আমরা কিষাণগঞ্জের বাড়িতে তখন। ফিরে গিয়েছি চিকিৎসার পর। একদিন আমাকে আর রবিকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলেন আমার স্বামী। রবির সামনেই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন আমাকে। রবিকে ছাড়িয়ে দেন কাজ থেকে। সেই থেকেই রবির আক্রোশ রমজান সাহেবের উপর। আমি অবশ্য ভুল বুঝতে পেরেছিলাম। কোনও সম্পর্ক সেই থেকে রাখিনি রবির সঙ্গে।
আবার বলছি, আমি খুন করিনি। কোনও সম্পর্ক নেই খুনের সঙ্গে। খুন রবি করেছে।
২০ তারিখ রাতে সাড়ে দশটা নাগাদ আমি, সুব্বাদিদি আর এমএলএ সাহেব ঘরে ছিলাম। সুব্বাদিদি ঘুমিয়ে পড়েছিল। রমজান সাহেবের চোখে ড্রপ দেওয়ার পর আমি মেঝেতে শতরঞ্চি পেতে শুয়েছিলাম। দুটো আলাদা খাটে আমার স্বামী আর সুব্বাদিদি শুয়ে ছিল। ঘরের লাইট অফ করা ছিল। দরজা খোলা ছিল।
হঠাৎ রবি দরজা ঠেলে পরদা সরিয়ে ঢুকল ঘরে। বলল, ‘কাকুর (এই নামেই ডাকত ও রমজান সাহেবকে) শরীর কেমন দেখতে এসেছি।’ রবিকে দেখেই ভীষণ রেগে গেলেন রমজান সাহেব। খুব গালাগালি করলেন আমাকে, বললেন, ‘তোমার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতেই এসেছে হারামজাদা।’ রবিও ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, ‘আপনি দিদির জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছেন।’ বলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল রমজান সাহেবের উপর। আমি আটকানোর চেষ্টা করলাম, হাতেপায়ে ধরলাম। আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল রবি। আমি জ্ঞান হারালাম।
কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে দেখি, আমি সুব্বাদিদির খাটে শুয়ে। রমজান সাহেবের শার্ট আর গেঞ্জি দিয়ে আমার মুখ বাঁধা। সুব্বাদিদির মুখ বাঁধা ওঁর লাল শাল দিয়ে। এমএলএ সাহেব নিজের খাটে। গলায় শাড়ির ফাঁস দেওয়া। এর বেশি কিছু জানি না।
আমার হার্টের সমস্যা আছে। কিন্তু রমজান সাহেব কখনও আমার অসুখের ব্যাপারে যত্ন নেননি। তবু আমি ওঁর সেবাযত্নে কোনওদিন ত্রুটি রাখিনি। এবারও কলকাতায় আসা ওঁর চিকিৎসার জন্যই।”
ম্যাজিস্ট্রেট সব শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পুলিশের কাছে মিথ্যে বলেছিলেন কেন?’
তালাত সোজাসাপটা উত্তর দিলেন, ‘ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তা ছাড়া রবি শাস্তি পাক, এটা চাইনি। ওকে ভালবেসেছিলাম আমি। পরে মনে হল, সত্যিটা না বললে অন্যায় হবে।’
যাক, তা হলে কিনারা তো হল শেষমেশ! — এমনই প্রতিক্রিয়া সাধারণত আমাদের হয় আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিতে অভিযুক্ত রাজি হলে। এ যাত্রায়ও প্রাথমিকভাবে তেমনটাই ভেবেছিল পুলিশ। সত্যিটা অন্তত এবার জানা যাবে।
ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় নথিবদ্ধ হওয়া স্বীকারোক্তির (Judicial Confession) কপি যখন হাতে এল, মাথায় হাত গোয়েন্দাদের। স্বস্তি তো দূরের কথা, বরং আরও অস্বস্তির গ্রাসে। এটা কীরকম হল?
