লাগেজ আমাদের ঘরে রেখে সুব্বাদিদি বেরল। ফিরল ছ’টা নাগাদ। রাত সোয়া ন’টায় আবার বেরল ওষুধ কিনতে। ফেরার পর আমরা তিনজন খাওয়াদাওয়া করলাম। সুব্বাদিদি দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি আর রমজান সাহেব সোয়া দশটা–সাড়ে দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ শুনলাম, রাত সাড়ে এগারোটা হবে তখন। আমার আর রমজান সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। সুব্বাদিদির খুব গাঢ় ঘুম, জাগেনি। রমজান সাহেব বললেন, ‘বোধহয় মতিন, খুলে দাও। কিছু দরকার আছে হয়তো।’
মতিন ফরওয়ার্ড ব্লকের সর্বক্ষণের কর্মী। ও আর আলম রুম নম্বর ১/৮ –এ ছিল। খুলে দিলাম দরজা। বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলাম, কই, কেউ তো নেই করিডরে! তা হলে কি ঘুমের ঘোরে ভুল শুনলাম আমরা? রমজান সাহেব বললেন, ‘দরজাটা খুলেই রাখ। মতিনই হবে। পার্টির কাজ নিয়ে কিছু আলোচনা ছিল। সে জন্যই এসেছিল নিশ্চয়ই। দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় চলে গিয়েছে। ভেবেছে, ঘুমিয়ে পড়েছি।’
দরজা খুলে রেখেই আমি ঘরের লাগোয়া বারান্দায় গেলাম। ভাবলাম, উঠেই যখন পড়েছি, বাসনকোসনগুলো ধুয়ে রাখি। বাসন গুছোচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন মুখ চেপে ধরল। দেখি, দু’জন লোক, হাতে পিস্তল। গলায় ওটা ঠেকিয়ে কম্বল দিয়ে মুখচাপা দিয়ে হাত-পা বাঁধল কাপড় দিয়ে। টানতে টানতে নিয়ে গেল ভিতরে। দেখলাম আরও দু’জন ঢুকে পড়েছে ঘরে। আমি তখন ভয়ে প্রায় আধমরা। সুব্বাদিদি ততক্ষণে জেগে গিয়েছে টানাহ্যাঁচড়ার শব্দে। রমজান সাহেবও। ওরা সুব্বাদিদিরও মুখ-হাত-পা বাঁধল। ভয় দেখাল, শব্দ করলে জানে মেরে দেবে।
আলনায় থাকা আমার হলুদ শাড়ি দিয়ে রমজান সাহেবের গলায় পেঁচিয়ে ধরল একজন। আমি বাধা দিতে গেলে একজন সজোরে লাথি মারল পেটে, গালি দিল অকথ্য ভাষায়, ‘শালি হারামজাদি।’ রমজান সাহেব যখন ছটফট করছিলেন, ওরা বলছিল, ‘১০ তারিখে মিটিং, না? মজা দেখাব।’
আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করল, ‘টাকা কই?’ তারপর সুটকেসের উপর রাখা মানিব্যাগ থেকে যা টাকাপয়সা ছিল, নিয়ে নিল। ওরা আধঘণ্টা মতো ছিল। বারবার ভয় দেখাচ্ছিল, গুলি করে মেরে দেওয়ার।
ওরা চলে যাওয়ার পর ঘষটে ঘষটে আমি আর সুব্বাদিদি ইন্টারকমের কাছে গেলাম। রমজান সাহেবের কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছিলাম না। নিথর হয়ে পড়ে ছিলেন। খুব ভয় করছিল আমার।
কোনওভাবে আমি আর সুব্বাদিদি অনেক চেষ্টা করে আমার হাতের বাঁধনটা খুলতে পারলাম। ফোন করলাম মতিনের ঘরে। মতিন আর আলম দৌড়ে এল। আমাদের বাঁধন খুলে দিল। রমজান সাহেবের তখনও কোনও সাড়াশব্দ নেই। মতিন ওঁর গলার ফাঁস খুলে দিল। নাড়ি টিপে দেখল কিছুক্ষণ, নাকের কাছে হাত রাখল। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছিল তখন। মতিন ছলছল চোখে বলল, ‘রমজান ভাই আর নেই!’
