বিচারক লিখলেন ১ জুলাই, ২০০৪-এর রায়ে, “এটি বিরলের মধ্যে বিরলতম কেসের পর্যায়ভুক্ত। শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর সদস্য হয়েও দোষীরা যেভাবে নির্বিচারে গণপ্রহারে খুন করেছে বাহিনীরই আর এক অফিসারকে, তা অভাবনীয়। শুধুমাত্র দোষীদের বয়স বিবেচনা করে আমি প্রাণদণ্ড দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম, যাবজ্জীবন কারাবাসে দণ্ডিত হল দোষীরা।”
মামলা গেল হাইকোর্টে। নিম্ন আদালতের রায়কে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সাজা বহাল রাখলেন উচ্চ আদালত। যাঁদের রায়ের প্রথম লাইনটি ছিল, “Once upon a time, there lived in the city of joy a soul who pledged his mortal frame to the battery of assault before a group of revelers when he had sought to prevent their onslaught on a damsel in distress, whom, they had zeroed on after trailing her two wheeler.” দুটি রায়েই লিপিবদ্ধ ছিল অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা। নগরপালের প্রতি অনুরোধ ছিল নিখুঁত তদন্তের বিভাগীয় স্বীকৃতি দিতে।
সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করল অভিযুক্তরা। হাইকোর্টের রায়ে চোখ বুলিয়ে সর্বোচ্চ আদালত শুনানির প্রয়োজনই মনে করলেন না। সরাসরি নাকচ করে দিলেন আবেদন।
বাপির মা-বাবা প্রয়াত হয়েছেন। স্ত্রী সোমার চাকরির ব্যবস্থা করেছিল কলকাতা পুলিশ, বাপির মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই। বর্তমানে লালবাজারে ‘আর্মস অ্যাক্ট’ সেকশনে কর্মরতা। বড়ছেলে সোমশুভ্র এখন একুশ। কলেজের পাট চুকিয়ে চাকরির সন্ধানে। ছোট শঙ্খশুভ্র ক্লাস নাইন।
বাপি সেনের মৃত্যুর ইতিবৃত্ত যখন দিনের পর দিন দখল করে রেখেছিল খবরের কাগজগুলোর প্রথম পাতার সিংহভাগ, বিস্তর নিউজ়প্রিন্ট খরচ হয়েছিল আলোচনায়, কেন প্রকাশ্যে এলেন না নিগৃহীতা? যাঁকে বাঁচাতে গিয়ে অকালপ্রয়াণ পঁয়ত্রিশের তরতাজা অফিসারের, তিনি কেন নেপথ্যচারিণী হয়ে থাকলেন এটা জেনেও, তাঁর সাক্ষ্য অপরাধীদের শাস্তিপ্রাপ্তি নিশ্চিত এবং ত্বরান্বিত করবে? স্বয়ং নগরপালের আন্তরিক আবেদনেও কেন রহস্যাবৃতই রেখে দিলেন পরিচয়? ভোগেননি বিবেকের দংশনে, মনুষ্যত্বের তাড়নায়?