FIR–এ যা তালাত বলেছিলেন, তার সঙ্গে বিন্দুমাত্র মিল নেই। এবং এই অমিলের থেকেও বড় কথা, আদালতে দেওয়া বয়ানেও অজস্র অসংগতি। রাত এগারোটায় কেন দরজা খুলে রাখলেন? ব্যাখ্যা নেই। এতদিন পরে রবি হঠাৎ কেন ‘কাকু’–র শরীরের খোঁজ নিতে প্রায় মাঝরাতে এমএলএ হস্টেলে চলে এল? মতিনের উল্লেখ কোথায় নয়া স্বীকারোক্তিতে? নেই। তালাত বলছেন, পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। ঘটনার পরদিন প্রাথমিক চিকিৎসার সময় শরীরের কোথাও দৃশ্যমান আঘাত ছিল না, মাথাতেও নয়। একমত হলেন গোয়েন্দারা, ইনি কঠিন মহিলা। হয় মিথ্যে, নয় অর্ধসত্য বলছেন।
সিদ্ধান্ত হল, রবিকে তো আগে ধরা হোক। জেরা করলেই ‘দুধ কা দুধ, পানি কা পানি’ হয়ে যাবে। রবি শিকদার, বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ। ধরা হল নদিয়ার বাড়ি থেকে, নিয়ে আসা হল কলকাতায়।
এরপর যা ঘটল, তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না পোড়খাওয়া গোয়েন্দারাও। জানা গেল, রবি কিছুদিন গাড়ি চালিয়েছিলেন রমজানের। কাজ করেছিলেন ব্যক্তিগত সহায়ক হিসেবেও। বেশ কয়েক মাস আগে অন্য চালক নিয়োগ করেন রমজান। সেই থেকে নদিয়ার বাড়িতেই থাকেন, জমিজমা দেখাশোনা করেন। চাকরি যাওয়ার পর তালাতের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই, দেখাও হয়নি কখনও। রবি স্পষ্ট বললেন, তালাতকে ‘দিদি’ বলে ডাকতেন, প্রশ্ন নেই দূরতম কোনও অবৈধ সম্পর্কের। আরও জানালেন জোর গলায়, কলকাতায় শেষ এসেছেন মাসছয়েক আগে। ঘটনার দিন তিনি নদিয়াতেই ছিলেন।
রবিকে নিয়ে পুলিশের বিশেষ টিম রওনা হয়ে গেল নদিয়ায়। খোঁজখবর-জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ নিশ্চিত হল, রবি সত্যি বলছেন। ঘটনার দিন নিজের গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন। অসংখ্য সাক্ষী রয়েছে। আদালতে রবির জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করল না পুলিশ। রেহাই পেলেন নির্দোষ যুবক।
এদিকে কাগজে ফলাও করে প্রচার হয়েছে রবি ধরা পড়ার পর থেকে, চর্চা হয়েছে তালাতের স্বীকারোক্তি নিয়ে। ‘স্ত্রীর প্রাক্তন প্রেমিকের রোষেই খুন রমজান’ শীর্ষক খবর বেরিয়েছে সর্বত্র। রবির জামিনের পর আর-এক প্রস্থ নিন্দেমন্দ সহ্য করতে হল আমাদের।
অতঃকিম? লালবাজার ঠিক করল, শূন্য থেকে শুরু করা ছাড়া উপায় নেই। মূলত তিনটে সিদ্ধান্ত হল।
এক, আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সেই রাতে হস্টেলে থাকা সমস্ত আবাসিক-কর্মীদের, ঘটনাস্থলের এক কিলোমিটারের মধ্যে সমস্ত দোকানপাটের কর্মচারীদেরও। কেউ কিছু যদি মনে করতে পারেন, যা খেয়াল করেননি প্রথম বারের জেরায়।
দুই, এলাকার দু’-তিন কিলোমিটারের মধ্যে সমস্ত পিসিও বুথ চষে ফেলতে হবে। ঘটনার অন্তত কুড়ি দিন আগে থেকে খুনের দিন পর্যন্ত ফোনের রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এমএলএ হস্টেলে বাইরে থেকে কী কী ফোন এসেছিল কখন, রুম নম্বর ৩/১০-এ তো বটেই, অন্য সব রুমেও, জানতে হবে।
