তন্নতন্ন করে খুঁজেও মিলল না ‘ডেভেলপ’ করার যোগ্য হাত বা পায়ের ছাপ। বেশ কিছু টুকিটাকি জিনিস বাজেয়াপ্ত করা হল বটে, কিন্তু সেসব নিয়মরক্ষার। ঘেঁটেঘুঁটেও নির্ণায়ক কিছু পাওয়া গেল না। তালাত বলেছিলেন, খুনিদের দেখে চিনতে পারবেন। ছবি আঁকানো হল বর্ণনা অনুযায়ী। ছড়িয়ে দেওয়া হল সোর্সদের মধ্যে, বিভিন্ন থানায়। লাভ হল না।
সূত্র, সে যতই তুচ্ছ হোক, পেলে তবেই না পরের ধাপ! হস্টেলের কর্মী-আবাসিক বা সেদিনের ‘ভিজিটর’-দের বিস্তারিত জেরা করেও অধরাই থাকল তদন্তের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ।
জটিল কেসে আমাদের প্ৰচলিত পদ্ধতি, তদন্তের অগ্রগতির কাটাছেঁড়া হয় নিয়মিত। গুরুত্বের বিচারে কখনও দু’-তিন দিন অন্তর, কখনও সকাল-বিকেল-সন্ধে। এ মামলা ছিল দ্বিতীয় গোত্রের, আক্ষরিক অর্থেই ঘুম ছুটে গিয়েছিল পুলিশের।
এমনই এক রিভিউ-বৈঠকের আগে তদন্তকারী অফিসারের সঙ্গে তাঁর সহযোগীর কথোপকথন। ঘটনার দিনতিনেক পরের কথা লিখছি।
—স্যার, তালাত সুলতানার বয়ান নিয়ে খটকা লাগছে।
—সে তো আমারও লাগছে, প্রথম দিন থেকেই।
—রাইট স্যার। রমজান দরজা খুলে রাখতে বলবেন কেন? মতিন আসেনি, জানার পরও?
তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, মতিন তো বলছে সে ফোন পেয়েছে রাত একটার পর…
—আর খুনটা হয়েছে, তালাতের বয়ান অনুযায়ী রাত সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে। পোস্টমর্টেমও তা-ই বলছে |
—কারেক্ট! এতক্ষণ কী করছিলেন উনি?
—বলছেন তো, অনেক চেষ্টা করে হাতের বাঁধন খুলেছিলেন বলে দেরি হয়েছিল। তারপর ফোন করেছেন।
—হুঁ… ক্রিমিনাল গ্যাং হলে ফোনের লাইন কেটে দিয়ে যেত।
—হয়তো মিস করে গেছে তাড়াহুড়োয়।
—তুমিও আসল ব্যাপারটা মিস করে যাচ্ছ। বাইরে পুলিশ। নিতান্ত পরিচিতের সঙ্গে কেউ ঢুকলে তবেই রেজিস্টারে লেখা হয় না। চার জন অপরিচিত ঢুকে পড়বে এমএলএ হস্টেলে, কেউ খেয়াল করবে না? আর যদি এক এক করে ঢুকেও পড়ে কোনওভাবে, পুলিশ, রিসেপশন, সবার চোখ এড়িয়ে গেল?
—হয়তো সেন্ট্রি কনস্টেবলের ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। শীতের রাত, সেই সুযোগে টুক করে…
—তালাত বলেছেন, সাড়ে এগারোটায় দরজায় টোকা। অন্তত তার পৌনে এক ঘণ্টা আগে সেন্ট্রি চেঞ্জ হয়। ডিউটি ধরেই কেউ ঝিমোবে না। রাত দুটো-আড়াইটা হলে তবু মানা যায়…
—মহিলা বলছেন, লোকগুলোকে দেখলে চিনতে পারবেন। স্পেশিফিক ডিটেলস দিচ্ছেন চেহারার। অথচ লাইট অফ ছিল। কী করে দেখলেন এত?