উত্তর অজানাই রয়ে গিয়েছে। তবে নির্বিচার দোষারোপের আগে যুবতীর দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিচার্য বোধহয়। জানতেন, প্রকাশ্যে এলে পড়তে হবে পুলিশি জেরার মুখে, যা অবধারিত গড়াবে আদালতে সাক্ষ্যদান পর্বে। চাননি হয়তো ওই আইনি অণুবীক্ষণে নিজেকে মেলে ধরতে। আইন-আদালত-পুলিশ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-আশঙ্কা তো থাকেই। জানতেন, গসিপ-বুভুক্ষু মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়বেই ব্যক্তিজীবনের কাটাছেঁড়ায়, জেরবার হয়ে যাবেন ‘এক্সক্লুসিভ’ সাক্ষাৎকারের টানাহ্যাঁচড়ায়। পারেননি হয়তো সেই সম্ভাব্য সামাজিক চাপ সহ্য করার সাহস দেখাতে। সবাই পারেন না। বস্তুত, অধিকাংশই পারেন না। আর সেই ‘না-পারা’টার দায় সামাজিক প্রেক্ষিতকে উপেক্ষা করে পুরোটাই ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেওয়া কিঞ্চিৎ অন্যায্যই।
এবং এই একুশ শতকের প্রায় বছর কুড়ি কেটে যাওয়ার পরও যখন শ্লীলতাহানির ঘটনায় মধ্যযুগীয় প্রশ্ন ওঠে নিগৃহীতার বেশভূষা নিয়ে, কে বলতে পারে, নামধাম জানলে সামাজিক বিচারসভাই বসে যেত হয়তো কোনও কোনও মহলে, কাঠগড়ায় হয়তো দাঁড় করিয়ে দেওয়া হত যুবতীকেই, মধ্যরাতে পুরুষসঙ্গীর সঙ্গে নৈশভ্রমণের ‘অপরাধে’? সাহস দেখালে ভালই হত, স্বীকার করি। কিন্তু না দেখানোর মধ্যেও তেমন গর্হিত কিছু দেখি না।
বাপি সেনের হত্যা আজও দগদগে ক্ষতচিহ্ন হয়ে আছে কলকাতা পুলিশ পরিবারের মননে। রবিঠাকুর লিখেছিলেন, “সত্যরে লও সহজে”। উনি ক্রান্তদর্শী ছিলেন, ওঁর মতো কি আর ভাবতে পারি আমরা সাধারণরা, হাজার চেষ্টা করলেও?
সব সত্যি কি আত্মস্থ করা যায় অত সহজে? সহজে কি আর মেনে নেওয়া যায় এক সহকর্মীর এভাবে অকালমৃত্যু, এক অসহায় যুবতীর আব্রু রক্ষা করতে গিয়ে?
১.১১ দ্য বিলিয়ন ডলার কেস
[হোটেল পেঙ্গুইন হত্যামামলা
তদন্তকারী অফিসার শুভাশিস ভট্টাচার্য]
“নো স্যার! টেলিফোন ইয়েস, টেলিগ্রাফ ইয়েস, টেলিস্কোপ ইয়েস, টেলিপ্রিন্টার ইয়েস, বাট টেলিপ্যাথি?… নো স্যার!”
‘সোনার কেল্লা’-র দৃশ্য মগজে হানা দিয়ে যায় লেখা শুরু করতে গিয়ে। কপালজোরে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ‘আসল’ ড. হাজরা, সারা মুখে ব্যান্ডেজ, সাহায্য চাইতে এসেছেন রাজস্থানের থানায় অপহৃত মুকুলের খোঁজে। কৌতুক আর অবিশ্বাসের মিশেল ইনস্পেকটরের চোখেমুখে। ড. হাজরা ‘প্যারাসাইকোলজিস্ট’ হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে কিছুটা ঘাবড়েই গেলেন অফিসার, এ শব্দ কস্মিনকালে শোনেননি। ড. হাজরা তবু শেষ চেষ্টা করলেন মরিয়া, “আপ টেলিপ্যাথি জানতে হ্যায়?” এর পরই অফিসারের সেই “নো স্যার!…”
বিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন ইয়েস, বিলিয়ন ডলার স্মাইল ইয়েস, বিলিয়ন ডলার ডিল ইয়েস, বাট বিলিয়ন ডলার নোট?
আমাকে-আপনাকে প্রশ্ন করলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবে ওই অবধারিত “নো স্যার!” যেমন হয়েছিল আমাদের হোমিসাইড বিভাগের গোয়েন্দাদের, আজ থেকে বছর পনেরো আগে বউবাজার থানার একটি খুনের মামলায়। কিনারা হওয়ার পর আদালতের বিচারপর্বে যে কেসের নামই হয়ে গিয়েছিল, ‘দ্য বিলিয়ন ডলার কেস।’
