যখন লিফটের দিকে ফিরে আসছি, নুরুলকে করিডরের উলটোদিক থেকে আসতে দেখলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ভাই, এখানে এত রাতে?’ নুরুল বলল, রমজান সাহেবের সঙ্গে একটা দরকার আছে।”
গোয়েন্দারা মনজুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, এসব আগে বলেননি কেন?
—স্যার, পরের দিন যখন শুনলাম, রমজানভাই খুন হয়ে গিয়েছেন, ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সব বলতে গিয়ে যদি ঝামেলায় পড়ি, কোর্টকাছারি করতে হয়, কী দরকার?
ওদিকে রহস্যজাল পরতে পরতে খুলতে শুরু করেছে কিষাণগঞ্জের বাড়িতেও। যেখানে রমজানের পরিবারের খুঁটিনাটি তথ্যতালাশ চালাচ্ছিলেন গোয়েন্দারা। জেলার অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিবার, কঠিন হচ্ছিল আত্মীয়-পরিজন, পাড়াপ্রতিবেশী-পার্টিসদস্যদের মুখ খোলানো। কিন্তু খবর বের করাটাই তো কাজ আমাদের। যেন তেন প্রকারেণ।
কী-কখন-কেন-কীভাবের উত্তর ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এল প্রকাশ্যে।
১৯৮৯ থেকে ’৯৩, চার বছর রমজান আলির ব্যক্তিগত সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল নুরুল ইসলাম। ’৯১ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন রমজান। ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, ক্ষয়রোগও বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল শরীরে। চিকিৎসার জন্য দিল্লি গেলেন, সঙ্গে তালাত আর নুরুল। রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে বেশ কিছুদিন চিকিৎসাধীন থাকলেন রমজান এবং ক্রমে ঘনিষ্ঠতা বাড়ল তালাত-নুরুলের।
রমজান তখন পঞ্চাশোর্ধ্ব, নানা রোগভোগে জীর্ণ। তালাত সবে তিরিশ পেরিয়েছেন, নুরুলও সমবয়সি প্রায়। ঘি এবং আগুনের সহাবস্থানে যা হওয়ার, তাই হল। গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেন দু’জনে। মানসিক, শারীরিকও। চিকিৎসার পর কিষাণগঞ্জে ফিরলেন রমজান। কিছুদিনের মধ্যেই আঁচ করতে পারলেন তালাত আর নুরুলের ব্যাপারটা। একদিন দু’জনকে ধরে ফেললেন ঘনিষ্ঠ অবস্থায়। গালাগাল-মারধোর করে তাড়িয়ে দিলেন নুরুলকে। লেখার অযোগ্য শব্দ ব্যবহার করলেন তালাতের উদ্দেশে।
নুরুল দিল্লি চলে গেলেন, চাকরি নিলেন Mumbai Trading & Co–তে। রমজান ভাবলেন, আপদ গেল। কিন্তু সম্পর্ক ততদিনে গড়িয়েছে অনেকদূর। ভৌগোলিক দূরত্বের সাধ্য ছিল না আর তাতে ইতি টানার। নিয়মিত চিঠির আদানপ্রদান চলতে থাকল তালাত-নুরুলের। সপ্তাহে অন্তত দু’বার ফোনেও প্রেমালাপ।
ভাই হাফিজ আলম সৈরানি এবং খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কাছে তালাতের ব্যাপারে বিষোদ্গার করতেন এমএলএ সাহেব। রমজান-তালাতের পারস্পরিক অবিশ্বাস আর তিক্ততা কোন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তা বোঝা যায় দুটি নথি থেকে। প্রথমটা রমজানের ডায়েরির পাতা, যা উদ্ধার হয়েছিল কিষাণগঞ্জের বাড়ি থেকে। কিছু অংশ তুলে দিলাম।
‘আজ, ১৩/৪/৯২, বড় দুঃখের সাথে লিখছি। ভালবাসার ধারণাটাই বদলে গিয়েছে আমার।
লুকিয়ে লাভ নেই, আমার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে নিজের শারীরিক চাহিদা মেটাতে আমার স্ত্রী এমন একজনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, যার সঙ্গে মাত্র কয়েক বছরের আলাপ। এই অনাচার আমাকে সহ্য করতে হচ্ছে। দিনের পর দিন। স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, যখন এই সেদিন ও আমাকে বলল, প্রয়োজনে আবার বিয়ে করবে!’
