সাব-ডিস্ট্রিবিউটরশিপ গোপনে নিয়েছিলেন তালাত-নুরুল। সংশ্লিষ্ট প্রমাণ হাজির করা সেই ব্যবসায়িক অংশীদারির। এবং সর্বোপরি রমজানের ডায়েরির পাতার আক্ষেপ আর তালাতের পোস্ট-না-করা প্রেমপত্র।
নিম্ন আদালত তালাত-নুরুলকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা শুনিয়েছিল। হাইকোর্ট যা বহাল রেখেছিল। দু’জনেই এখনও সংশোধনাগারে।
ঠিক কী ঘটেছিল সে-রাতে? নুরুল-তালাত স্বীকার করেননি, রেণুলীনা কৌশলে এড়িয়েছেন। কিন্তু এঁদের তিনজনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করে, সব দিক বিচার করে তদন্তকারী দলের যা নিশ্চিতভাবে মনে হয়েছিল, তা এরকম।
নুরুল কলকাতায় এসেছিলেন তালাতের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু বাইরে দেখা করায় ঝুঁকি ছিল অনেক। দু’জনে ঠিক করেছিলেন, রাতে রমজান ঘুমিয়ে পড়লে নুরুল হস্টেলের ঘরে আসবেন। রেণুলীনার রাত্রিবাসটা হিসেবের বাইরে ছিল। রাত্রি সাড়ে দশটা-পৌনে এগারোটা নাগাদ গেটের বাইরের ‘সেন্ট্রি চেঞ্জ’ হচ্ছিল। পাহারা বদলের সময় নজরদারি একটু ঢিলেঢালা থাকেই। সেই সুযোগেই চাদরমুড়ি দিয়ে ঢুকেছিল নুরুল। ‘ভিজিটার্স রেজিস্টার’-এর দায়িত্বে যিনি ছিলেন রিসেপশনে, তাঁরও নজর এড়িয়ে গিয়েছিল।
তালাত দরজা খুলে রেখেছিলেন পৌনে এগারোটার পর। রমজান আর রেণুলীনা তার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়বেন, নিশ্চিত ছিলেন। ঘুমিয়ে পড়েওছিলেন ওঁরা। এগারোটা নাগাদ সন্তর্পণে ঢুকলেন নুরুল। পরদা ঘেরা জায়গায় একান্তে দু’জনে সময় কাটানোই ছিল উদ্দেশ্য।
বাদ সাধল ফিসফিস কথার আওয়াজে রমজানের ঘুম ভেঙে যাওয়ায়। উঠে পড়লেন, গলা ছেড়ে আওয়াজ দিলেন। রমজান বুঝে ফেলেছিলেন, নুরুল এসেছে। এবং নুরুল জানত, যেখানেই পালান, পার পাবেন না। রমজান ক্ষমতাশালী লোক, ধনেপ্রাণে অতিষ্ঠ করে দেবেন জীবন। এরপর রমজানের গলায় ফাঁস দেওয়া নুরুলের। রেণুলীনার সঙ্গে তালাতকেও বেঁধে ফেলার নাট্যরূপ। নুরুল বেরিয়ে গিয়েছিল মেন গেট দিয়েই। প্রহরায় থাকা পুলিশ সন্দেহ করেনি। ভেবেছিল, ঢুকেছে যখন, বৈধভাবেই ঢুকেছে। বৈধ অতিথিকে আটকানোর কথাও নয় বেরনোর সময়।
রমজানের মৃতদেহ, গলায় ফাঁস লাগানো
রাজনীতির কোনও প্যাঁচপয়জার ছিল না রমজান-হত্যায়। খুন, কিন্তু ছক কষে নয়। সে তালাতই হন বা নুরুল, দাগি আসামি তো আর ছিলেন না। খুন-পরবর্তী-চিত্রনাট্যে ফাঁকফোকর থেকে গিয়েছিল বিস্তর। আবেগ আর আক্রোশের তাৎক্ষণিক তাড়নাই ছিল চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেপথ্যে, পোড়খাওয়া অপরাধীর স্থিরমস্তিষ্ক নয়।
সত্যের অন্বেষণই তদন্তের মূল কথা, “to ascertain the truth”। তবে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী যে বিলাসিতা দেখাতে পারতেন, তা আমাদের, বাস্তবের সত্যসন্ধানীদের থাকে না। এক এবং অদ্বিতীয় ব্যোমকেশ উৎসাহী ছিলেন অপরাধীর মনস্তত্ত্বে, সত্য উদ্ঘাটনে। শাস্তিবিধানে তাঁর নিবিড় মনোনিবেশ বড় একটা দেখি না আমরা। অপরাধীর বাধ্যবাধকতা বিচার করে কখনও কখনও অব্যাহতি দেন সত্যিটা জানা হয়ে যাওয়ার পর, স্বজ্ঞানে মুক্তি দেন পুলিশের হাত থেকে। বিবেকের শাসনে জীবনভর যন্ত্রণা পাওয়াকেই যথেষ্ট শাস্তি মনে করেন।
