তখন আমার বা একলাখের ব্রাইট স্ট্রিট থেকে বেরনোর উপায়ই ছিল না। ঘরভরতি লোক, কান্নাকাটি চলছে। প্ল্যান ভেস্তে গেল আমাদের।
—হারুনকে মারলি কখন?
কীভাবে খুন হয়েছিল হারুন, ফিরে দেখা ফ্ল্যাশব্যাকে।
১৩ আগস্ট, ১৯৯৪। স্কুল ছুটি হল, সাব্বিরের সঙ্গে বেরল হারুন, হেঁটে বাড়ি ফিরবে রোজকার মতো। আবদুল লতিফ স্ট্রিটে সাব্বিরের বাড়ির কাছে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কুদ্দুস। আর একটু দূরে একলাখ। কুদ্দুস হাত নেড়ে ডাকল হারুনকে। কুদ্দুসচাচাকে হঠাৎ ওখানে দেখে খুব খুশি হারুন, বায়না ধরল আইসক্রিমের। কুদ্দুস বলল, বেশ আমার বাড়িতে চলো। ওখানে আইসক্রিম আনব, খাওয়ার পর ব্রাইট স্ট্রিটে পৌঁছে দেব। একলাখও যোগ দিল কুদ্দুস-হারুনের সঙ্গে। একলাখের সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠ ছিল না হারুন। তবে চিনত বাবা আর কুদ্দুসচাচার বন্ধু হিসেবে।
হারুনকে নিয়ে কুদ্দুস-একলাখ গেল ৩৬ আগা মেহেন্দি লেনের ভাড়াবাড়িতে। পরিকল্পনা ছিল ওখানেই খুনটা করার। ঢোকার মুখে দেখা হয়ে গেল এক প্রতিবেশীর সঙ্গে, যিনি হারুনের গাল টিপে আদর করে দিলেন। হারুনকে নিয়ে বাড়িতে ঢোকার সাক্ষী রাখা ঠিক হবে না, এই ভেবে হারুনকে নিয়ে যাওয়া হল একলাখের দেদার বক্স লেনের আস্তানায়। এই বলে, আইসক্রিম একলাখ চাচার বাড়িতে আছে।
যাওয়ার পথে দেখা হল শেখ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে। দেদার বক্স লেনেই যাঁর সবজির দোকান। হারুনের বাবাকে চেনেন, সেই সূত্রে হারুনকেও। আদর করে বললেন, টফি খাবে? হারুন বলল, না না, আইসক্রিম খেয়ে বাড়ি ফিরব।
কোথায় আইসক্রিম? দেদার বক্স লেনের ফ্ল্যাটে ঢোকার পরই হারুন শুনল, কুদ্দুসচাচা বলছে একলাখচাচাকে, আর দেরি করে লাভ নেই, শেষ করে দিই!
কুদ্দুস-একলাখ গলা টিপে ধরলেন হারুনের। দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু আসতে আর কতক্ষণ? কী-ই বা প্রতিরোধ সম্ভব ওইটুকু বাচ্চার পক্ষে?
