বউবাজার থানার সাব-ইনস্পেকটর রক্ষাকর মণ্ডল বেরিয়েছিলেন নাইট রাউন্ডে, রাত একটা নাগাদ। সাড়ে তিনটে নাগাদ মোবাইলে ধরল লালবাজার কন্ট্রোল, মেডিক্যাল কলেজে যান শিগগির, ওখানে বোধহয় একটা assault কেস আছে।’ ছুটলেন রক্ষাকর, মেডিক্যাল কলেজের পুলিশ আউটপোস্টের এএসআই ব্রজকিশোর চৌধুরির কাছে জানলেন বৃত্তান্ত। খবর পেয়ে টালিগঞ্জ ট্রাফিক গার্ডের তৎকালীন ওসি অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় রওনা দিলেন মেডিক্যালে, সঙ্গে বাপির মেজদা অনুপ।
CT Scan-এর রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন, আঘাত গুরুতর, অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন। আলোচনার পর অনুপ সিদ্ধান্ত নিলেন, সিএমআরআই-তে নিয়ে যাবেন ভাইকে। জ্ঞান নিশ্চয়ই ফিরে আসবে দু’-একদিনের মধ্যে। দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, জ্ঞান আর ফেরার নয়।
সিএমআরআই-এর আইসিইউ পরবর্তী ঠিকানা বাপির। নিউরোসার্জেন ডা. অজয় আগরওয়ালের নেতৃত্বে শুরু হল চিকিৎসা। ভোর হয়ে এসেছে তখন, কন্ট্রোল মারফত পুলিশমহলে জানাজানি হয়ে গিয়েছে ঘটনাপরম্পরা। ইভটিজিং রুখতে গিয়েছিলেন ট্রাফিকের সার্জেন্ট। পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে পাঁচজন। যারা মেরেছে, তারাও শোনা যাচ্ছে পুলিশের লোক।
সকালেই ট্রাফিক কন্ট্রোলে দৌড়লেন রক্ষাকর। WB-04A-3450 নম্বরের ট্যাক্সির মালিকের নাম জানা গেল ডেটাবেস থেকে অল্পক্ষণের মধ্যেই। মধুকান্ত ঝা। ট্যাক্সির খোঁজও মিলল সহজেই। বিপিন বিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিটের পুলিশ মেসের সামনে, পাওয়া গেল মালিককেও। শুয়ে ছিলেন ট্যাক্সির মধ্যেই।
মধুকান্ত দ্বারভাঙার বাসিন্দা, চব্বিশ বছর আগে চলে আসেন কলকাতায়। পুলিশ মেসে রাঁধুনির কাজ দিয়ে শুরু। তারপর হিমালয় অপটিক্যালসে ড্রাইভারের কাজ দীর্ঘদিন। ’৯৬ -তে ধারদেনা করে নিজের ট্যাক্সি কেনেন। হেল্পার রেখেছিলেন দেশোয়ালি মেওয়ালাল গুপ্তাকে। পুলিশ মেসেই খাওয়াদাওয়া সারতেন দু’জন। চিনতেন মেসের পুলিশকর্মীদের প্রায় সবাইকেই।
কারা ট্যাক্সিতে ছিল গত রাতে? একটুও ভাবতে হল না মধুকান্তকে। এক কথায় বলে দিলেন পাঁচজনের নাম। মধুসূদন চক্রবর্তী, শ্রীদাম বাউরি, পীযূষ গোস্বামী ওরফে গোপাল, শেখরভূষণ গুপ্ত ওরফে ভোলা এবং শেখ মুজিবর রহমান। জানতে সময় লাগল না, পাঁচ কীর্তিমানই কলকাতা পুলিশের রিজার্ভ ফোর্সের কনস্টেবল। দিনের ডিউটির পর বর্ষশেষের রাতে বিনোদনে বেরিয়েছিলেন মধুকান্তের ট্যাক্সিতে সওয়ার হয়ে।
মধুসূদন আর পীযূষ গ্রেফতার হলেন মেস থেকেই। শ্রীদাম, মুজিবর আর শেখর ছিলেন না মেসে তখন। মধুসূদন আর পীযূষকে আদালতে পেশ করার সময় তদন্তকারী অফিসার রক্ষাকর আবিষ্কার করলেন, পালানোর পথ নেই বুঝে আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য হাজির শ্রীদাম-মুজিবর-শেখর। পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হল পাঁচজনকে, সকলেই অস্বীকার করলেন অভিযোগ।
খবর প্রচারিত হল, চরম লজ্জায় পড়ল কলকাতা পুলিশ। রক্ষকই ভক্ষক, এহেন নৃশংসতায়? এক মহিলার মানইজ্জত বাঁচাতে মরিয়া লড়তে গিয়ে সতীর্থদের গণপ্রহারেই মৃত্যুশয্যায় পুলিশ অফিসার? মুখ লোকানো দায়, কলঙ্ক ঢাকার জায়গাই বা কোথায়?