বাস্তবের গোয়েন্দা রক্তমাংসের, আইনের চৌহদ্দির বাইরে যাওয়ার অধিকার তাঁর নেই। তাঁকে বাধ্যত নিরাবেগ হতে হয়। অভিযুক্তকে ধরা, সাক্ষ্যপ্রমাণ একত্রিত করা এবং আদালতে চার্জশিট দাখিল করা শাস্তিবিধান চেয়ে। অনেক অপরাধই ঘটে যায় বিচিত্র পরিস্থিতির জাঁতাকলে। তদন্তকারী অফিসার যতই নৈর্ব্যক্তিক মানসিকতায় রহস্যভেদ করুন, কখনও কখনও সহানুভূতি বা সম-অনুভূতি মননে প্রভাব ফেলেই। সেই প্রভাবের ছোঁয়াচ কাটিয়ে নির্মোহ তদন্ত কোনও কোনও ঘটনায় নেহাত সহজসাধ্য নয়।
আক্রম সাহেব কি কখনও আক্রান্ত হয়েছিলেন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের টানাপোড়েনে, যখন তদন্ত চলছিল মামলার, যখন একটু একটু করে পরদা উঠছিল রহস্যের? ভেবেছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে, কোন মনস্তাপে তালাত এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন? কুড়ি বছর সংসারযাপনের পর, তিন সন্তানের জন্মদাত্রী হয়েও? কে জানে?
জল্পনায় লাভও নেই বোধহয়। কথাই তো আছে, “the more you know, the more you know you don’t know.”
যত বেশি জানবে, ততই বেশি জানবে, জানা হয়নি বিশেষ।
১.১০ বয়স হয়েছিল পঁয়ত্রিশ
[বাপি সেন হত্যামামলা
তদন্তকারী অফিসার অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়]
মেরে স্বপ্নো কি রানি কব আয়েগি তু..
আয়ি রুত মস্তানি কব আয়েগি তু..
বিতি যায়ে জিন্দেগানি কব আয়েগি তু..
চলি আ.. আ তু চলি আ …
শেষ লাইনটা গাওয়া হচ্ছে কোরাসে। ট্যাক্সি থেকে মুখ বার করে এক যুবক তারস্বরে গাইছে। বলা ভাল, চেঁচাচ্ছে, আ তু চলি আ…। বিকৃত উল্লাসে গলা মেলাচ্ছে ট্যাক্সির ভিতরের বাকিরা, চলি আআআ…।
যাঁর উদ্দেশে নেশাতুর আহ্বান, মোটরসাইকেলের পিছনে বসা যুবতী, ততক্ষণে আতঙ্কের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছেন। হাত ধরে টানার চেষ্টা করছে ট্যাক্সির জানালা থেকে এক যুবক, অশ্লীল ইঙ্গিতসহ মন্তব্য ছিটকে আসছে, হ্যাপি নিউ ইয়ার ডার্লিং! কোনওক্রমে সামলাচ্ছেন যুবতী, পুরুষসঙ্গীকে বলছেন, তাড়াতাড়ি চালাও, ভয় করছে ভীষণ।
কী করে চালাবেন তাড়াতাড়ি? সম্ভব কখনও, যখন ইচ্ছেমতো গতি বাড়িয়ে-কমিয়ে ধাওয়া করছে ট্যাক্সি মিনিট দশেক ধরে? সামনে যে রাস্তা ধু ধু ফাঁকা, এমনও নয়। ওই মাঝরাতের রাজপথে তখনও গাড়ির জটলা যথেষ্ট। মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে দিলে ট্যাক্সিও কমাচ্ছে, বাড়ালে দ্রুত তাল মিলিয়ে পাশে চলে আসছে। আশেপাশে পুলিশও তো কই দেখা যাচ্ছে না। যত পুলিশ আজ পার্ক স্ট্রিটে। কী করা যায়, কী করা উচিত?