—হুঁ… ওটা তো সবচেয়ে বড় কন্ট্রাডিকশন…
—তালাতকে অ্যারেস্ট করলে হয় না? শিয়োর কিছু লুকোচ্ছেন। আর রেণুলীনাও কিছু দেখলেন না, এটাও কেমন যেন…
—গ্রেফতার করা যায়… কিন্তু রিস্ক আছে। প্রমাণ ছাড়া কমপ্লেনান্টকে ওভাবে.. অবশ্য আর একবার ইন্টারোগেট করাই যায়। ডিসি-কে বলব ভাবছি আজ।
—বলুন স্যার, এই প্রেশার আর নেওয়া যাচ্ছে না। পলিটিক্যাল মার্ডার বলে বাজার গরম করছে কাগজগুলো। আর তালাত তো ফিরে গেছেন কিষাণগঞ্জে গতকাল।
—এভাবে পলিটিক্যাল মার্ডার হয়? কত জায়গা আছে মার্ডার করার। এমএলএ ছিলেন উনি। জনসংযোগ করতে হত, মিটিং-মিছিল করতে হত। রাজনৈতিক খুন করতে এমএলএ হস্টেলের মতো সিকিয়োর জায়গায় চারজন দল বেঁধে আসবে মার্ডার করতে? হয় কখনও?
—ওই জন্যই তো আরও সন্দেহ। ডেলিবারেটলি মিসলিড করছেন তালাত। আর ভেবে লাভ নেই স্যার, ডিসি-কে বলুন।
বলা হল, আলোচনা হল বিস্তর। প্রমাণ ছাড়া আটক করাতেও সমালোচনার ঝুঁকি প্রচুর। কিন্তু তালাতের বয়ানে অসংগতির আধিক্য এতটাই, হিসেবে গরমিল এতটাই, ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া উপায়ও ছিল না। আদালত থেকে ওয়ারেন্ট বের করা হল তালাতের নামে। ডিসি ডিডি-র নেতৃত্বে ২৪ ডিসেম্বর বিহার রওনা দিল দল। কিষাণগঞ্জের বাহাদুরপুরের বাড়ি থেকে তালাতকে গ্রেফতার করে কলকাতায় আনা হল ২৬ ডিসেম্বর।
প্রশ্নমালা তৈরিই ছিল। অথচ কাজেই লাগল না তেমন। মিনিট দশেক জেরার পর তালাত নিজেই বললেন, ‘মিথ্যে বলেছিলাম। খুনটা রবি করেছিল। রমজান সাহেবের কনফিডেন্সিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট।’
—করল কেন?
—সেটা আদালতে বলব। আপনাদের নয়।
—আদালতে স্বীকারোক্তি দেবেন?
—অবশ্যই, ওখানেই দেব। আপনারা ব্যবস্থা করুন।
—সে না হয় করব। কিন্তু শুরুতে মিথ্যে বলেছিলেন কেন? রবির সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?
—বললাম তো, যা বলার আদালতেই বলব। রবি আমাকে দিদি বলে ডাকত। খুনের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই।
নির্দিষ্ট দিনে তালাত আদালতে স্বীকারোক্তি দিলেন। ‘যাহা বলিব সত্যি বলিব, সত্য বই মিথ্যা বলিব না’-র পর কী সেই স্বীকারোক্তি? তুলে দিলাম হুবহু।
“আমার এই খুনের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। আমি সাধারণ গৃহবধূ। দুই মেয়ে, এক ছেলে। গত মে মাসের পনেরো তারিখে পুরসভা নির্বাচন ছিল উত্তর দিনাজপুরে। তার আগের রাতে, ১৪ মে, ইসলামপুরের হোগলবাড়িতে একটা রাজনৈতিক মারামারি হয়। রমজান সাহেব আহত হন। রবি ছিল ওঁর পিএ। সবসময় সঙ্গে সঙ্গে থাকত। রমজান সাহেবকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়, ভরতি করা হয় ক্যালকাটা হসপিটালে। সেখানে এবং তারপর এমএলএ হস্টেলে আমি প্রাণপণ শুশ্রূষা করি স্বামীর। রবিও সাহায্য করেছিল খুব। ওই সময় রবির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়, অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি আমরা। রমজান সাহেব আমার প্রতি উদাসীন ছিলেন, ভাল ব্যবহার করতেন না।
