ড্রাইভার মধুকান্ত এবং হেল্পার মেওয়ালাল, পুলিশি জেরায় যাদের বয়ান হুবহু মিলে গিয়েছিল বাপির বন্ধুদের বিবরণের সঙ্গে, বিরূপ সাক্ষ্য দিলেন আদালতে। সম্পূর্ণ উলটো কথা বলে বাপির মদ্যপ অবস্থায় পড়ে যাওয়ার তত্ত্ব সমর্থন করলেন।
সে-রাতে বাপি মদ্যপ ছিলেন, প্রমাণ করতে আদালতে পেশ করা হল মেডিক্যাল কলেজের আউটডোরের টিকিট। যাতে আঘাতের প্রাথমিক বর্ণনার পাশাপাশি লেখা ছিল, “two pegs of alcohol”। যার সূত্র ধরে প্রয়াত বাপির অসংযমী জীবনযাপনের সম্ভাব্য তত্ত্বও বিস্তারে আলোচিত হল আদালতে।
বলা হল, Test Identification Parade-এ বাপির বন্ধুরা যে অভিযুক্তদের সরাসরি শনাক্ত করেছিলেন, তা প্রমাণ হিসেবে মূল্যহীন। রাত সোয়া একটার সময় ঘটনাস্থলে এত আলো কোথায় যে মুখ চিনে রাখা যাবে? পুরোটাই গাঁজাখুরি গপ্পো, ফাঁসানো হচ্ছে অভিযুক্তদের।
দুর্ঘটনার কাল্পনিক তত্ত্ব খণ্ডন করতে সরকারি আইনজীবীর সহায় হল তদন্তকারী অফিসার অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠাসবুনোট চার্জশিট, যা তৈরি হয়েছিল যত্নশীল অধ্যবসায়ে।
ময়নাতদন্তে জানা গিয়েছিল, আঘাতের তীব্রতায় মাথার খুলিতে একাধিক চিড় ধরেছিল বাপির। শরীরের বাকি অংশে অগুনতি আঘাতচিহ্ন তো ছিলই। ডাক্তার স্পষ্ট লিখেছিলেন, মাথায় এবং শরীরের একাধিক আঘাতের কারণেই মৃত্যু, “ante-mortem and homicidal in nature.” দুর্ঘটনা নয়, খুনই।
অতনু জানতেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়ে বিচারপর্বে চাপানউতোর অনিবার্য। তাই রিপোর্টের বিষয়ে লিখিত মতামত নিয়েছিলেন ফরেনসিক মেডিসিনের দিকপাল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. অজয় গুপ্তের। যিনি তখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্ৰধান।
অধ্যাপক গুপ্ত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখে সবিস্তার মতামত দিলেন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানালেন, আঘাত গাড়ি থেকে পড়ে হয়নি (nothing to suggest primary and secondary impact of a vehicle)। আরও লিখলেন, বচসা-হাতাহাতি দিয়েই সম্ভবত ঘটনার শুরু, কিছু ‘defensive wounds’ বা আত্মরক্ষাজনিত ক্ষতচিহ্নও ছিল বাপির শরীরে। কিন্তু মৃতের শরীরের যত্রতত্র অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন জানাচ্ছে, খুন করার উদ্দেশ্যেই লাথি-কিল-ঘুষি চলেছিল লাগামছাড়া। খুলিতে যে তীব্রতায় আঘাত লেগেছে একাধিক জায়গায়, সেটা শুধু ট্রামলাইনে পড়ে গিয়ে সম্ভব নয়। ভারী বুটজুতো জাতীয় কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়েছিল একবার নয়, বারবার।
উদ্ধৃত করি কয়েক লাইন, “Considering the site, size and disposition of injuries on the person of Bapi Sen, it could be concluded that the injuries resulted from fists, blows and kicks by healthy adult individuals with great force that was sufficiently strong to cause fracture of skull with intracranial and intracerebral injuries.”
বাপি কি সে-রাতে মদ্যপান করেছিলেন? আউটডোরের টিকিট যখন বাপির মৃত্যুর পর বাজেয়াপ্ত করেছিলেন অতনুবাবু, তাতে লেখা ছিল, “Beaten by fists, blunt injury, two pegs of alcohol.”
আশ্চর্যের, যিনি লিখেছিলেন, তাঁর কোনও সই ছিল না টিকিটে। আরও বিস্ময়ের, এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, টিকিটে দু’রকম হাতের লেখা। আলাদা রঙের কালিতে। কোনও রকম রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই কীভাবে লিখে দেওয়া হল নির্দিষ্টভাবে দু’ পেগের কথা? সে-রাতে বাপিকে নেশাগ্রস্ত প্রমাণ করতে তথ্যবিকৃতি ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল কোনও কোনও মহল থেকে, পরিষ্কার। ডক্টর আগরওয়াল তাঁর সাক্ষ্যে বলেছিলেন স্পষ্ট, পেশেন্টকে মেডিক্যাল কলেজ থেকে সিএমআরআই-তে আনার পর যখন প্রাথমিক পরীক্ষা করেছিলাম, আমার এতদিনের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, একবারও মনে হয়নি উনি ড্রিঙ্ক করেছিলেন।
আউটডোরের টিকিট এবং বাপির নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে যাওয়ার তত্ত্ব সোজা মাঠের বাইরে ফেলে দিয়েছিলেন নগর ও দায়রা আদালত। রায়ে আউটডোরের নথি প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “Exhibit B has been manufactured…. because of the fact that at that relevant point of time the police officer those who are investigating the case were searching for other documents and evidence…”
আদালত স্বীকৃতি দিলেন Test Identification Parade-এর ফলকেও। ডিসি ডিডি লিখিত তথ্য চেয়েছিলেন Calcutta Electric Supply Corporation (CESC)-এর কাছে। সে-রাতে ঘটনাস্থলে কি বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটেছিল কোনও? যদি না-ও ঘটে থাকে, জায়গাটি কি যথেষ্ট আলোকিত ছিল? ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা আলোর বিবরণ দিয়ে জানিয়েছিলেন CESC-র চিফ ইঞ্জিনিয়ার, কোনও বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটেনি সে-রাতে। আলোকিত ছিল অকুস্থল, মুখ চিনে রাখার পক্ষে যথেষ্ট ছিল সে আলো।
যেখানে বাপির অকালমৃত্যু হয়েছিল
ছেঁদো যুক্তির কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতেছিল দুই প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান। গণেশ বারিক এবং সমীর ঘোষ। ৩৮/১, নির্মলচন্দ্র স্ট্রিটের ‘জয় মাতাদি ট্রেডার্স’ নামে এক বেসরকারি সংস্থার দুই নিরাপত্তারক্ষী। যাঁরা রাতপাহারায় ছিলেন এবং ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছিলেন।
