তিন, টিম পাঠানো হবে উত্তর দিনাজপুরে এবং কিষাণগঞ্জে। পার্টিকর্মীদের নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও মুখ খুলছেন না কেউ। স্থানীয় স্তরে সোর্স লাগিয়ে খোঁজখবর নিতে হবে রমজানের পারিবারিক ব্যাপারে। বিষয়সম্পত্তি নিয়ে কোনও বিবাদ ছিল কি না, মৃত্যুতে রাজনৈতিক ভাবে কেউ লাভবান হতে পারত কি না, রমজান-তালাতের সম্পর্কে কতটা টানাপোড়েন ছিল ইত্যাদি।
ত্রিমুখী স্ট্র্যাটেজিতে সর্বাত্মক ঝাঁপাল লালবাজার। ফলও মিলল পরিশ্রমের, ধৈর্যের, অধ্যবসায়ের।
তদন্তকারী অফিসার মহম্মদ আক্রম রোজ নিয়ম করে দশ-বারোটা পিসিও বুথে ঘুরে ঘুরে কললিস্ট ঘাঁটতে শুরু করলেন। প্রথম কিনারাসূত্র এল সেখান থেকেই।
সেদিন সন্ধে হয়ে এসেছে প্রায়। জানুয়ারির শেষাশেষি। সারাদিন টো টো করে ঘুরেছেন আক্রম। শরীরে-মনে ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’-র রিংটোন বাজতে শুরু করেছে। ঠিক করলেন, আর গোটা তিনেক বুথ ঘুরে আজকের মতো দাঁড়ি টানবেন।
৩সি চৌরঙ্গি লেন। ছোট পিসিও বুথ, মালিক রঞ্জিত দাস। আদর-আপ্যায়ন করে বসালেন আক্রমকে, চা এল। কললিস্ট খুঁজতে খুঁজতেই খুচরো এ-কথা সে-কথার মাঝে রঞ্জিত বললেন, ‘স্যার, আপনারা তো সব ক’টা বুথ ঘুরছেন ক’দিন ধরে। ওই এমএলএ মার্ডারের ব্যাপারে, না?’
—হুঁ!
—স্যার, অভয় দেন তো একটা কথা বলি?
আক্রম চোখ তুলে তাকালেন। দৃষ্টিতে খুব একটা কৌতূহল আছে, এমনটা বলা যায় না।
গলার স্বর প্রায় খাদে নামিয়ে আনেন রঞ্জিত।
—স্যার, ম্যাডাম আমার বুথে প্রায়ই আসতেন ফোন করতে। ভাল আলাপ আছে আমার সঙ্গে।
—কোন ম্যাডাম?
—এমএলএ সাহেবের মিসেস।
আক্রম আবার চোখ তুললেন ফোন নম্বরের তালিকা থেকে। দৃষ্টি বদলে গিয়েছে এখন, উঠে পড়েছেন চেয়ার ছেড়ে। ক্লান্তি- শ্রান্তি উধাও।
—কোথায় করতেন ফোন?
—এসটিডি কল স্যার। দিল্লিতে।
—কোন নম্বর? শেষ কবে করেছেন?
—দশ মিনিট বসুন স্যার, বের করে দিচ্ছি। শেষ এসেছিলেন বোধহয় মাসখানেক আগে। স্পষ্ট মনে আছে। আর একবার চা বলি স্যার?
চা কেন, স্বর্গের অমৃতসুধা এনে দিলেও তাতে তখন আর রুচি নেই আক্রমের। সম্ভাব্য সূত্রের আভাস পেলে তদন্তকারী অফিসারের যা হয়, মনের তখন সেই অবস্থা। শিরা-ধমনীতে একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে উত্তেজনা-উৎকণ্ঠা-ঔৎসুক্য।
২০ অক্টোবর থেকে ১৫ ডিসেম্বর, বারোবার তালাত ফোন করেছিলেন দিল্লিতে। নম্বর ০১১-৭৩৮৬২৪। কথোপকথনের সময়সীমা কখনও তিন-চার মিনিট, কখনও আট-দশ। ওই বুথ থেকেই ফোন ঘোরালেন আক্রম। নম্বরটা দিল্লির একটা ব্যবসায়িক সংস্থার, নাম ‘Mumbai Trading & Co’। মালিকের নাম কলিম খান। যাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল কর্মচারীদের ব্যাপারে। বাংলা বা বিহারের কেউ আছে? এমন কি কেউ আছে যে কুড়ি তারিখ কাজে আসেনি?