পুরো ব্যাপারটা আমার চোখের সামনে ঘটল স্যার… ওদের দেখলে চিনতে পারব, খুঁজে বের করে শাস্তি দিন…..।”
ফের কেঁদে ফেললেন তালাত।
একটানা এতক্ষণ কথা বলে হাঁপাচ্ছেন তখন। তালাতকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিলেন ডিসি ডিডি, ‘নিন ম্যাডাম, আপনার একটু বিশ্রাম দরকার। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করব খুনিদের ধরতে, কথা দিচ্ছি।’
এ মামলার কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা। জওহরলাল নেহরু রোড ধরে দক্ষিণ দিকে এগোলে পার্ক স্ট্রিটের একটু আগেই বাঁ হাতে কিড স্ট্রিট। রাস্তা ধরে সামান্য হাঁটলেই ডান দিকে এমএলএ হস্টেল। গ্রিলের উঁচু গেট, সামনে সর্বক্ষণের পুলিশি প্রহরা। ‘বিধানসভা সদস্য আবাস বিভাগ’-এর গ্লো সাইনবোর্ড চোখ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
নিরাপত্তা যেখানে নিশ্ছিদ্র থাকার কথা, সেখানেই মাঝরাতে খুন হয়ে গেলেন এক বিধায়ক। তুমুল হইচই হওয়ার কথা। হলও। পুলিশের বাপবাপান্ত করার এমন পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা মিডিয়া হাতছাড়া করে না সাধারণত। বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো-র কটাক্ষ নানা রকমফেরে আক্রান্ত করল আমাদের। উত্তাপ যথানিয়মে বাড়ল রাজ্য-রাজনীতিরও।
খুনিদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার না হলে বাংলা বন্ধের হুমকি দিল ফরওয়ার্ড ব্লক। লালবাজারে গঠিত হল দুটি বিশেষ দল। সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকলেন উচ্চপদস্থ কর্তারা। ঘটনার দু’দিনের মধ্যেই মামলার তদন্তভার প্রত্যাশিতভাবেই বর্তাল গোয়েন্দা বিভাগের উপর। তদন্তকারী অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হলেন হোমিসাইড শাখার তৎকালীন ইনস্পেকটর মহম্মদ আক্রম, যিনি চাকরিজীবনের শেষে অবসর নিয়েছিলেন কলকাতা সশস্ত্র পুলিশের অষ্টম ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমিশনার হিসেবে।
বিধানসভা সদস্য আবাস
মহম্মদ রমজান আলি হত্যা মামলা। পার্ক স্ট্রিট থানা, কেস নম্বর ৮২৫, তারিখ ২০/১২/৯৪। ধারা ৩০২/৩৪/৩৯৪/৩৯৭ আইপিসি। খুন, একই উদ্দেশ্যে একাধিকের সম্মিলিত পরিকল্পনা, লুঠের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে খুন বা গুরুতর আঘাতের চেষ্টা।
তদন্ত শুরু হল প্রথাগত বিধিনিয়মে। ময়নাতদন্তে কী পাওয়া যাবে, জানাই ছিল। শ্বাসরোধ করে খুন, ‘manual strangulation’।
রুম নম্বর ৩/১০-এ ঢুকেই একটা দশ ফুট বাই আট ফুট মতো জায়গা। মোটা পরদা টাঙানো রয়েছে সামনে। যা পেরলে মূল ঘর। পরদার ভিতর থেকে বাইরেটা দেখা যায় না, বাইরে থেকে ভিতরটাও।
যে ঘরে রমজান আলিকে হত্যা করা হয়েছিল