বাপি তখন সংজ্ঞাহীন আইসিইউ-তে। ‘যমে-মানুষে টানাটানি’ লেখা গেল না। টানাটানি তখন হয় যখন উভয়েরই আংশিক জেতার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে আগাগোড়া যমেরই নিরঙ্কুশ প্রাধান্য ছিল। বাপির শেষ নিশ্বাস ৬ জানুয়ারি, ভোর ৬টায়। খবর বেহালার বাড়িতে পৌঁছতে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন স্ত্রী সোমা, মা রেণুকা। গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল পর্ণশ্রী এলাকা। শুধু পর্ণশ্রী কেন, পুরো কলকাতাই ।
কলকাতা পুলিশের আংশিক কলঙ্কমোচনের একমাত্র উপায় ছিল দোষীদের দ্রুত শাস্তিবিধান। হোমিসাইড শাখার তৎকালীন ইনস্পেকটর অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্তমানে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার, দায়িত্ব নিলেন তদন্তের। পাখির চোখ, অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা।
তদন্ত হোঁচট খেল শুরুতেই। বিস্তর চেষ্টাচরিত্র করেও খোঁজ পাওয়া গেল না নিগৃহীতা মহিলার, যাঁর বয়ান অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত তদন্তের অগ্রগতিতে।
নগরপাল শেষমেশ খবরের কাগজে আবেদন জানালেন, ‘আপনি যে-ই হোন, আপনার মানসিক অবস্থা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। একান্ত অনুরোধ, অনুগ্রহ করে প্রকাশ্যে আসুন। আপনার হেনস্থা হওয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মারাত্মক জখম হয়েছিলেন আমাদের এক সহকর্মী বাপি সেন। আর বেঁচে নেই তিনি। দোষীদের শাস্তিদানে আপনার বয়ান খুবই জরুরি। আপনি সহযোগিতা করলে কৃতজ্ঞ থাকব। আপনার নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব কলকাতা পুলিশের।’
অপেক্ষাই সার, সাড়া মিলল না আবেদনে। তথ্যপ্রমাণ একত্রিত করে অতনুবাবু চার্জশিট পেশ করলেন ১০ মার্চ। শুরু হল বহুবিতর্কিত বিচারপর্ব।
অভিযুক্তদের আইনজীবী যুক্তি সাজালেন অনেক। তুলে দেওয়া যাক যুক্তিতক্কো আর গপ্পোর নির্যাস। এমন কোনও ঘটনা ঘটেইনি আদৌ। বাপি ওয়েলিংটনের কাছে ট্যাক্সি থামিয়ে নিজেকে সার্জেন্ট বলে পরিচয় দিয়ে লাইসেন্স আর ব্লু বুক দেখতে চান চালকের কাছে। বাপির মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরচ্ছিল। চালক লাইসেন্স দেখাতে অস্বীকার করায় বাপি পিছনের দরজা খুলে উঠতে যান। ট্যাক্সি তখন চলতে শুরু করেছে। চলন্ত ট্যাক্সিতে উঠতে না পেরে রাস্তায় ট্রামলাইনের উপর পড়ে যান বাপি। দাবি, সেই আঘাতেই মৃত্যু। শ্লীলতাহানি-টানির কোনও গল্পই নেই।