—হাঁ, বাঙ্গাল সে এক হ্যায়। নুরুল, নুরুল ইসলাম। ষোলা তারিখ সে ছুট্টি লিয়া থা। লওট কে নেহি আয়া। কোই গড়বড় হ্যায় কেয়া?
এক মুহূর্ত দেরি করলেন না আক্রম। গাড়ি ছোটালেন লালবাজারে। ঝটিতি মিটিং সারলেন ডিসি ডিডি। সেই রাতেরই ট্রেন ধরতে রওনা হয়ে গেলেন অফিসারদের একটি দল। গন্তব্য দিল্লি।
পাশাপাশি ঠিক হল, যদি নুরুলই খুনি হয়, আর দিল্লি থেকে এসেই যদি খুনটা করে থাকে, আশেপাশের হোটেলে ওঠার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। আজ রাতেই হানা দিতে হবে দক্ষিণ ও মধ্য কলকাতার সমস্ত হোটেল-ধর্মশালায়। নুরুল ইসলাম বা অন্য কোনও নামে ১৬/১৭ তারিখ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে কেউ উঠেছিল কি না, খোঁজ নিতে হবে।
বেশি পরিশ্রমের দরকার পড়ল না। ঘণ্টা তিনেকের ছোটাছুটির পরই এমএলএ হস্টেল থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বের খাজা হাবিব হোটেলের রেজিস্টারে পাওয়া গেল নুরুল ইসলামের নাম। উঠেছিলেন ১৯ তারিখ সকালে, লিখেছিলেন ২২ তারিখ অবধি থাকবেন। কিন্তু ২০ তারিখ রাতেই টাকাপয়সা মিটিয়ে দিয়ে দশটা নাগাদ বেরিয়ে যান।
পরদিন সকালেই আরও প্রমাণ মিলল। সে-রাতে হস্টেলের ভিজিটার্স রেজিস্টারে যাঁদের নাম ছিল, তাঁদের সবাইকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় আর একটি দল জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছিল বেশ কয়েকদিন ধরে। জেরায় মনজুর আলম বলে একজন অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন, যেটা প্রথমবার বলেননি।
“রমজান সাহেব আমাদের এলাকার বিধায়ক। আমার বাড়ি চাকুলিয়া থানা এলাকায়। রমজান সাহেবের আদি বাড়ি কিষাণগঞ্জে, কিন্তু ওঁর আমাদের গ্রামের কাছেও একটা বাড়ি ছিল। রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের সঙ্গে আমাদের একটা জমিজমা সংক্রান্ত মামলা চলছিল অনেকদিন ধরে। সেই ব্যাপারে সাহায্য চাইতে বেশ কয়েকবার গিয়েছি এমএলএ সাহেবের বাড়ি। ওখানে নুরুলকে দেখেছি। রমজান সাহেবের ব্যক্তিগত সহায়ক ছিল নুরুল। ওর বাড়ি চাকুলিয়া থানারই বড়ডিহা গ্রামে। আলাপ ছিল আমার সঙ্গে।
২০ তারিখে কলকাতায় এসেছিলাম কাজে। উঠেছিলাম বেকার হস্টেলে এক বন্ধুর রুমে। রাত ১০টা নাগাদ করণদিঘির বিধায়ক সাজাদ আলির সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল এমএলএ হস্টেলে। ব্যবসায়িক সমস্যার ব্যাপারে। গিয়ে দেখি, সাজাদ সাহেবের রুম (২/৭) তালাবন্ধ।
আধঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। সাজাদ ভাই এলেন না। ভাবলাম, রমজান ভাইয়ের রুম থেকে ঘুরে আসি একবার। জানতাম, উনি কলকাতায় এসেছেন। হস্টেলে রুম ৩/১০-এই উঠতেন চিরকাল। সিঁড়ি দিয়ে চারতলায় উঠলাম। রুমের সামনে গিয়ে দেখলাম, ভিতর থেকে বন্ধ। আলো জ্বলছে না। ভাবলাম, ঘুমিয়ে পড়েছেন। অসুস্থ মানুষ, ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না।
