আগা মেহেন্দি লেনের যে প্রতিবেশী হারুনকে দেখেছিলেন কুদ্দুস-একলাখের সঙ্গে, দেদার বক্স লেনের যে সবজিবিক্রেতা হারুনকে টফি খাওয়াতে চেয়েছিলেন, তাঁদের বয়ানও গুরুত্বপূর্ণ পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হিসেবে জায়গা পেল চার্জশিটে।
কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার কাজটা বাকি ছিল। সম্পূর্ণ হল হারুনের প্রাণের বন্ধু ছোট্ট সাব্বির রহমানের বয়ানে। একসঙ্গে স্কুল ছুটির পর বেরনো, কুদ্দুসের ডেকে নেওয়া হারুনকে আর হারুনের খুশি মনে চলে যাওয়া। শনাক্তকরণে মুহূর্তের জন্যও দ্বিধাগ্রস্ত দেখায়নি সাব্বিরকে। সোজা আঙুল দেখিয়েছিল কুদ্দুসের দিকে, এই আঙ্কলটাই!
দীর্ঘ বিচারপর্বের পর ২০০৩ সালে দোষী সাব্যস্ত হয় কুদ্দুস-একলাখ, দণ্ডিত হয় যাবজ্জীবন কারাবাসে। উচ্চ আদালতে মুক্তির আবেদন অগ্রাহ্য হয়।
‘The Murder Room’, অন্যতম সেরা উপন্যাস ফিলিস ডরোথি জেমসের। যে প্রখ্যাত ব্রিটিশ গোয়েন্দাকাহিনি লেখিকা পিডি জেমস নামেই পরিচিত পাঠকদের কাছে। উপন্যাসটিতে লিখেছিলেন, “All the motives for murder are covered by four Ls: Love, Lust, Lucre and Loathing.”
ঠিকই। খুনের নেপথ্যে ওই চারটে কারণই থাকে শেষ বিচারে। এক, প্রেম। দুই, কামনা বা যৌন-ঈর্ষা। তিন, অর্থলোভ। চার, তীব্র রাগ-ঘৃণা-বিদ্বেষ। হারুন শিকার হয়েছিল তালিকায় চার নম্বর অনুভূতির।
কী বিচিত্র এই দ্বেষ!
১.০৯ মধ্যরাতের কিড স্ট্রিটে
[রমজান আলি হত্যামামলা
তদন্তকারী অফিসার মহম্মদ আক্রম]
কোথায় : লালবাজার কন্ট্রোল রুম।
কবে : ২০ ডিসেম্বর, ১৯৯৪।
কখন : রাত পৌনে দুটো।
ফোন বাজল ঝনঝন। রাতের শিফটের অফিসার তুললেন।
—দেরি হচ্ছে কেন? ওসি পার্ক স্ট্রিট বলছি। ফোর্স পাঠান।
—বেরিয়ে গেছে একটু আগে। পৌঁছে যাবে।
—লোকেশন নিন। ফোর্স দরকার। অ্যাজ় আর্লি অ্যাজ় পসিবল। না হলে সামলানো যাচ্ছে না।
—রজার।
নড়েচড়ে বসে কন্ট্রোল রুম। শিফট ইনচার্জ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আন্দাজ করেন, আজ রাতটা ঝামেলার হতে যাচ্ছে। ওয়াকিটকি হাতে নিতে যেটুকু সময়। ধাতব শব্দ ছিটকে আসে পরমুহূর্তে, ‘কন্ট্রোল রুম কলিং। হেভি রেডিয়ো ফ্লাইং স্কোয়াড টেন, লোকেশন প্লিজ়?’
