উপরে যাঁদের নাম করলাম, অনেকদিনের পরিচিতি পরস্পরের। সকলেই মধ্যতিরিশ। বাপিও ছিলেন এই বন্ধুদলে। পর্ণশ্রী রিক্রিয়েশন ক্লাবের পাশের মাঠটা ছিল সান্ধ্য আড্ডার ঠিকানা।
সেদিন বাপির দুপুরের শিফটে ডিউটি ছিল। সোয়া আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে গেলেন ক্লাবের মাঠে। গৌতম-অশোক-নাজিবুল-কানাই তখন আড্ডা দিচ্ছেন জমিয়ে। কথায় কথায় অশোক বললেন, সঙ্গে গাড়িটা এনেছি। চল, পার্ক স্ট্রিট ঘুরে আসি রাতের দিকে। লাল মারুতি, WB-02F-4992, রওনা দিল পার্ক স্ট্রিটের উদ্দেশে। রাত কত হবে তখন? ন’টা-সোয়া ন’টা। গাড়ি একটু এগোনোর পর বাপি বললেন, তারাতলায় এক বন্ধুর বাড়ি রাত্রে যাব বলে কথা দিয়েছিলাম। একবার না গেলেই নয়। ওখান থেকে পার্ক স্ট্রিট যাওয়া যাবে।
বন্ধুর নাম সুব্রত বসু। তারাতলার কাছেই ‘নাবিকগৃহ’, মার্চেন্ট নেভির শিক্ষানবিশদের আবাসিক প্রশিক্ষণ সংস্থা। সুব্রতর বাবা সেখানে সুপারিন্টেনডেন্ট, থাকেন সরকারি কোয়ার্টারে। বাপিরা পৌঁছলেন। যথেষ্ট আদর-আপ্যায়ন করে সুব্রতর বাবা-মা একরকম বাধ্যই করলেন সবাইকে রাতের খাওয়াটা ওখানেই সারতে। খাওয়াদাওয়ার পর সুব্রতও সঙ্গী হলেন বাপি-গৌতম-অশোক-কানাই-নাজিবুলের। গন্তব্য পার্ক স্ট্রিট। বন্ধুদের সঙ্গে বাপি সেনের ‘The last ride together।’
বছরের শেষ রাতের পার্ক স্ট্রিট যেমন হয়। আলো আর রঙের দাঙ্গা লেগেছে যেন। কানের পরদা বিদ্রোহ করছে আওয়াজের ধাক্কায়। যতদূর চোখ যায়, ফুটপাথে কালো মাথা পিলপিল। গাড়িঘোড়াই বা কম যায় কীসে, স্রোত যেন শেষ হওয়ার নয়। সব রাস্তাই কি এখানে এসে মিশেছে?
গাড়িটা রাসেল স্ট্রিটের হবি সেন্টারের সামনে পার্ক করেছিলেন অশোক। রাত তখন সাড়ে বারোটা ছাড়িয়েছে, পায়ে হেঁটে চক্কর দেওয়া হয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকবার। বন্ধুরা ঠিক করলেন, এবার বাড়ি ফেরা যাক।
পার্ক স্ট্রিটে তখন পশ্চিমমুখী গাড়ির ভিড় তুঙ্গে। মল্লিকবাজারের দিক থেকে শয়ে শয়ে ঘরমুখী গাড়ির চাপে ‘বাম্পার টু বাম্পার’ ট্রাফিক। বাপির কলকাতার রাস্তা চেনা হাতের তালুর মতো। বললেন, জওহরলাল নেহরু রোড ধরলে অনেক দেরি হয়ে যাবে সামান্য রাস্তা পেরতেই। তার চেয়ে রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড ধরে যাওয়া ভাল। ওয়েলিংটন হয়ে গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ-সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পেরিয়ে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে দক্ষিণে যাওয়াই সবচেয়ে কম সময়ের। ওদিকে তুলনায় এখন কম চাপ থাকবে গাড়ির।
বাপির দেখানো রাস্তায় এগোল লাল মারুতি। ওয়েলিংটনের কাছাকাছি আসতেই আরোহীদের চোখে পড়ল দৃশ্যটা। যা লিখেছি শুরুর অনুচ্ছেদে। একটা ট্যাক্সি ধাওয়া করেছে মোটরসাইকেলকে। যা চালাচ্ছেন একজন পুরুষ, পিছনে এক মহিলা। পিছু ছাড়ছে না ট্যাক্সি, গতি বাড়িয়ে-কমিয়ে চলেছে মোটরসাইকেলের গা ঘেঁষে। ট্যাক্সির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা হাত ছুঁতে চেষ্টা করছে মহিলাকে।
একটু এগিয়ে একসময় দ্বিচক্রযান থামিয়ে দিলেন চালক। মহিলাও নেমে দাঁড়ালেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ট্যাক্সি থামিয়ে নেমে এল পাঁচ যুবক। মোটরসাইকেল-চালকের সঙ্গে সামান্য কথাকাটাকাটির পর সরিয়ে দিল একরকম ধাক্কা দিয়েই। মহিলাকে ঘিরে ধরে শুরু হল কুৎসিত ইঙ্গিত, শরীরে অবাঞ্ছিত স্পর্শ।
‘অশোক,… এগিয়ে গিয়ে দাঁড় করা তো!’ পিছনের মারুতির সামনের সিট থেকে ঘটনাটা লক্ষ করছিলেন বাপি। কিছুটা এগিয়ে ব্রেক কষল গাড়ি। দরজা খুলে নেমেই ছুটলেন বাপি, ‘কী হচ্ছেটা কী? ছাড়ুন ওঁকে!’