দ্বিতীয়টা নুরুলকে লেখা তালাত সুলতানার একটি চিঠি, যেটা তিনি পোস্ট করেননি। এটিও উদ্ধার হয়েছিল ওই কিষাণগঞ্জের বাড়ি থেকেই। উর্দু চিঠির অংশবিশেষ রইল বঙ্গানুবাদে।
‘ডিয়ার,
আদাব।
চিঠি পেয়েছি।
এত দুঃখ পাচ্ছি এখানে যে ইচ্ছে করছে তোমার সঙ্গে দেখা করে সব দুঃখ হালকা করে নিই। লোকে ঠিকই বলে। অভীষ্টের খোঁজে আমরা এমন জায়গায় পৌঁছে যাই, যখন মনে হয় খুঁজতে খুঁজতে সব হারিয়ে ফেলেছি। ভয় হয়, তোমাকেও হারিয়ে ফেলব না তো? আমার জীবন বলতে তো তুমিই।’
ঘটনার পর আর দিল্লি ফেরেনি নুরুল। পালিয়েছিল বিহারে। জানুয়ারির শেষ থেকে পুলিশ বিহারের আনাচকানাচ চষে ফেলেছিল নুরুলের খোঁজে। একটা দল ঘাঁটি গেড়েছিল উত্তর দিনাজপুরে, অন্যটা বিহারে। মাসখানেক চোর-পুলিশ খেলার পর নুরুল ধরা পড়েছিল ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে, রায়গঞ্জের শিলিগুড়ি মোড় থেকে।
জেরাতে নুরুল স্বীকার করেনি কিছু, গোয়েন্দারা অকাট্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হাজির করা সত্ত্বেও। অনড় থেকেছে নিজেকে নির্দোষ ঘোষণায়, যুক্তি-তর্ক কিছুই ধোপে টিকছে না দেখেও।
রেণুলীনা সুব্বার সাক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু কে জানে কেন, উনি FIR–এ তালাতের প্রাথমিক বক্তব্যকেই ঘুরিয়েফিরিয়ে সমর্থন করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। পুলিশ বুঝেছিল, সত্য গোপন করছেন। রেণুলীনা নিজেও জানতেন নিশ্চিত, আসলে কী ঘটেছিল। কিন্তু বলেননি, হাজার প্রশ্নবাণের মুখেও নড়েননি একটুও। তালাতকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, পরিষ্কার। কিন্তু কেন? উত্তর পাইনি আমরা। সব কিছু জানা যায় না।
দ্রুত চার্জশিট পেশের পর দীর্ঘ বিচারপর্ব চলেছিল। তীব্র বাদানুবাদের সাক্ষী থেকেছিল আদালত। তালাত-নুরুলের আইনজীবী দাবি করেছিলেন, এটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। যে যুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ খুঁজে পায়নি আদালত। পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ঠাসবুনোট বুনিয়াদ তৈরি করেছিলেন তদন্তকারী অফিসার।
খাজা হাবিব হোটেলের রেজিস্টারে খুনের আগের দিন নুরুলের হাতের লেখার সঙ্গে পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন সংগৃহীত ‘handwriting specimen’–এর মিলে যাওয়া। পিসিও বুথের কলকাতা-দিল্লি ফোনের খতিয়ান, বুথমালিকের শনাক্তকরণ তালাতকে। মনজুর আলমের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে নুরুলের এমএলএ হস্টেলে ঘটনার রাতে উপস্থিতি প্রমাণ হওয়া। তালাত, তদন্তে জানা গিয়েছিল, বেশ কয়েকবার নিউ মার্কেটের সাব-পোস্ট অফিস থেকে মানিঅর্ডারে টাকা পাঠিয়েছিলেন নুরুলকে। তার রসিদের প্রতিলিপি উভয়ের সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে আদালতে পেশ হওয়া। উত্তর দিনাজপুরে জয়শ্রী কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্টিলাইজারের