—রিপ্লায়িং, অ্যাপ্রোচিং ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম।
—পৌঁছে ওসি-র কাছে রিপোর্ট করুন। ডিসি সাউথ অন ওয়ে।
সে-রাতে জমাট ঠান্ডা শহরে। এখনকার মতো চটজলদি কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে বিশ্বাসী ছিল না তখনকার পৌষ-মাঘ। ঠান্ডা শীতের রাতে লেপের আদরের ওম সহজে ক্রিজ় ছাড়ত না সে-সময়। রাস্তায় বেরলে ফুল সোয়েটার বা শাল না হলেই নয়।
বাড়তি ফোর্স যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছল, গলদঘর্ম স্থানীয় পুলিশ। শ’তিনেক লোকের কৌতূহলী দঙ্গল গেটের বাইরে। ঢুকতে চায় ভিতরে। আটকাচ্ছে পুলিশ, কী করে ওভাবে আমজনতাকে ঢুকতে দেওয়া যায় ভিআইপি এলাকায়? খুনের ব্যাপারটা জানাজানি হয়েছে কিছুক্ষণ হল, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা আসছেন, কলকাতা পুলিশের একাধিক আইপিএস অফিসার পৌঁছে গিয়েছেন। তাবড় তাবড় রাজনৈতিক নেতাদেরও গাড়ি ঢুকছে একের পর এক। লাল বাতির ছড়াছড়ি।
ভাগ্যিস গুচ্ছের টিভি চ্যানেল ছিল না তখন। থাকলে অবস্থা আরও সঙ্গিন হত। ক্যামেরা আর বুমের দাপটে নতুন সমস্যা তৈরি হত, স্পট থেকে মিনিটে-সেকেন্ডে-মাইক্রোসেকেন্ডে ‘ব্রেকিং নিউজ়’ আর এক্সক্লুসিভের ইঁদুরদৌড় সামলাতে ঘাম ছুটে যেত পুলিশের। তবু, সেই মূলত দূরদর্শন-শাসিত সময়েও সাংবাদিকদের জটলা নেহাত কম নয় রাতবিরেতে।
কোনওভাবে ভিড়ভাট্টা সামলে বছর পঁয়ত্রিশের শোকস্তব্ধ সদ্য-স্বামীহারাকে যখন ধরে ধরে গেটের দিকে আনছেন পরিচিত-পরিজনেরা, ঘড়ির কাঁটা তিনটের চৌকাঠ পেরিয়ে গিয়েছে। ঘটনার আকস্মিকতায় নির্বাক মহিলা তখন প্রায় চলচ্ছক্তিহীন।
পুলিশের তখন অনেক কাজ বাকি। ঘটনাস্থলের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্কেচ ম্যাপ বানানো, কাদের রাতেই জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন তার তালিকা তৈরি করা, ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যত দ্রুত সম্ভব, সিজ়ার লিস্টের লেখালেখি, মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো সকাল হলেই, যাতে পরীক্ষার পর সম্ভাব্য রিপোর্টের প্রাথমিক আন্দাজ পাওয়া যায় সন্ধের আগেই। এবং, স্বামীহত্যার সাক্ষী থাকা স্ত্রীর বয়ান নিয়ে FIR নথিভুক্ত করা।
সাংবাদিকদের ব্যস্ততাও কম নয় তখন। লেট সিটির এডিশনে খবরটা ধরাতেই হবে, যে করে হোক। ফ্রন্ট পেজ় নিউজ়, নিশ্চিত।
পার্ক স্ট্রিট থানার ওসি-র চেম্বারে বসানো হয়েছে মহিলাকে। পৌনে চারটে বাজে প্রায়, একটু পরেই রাত হাঁটা দেবে ভোরের দিকে। যথাসাধ্য সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন মহিলা পুলিশকর্মীরা। ডিসি ডিডি স্বয়ং থানায় উপস্থিত। অনেক সাধ্যসাধনার পর দুটি বাক্য বেরল দৃশ্যতই বিধ্বস্ত মহিলার মুখ থেকে, ‘ম্যায় তো বিলকুল আকেলি হো গয়ি… লাইফ বরবাদ হো গয়া…’ কেঁদে ফেললেন বলতে বলতেই।
—শান্ত হন ম্যাডাম, বলুন প্লিজ়, ঠিক কী হয়েছিল।
একটু ধাতস্থ হয়ে বলতে শুরু করেন তালাত সুলতানা। উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখর থেকে নির্বাচিত ফরওয়ার্ড ব্লক বিধায়ক রমজান আলির স্ত্রী।
“কলকাতায় এলে কিড স্ট্রিটের এমএলএ হস্টেলেই উঠি আমরা। ১৩ ডিসেম্বর রমজান সাহেবের সঙ্গেই এসেছিলাম। ওঁর চিকিৎসার প্রয়োজনে। উঠেছিলাম চারতলার রুম নম্বর ৩/১০-এ। গতকাল দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ সুব্বাদিদি (রেণুলীনা সুব্বা, অল ইন্ডিয়া গোরখা লিগের প্রাক্তন বিধায়ক) এল। বলল, ‘কোনও রুম খালি নেই, তোদের ঘরে রাতটা থাকতে দিবি?’ আমি সুব্বাদিদিকে চিনতাম। আর রমজান সাহেবের সঙ্গে তো দীর্ঘদিনের পরিচয়। বললেন, ‘নিশ্চয়ই। আমাদের সঙ্গেই থেকে যান।’