—তুই কে শালা ফোঁপরদালালি করার? পাতলা হয়ে যা চটপট।
এসব হুমকিতে দমে যাওয়ার ছেলে ছিলেন না বাপি, একজনের হাত ধরে ফেললেন, ‘ছেড়ে দিন ওঁকে। আমার নাম বাপি সেন, টালিগঞ্জ ট্রাফিক গার্ডের সার্জেন্ট।’
উত্তর এল, ‘তো? আমরাও কলকাতা পুলিশের লোক। ফোট্!’
বাপি লড়ার চেষ্টা করেছিলেন সাধ্যমতো। পাঁচ যুবকের বেপরোয়া কিল-ঘুষি-লাথির তোড় অবশ্য সামলাতে পারলেন না বেশিক্ষণ। গৌতম-অশোক-কানাই-নাজিবুলরা ছুটে এলেন আটকাতে, পেরে উঠলেন না পালটা মারের ধাক্কায়। বাপি ততক্ষণে পড়ে গিয়েছেন ট্রামলাইনের উপর, তবু এলোপাথাড়ি লাথি অব্যাহত। সঙ্গে সমবেত চিৎকার, মেরে ফেল শালাকে।
গৌতম-সুব্রত-কানাই আবার এগোলেন আটকাতে, ‘কী করছেন কী? ও পুলিশ অফিসার।’
কে শোনে কার কথা? ‘শুনলি না, আমরাও পুলিশের! ও কি একাই পুলিশের নাকি? মেরে ফেল শালাকে!’
প্রতিরোধের চেষ্টা ব্যর্থ হল বন্ধুদের, রাস্তায় পড়ে থাকা বাপির শরীরে লাথির আঘাত পড়তে লাগল বেলাগাম। বুকে-পেটে-মাথায়-ঘাড়ে, কোথায় নয়?
বাপি যখন ট্রামলাইনের উপর নিস্পন্দ পড়ে নতুন বছরের প্রথম প্রহরে, ট্যাক্সিতে উঠে চম্পট দিল পাঁচজন। কানাই নোট করে নিয়েছিলেন ট্যাক্সির নম্বর, WB-04A-3450।
মোটরসাইকেলটা কোথায় গেল? ঝামেলা যখন তুঙ্গে, নিঃশব্দে চলে গিয়েছেন চালক ও সঙ্গিনী। সেটা কি গণ্ডগোলের সময় খেয়াল করেছিল আক্রমণকারী পাঁচজন? শিকার হাতছাড়া হওয়ার রাগেই কি ওই উন্মত্ত গণপিটুনি?
মোটরসাইকেলের খোঁজ নেওয়ার সময় নেই তখন। অচৈতন্য বাপিকে নিয়ে মারুতি ছুটল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। CB Top (ক্যাজ়ুয়ালটি ব্লক)-এর বেড নম্বর ১৫৮-য় ঠাঁই হল বাপির। রাত তখন দুটো বা তার আশপাশ। প্রাথমিক পরীক্ষার পর নাইটডিউটিতে থাকা চিকিৎসক বললেন, অবিলম্বে CT Scan করা দরকার। বন্ধুরা তখন দিশেহারা। কেউ বাপির বাড়িতে খবর দিচ্ছেন, কেউ ছুটছেন মেডিক্যালের কোথায় কীভাবে CT Scan হবে তার খোঁজে।
