম সিঁড়ি, যার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণেই শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছনোর চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে কখনও কখনও। গোয়েন্দারা কিচ্ছু বাদ দিলেন না ঘরের। বিয়ারের বোতলটি খুঁটিয়ে দেখা হল। ‘ডেভেলপ’ করার মতো স্পষ্ট হাতের ছাপ নেই। তবু নেওয়া হল, যৎসামান্য যা পাওয়া গেল। ৬ তারিখের ‘সংবাদ প্রতিদিন’ কাগজটি সংবাদপত্রের অফিস থেকে আনা হল চটজলদি। যে পাতাটি ঘরে পাওয়া কাগজে ছিল না, সেটি দেখা হল মন দিয়ে। নাহ্, তদন্তে সাহায্য করার মতো কিছু নেই। ঘরে পাওয়া কাগজটির বাকি পাতাগুলিতেও কোথাও কিছু নেই হাতে লেখা, যা দিশা দেখাতে পারে।
রুম নং ১০২
বিছানার চাদর-বালিশ-তোশক, ডাস্টবিনের আনাচকানাচ, খাট-চেয়ার-টেবিল, আয়না-সিলিং ফ্যান-এসি, মায় বাথরুমের বেসিন-কমোড-সিস্টার্ন, ঘরের প্রতিটি সেন্টিমিটার-মিলিমিটার চিরুনিতল্লাশি করেও এমন কোনও সূত্র মিলল না, যা দিয়ে আততায়ীর কাছে পৌঁছনোর প্রাথমিক দিকনির্দেশ সম্ভব। মৃতের ট্রাউজ়ারের পকেট থেকে একটি নোটবুক ছাড়া, যাতে বেশ কিছু নাম-ঠিকানা, কিছু ফোন নম্বর। বেশ উৎসাহব্যঞ্জক ‘ক্লু’, ভাবলেন অফিসাররা।
নোটবুকের আদ্যোপান্ত দেখা হল। লিখে রাখা নাম-নম্বর যাচাই করে নিহত ব্যক্তির শনাক্তকরণ বিশেষ কষ্টসাধ্য হল না। মৃতের নাম সুমন বিহারি নয়। ভুল নামে উঠেছিলেন হোটেলে। আসল নাম তপন দাস, থাকতেন তপসিয়া থানার রাইচরণ পাল লেনে পেয়িং গেস্ট হিসেবে। পূর্ণচন্দ্র সাহা নামের এক মাঝবয়সির বাড়িতে। সাহাবাবু দেখা গেল নিপাট ভদ্রলোক, শনাক্ত করলেন মৃতকে। বললেন, তপন কম কথা বলতেন। মাঝে মাঝে কিছু লোকজন দেখা করতে আসতেন তাঁর সঙ্গে। তপন বলেছিলেন ব্যবসা করতেন, তবে ঠিক কীসের ব্যবসা, বিশেষ কিছু জানেন না সে ব্যাপারে। তবে তপন যে অবিবাহিত, এটুকু জানতেন। আত্মীয় বলতে নিহতের এক ভাইয়ের খোঁজ পাওয়া গেল খড়দহে। যিনি জানালেন, তপনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল না দীর্ঘদিন।
দাহ হওয়ার আগে ময়নাতদন্তে পাওয়া গেল প্রত্যাশিত তথ্য, খুন শ্বাসরোধ করেই।
‘হোটেলের ঘরে সঙ্গীকে খুন করে আততায়ী ফেরার, অন্ধকারে পুলিশ’ জাতীয় হেডিং দিয়ে খবর হল কাগজে। শহরে নাগরিক-নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হল। আর অবধারিত চাপ তৈরি হল গোয়েন্দা বিভাগের উপর। কিনারা চাই, এবং দ্রুত। খুনিকে, সে যে-ই হোক, ধরে আনতে হবে।
লাও তো বটে, কিন্তু আনে কে! সত্যিই তখন অন্ধকারেই পুলিশ। হোটেলের কর্মীরা যাঁরা ছিলেন ৬ তারিখ ভোর থেকে পরের দিন ঘরের দরজা ভাঙা পর্যন্ত, কথা বলা হল সকলের সঙ্গে। কেমন দেখতে ছিল মৃতের সঙ্গীকে? উত্তরে যা পাওয়া গেল, তাতে এক ইঞ্চিও এগোল না তদন্ত। মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রং সামান্য চাপা, চেহারা একটু মোটার দিকে। এটুকুতে হয়? এমন চেহারার শ’পাঁচেক লোক তো হোটেলের এক কিলোমিটারের মধ্যে পাওয়া যাবে অনায়াসে। চশমা ছিল? না। টাক ছিল? না। অন্য কোনও বিশেষত্ব চেহারায়, কোনও কাটা দাগ মুখে, বা খুঁড়িয়ে হাঁটার প্রবণতা? না স্যার, মনে পড়ছে না। কথা বলার কোনও বিশেষ ভঙ্গি? খেয়াল করিনি স্যার, হিন্দিতে কথা বলছিল রেজিস্টারে নাম লেখার সময়, তবে বাংলা টান ছিল।