বড় স্টিলের ট্রাঙ্ক কিনে কুদ্দুস দিনকয়েক আগে রেখে দিয়েছিল আগা মেহেন্দি লেনের বাড়িতে। রিকশা নিয়ে কুদ্দুস ফের গেল আগা মেহেন্দি লেনের ফ্ল্যাটে। ট্রাঙ্ক নিয়ে ফিরল দেদার বক্স লেনে। হারুনের দেহ ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে তালাবন্ধ করে দেওয়া হল।
যেমন আগে থেকেই ভাবা ছিল, ট্রাঙ্কবন্দি দেহ নিয়ে বেরল দু’জনে। এবং বেরিয়ে কাছেই
পেমেন্টাল গার্ডেন লেনের একটা পিসিও বুথ থেকে মুক্তিপণ চেয়ে একলাখ ফোন করল হাদিসকে। এরপর ট্যাক্সি নিয়ে সোজা হাওড়া স্টেশন।
বিকেল ৪-১৭ মিনিটের হাওড়া-কাঠগোদাম এক্সপ্রেসের লেডিজ় কম্পার্টমেন্টে কুদ্দুস-একলাখ তুলে দিল ট্রাঙ্ক। যা প্রায় আটচল্লিশ ঘণ্টা পরে পৌঁছল বেরিলিতে। ট্রেন জংশনে থামার পর যাত্রীরা নেমে গেলে সাফাইকর্মীদের চোখে পড়েছিল। কেউ হয়তো ফেলে গেছেন, এই ভেবে প্ল্যাটফর্মে ট্রাঙ্ক নামিয়ে রেখেছিলেন। সান্ধ্য টহলদারিতে চোখে পড়েছিল বেরিলির জিআরপি-র কর্মীদের।
রহস্য উন্মোচনের পর বাকি তদন্তভার পড়েছিল ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের হোমিসাইড শাখার তৎকালীন সাব-ইনস্পেকটর বিকাশ চট্টোপাধ্যায়ের উপর। যিনি সফল কর্মজীবন শেষে অবসর নিয়েছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার হিসেবে।
কুদ্দুসকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, খবর পেয়ে গিয়েছিল একলাখ। পালিয়েছিল রাজ্য ছেড়ে। সহজে পাকড়াও করা যায়নি, বিহারে গোয়েন্দারা দিনের পর দিন ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা সত্ত্বেও। অক্টোবরের শেষে দিনদুয়েকের জন্য এসেছিল কলকাতায়, সোর্স মারফত খবর পেয়েছিলেন বিকাশ। বিহারে আর ফেরা হয়নি একলাখের, ঠাঁই হয়েছিল শ্রীঘরে।
বিকাশ ছিলেন সেই গোত্রের অফিসার, যাঁরা কোনও ফাঁকফোকর রাখতেন না তদন্তে, ছেঁটে ফেলতেন ন্যূনতম ‘চান্স ফ্যাক্টর’ও। সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রস্তুত করেছিলেন পেশাদারি পারদর্শিতায়। জাল বুনেছিলেন নিপুণ, যাতে হীনতম অপরাধের শাস্তি পায় অভিযুক্তরা।
ট্রাঙ্কটা কিনেছিলেন কুদ্দুস মল্লিকবাজারের একটা দোকান থেকে, ২২০ টাকা দিয়ে। দোকান চিহ্নিত হল কুদ্দুসের বয়ান অনুযায়ী, বাজেয়াপ্ত করা হল সংশ্লিষ্ট ক্যাশমেমোর কপি। দোকানদার কুদ্দুসকে চিনিয়ে দিলেন আদালতে। হ্যাঁ, এই লোকটাই কিনেছিল।
মুক্তিপণের ফোনটা পেমেন্টাল গার্ডেন লেনের যে STD বুথ থেকে করা হয়েছিল, তার হদিশ মিলল কুদ্দুসকে জেরা করে। বুথের মালিক ওয়াসিম মুবারকি জানালেন, কে ফোনটা করেছিল, চিনতে পারবেন মুখ দেখলে। আদালতে চিনিয়ে দিলেন কুদ্দুসকে, ফোন করার সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একলাখকেও। বুথের ‘কল রোল’ বাজেয়াপ্ত করা হল, যা নিশ্চিত প্রমাণ করল হাদিসের ফ্যাক্টরিতে ১৩ অগস্ট সোয়া তিনটের ফোন কল।
রিপন স্ট্রিট এলাকায় বা আশেপাশের ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে খোঁজখবর করে সন্ধান পাওয়া গেল সেই ট্যাক্সিরও, যাতে চড়ে ট্রাঙ্কবন্দি মৃত হারুনকে নিয়ে কুদ্দুস-একলাখ রওনা দিয়েছিল হাওড়া স্টেশনে। WB-04/2052-র ড্রাইভার মহম্মদ আকবর সাক্ষ্য দিলেন আদালতে। সেই বিকেলের দুই আরোহীকে চিনিয়ে দিলেন, যারা একটা বড় ট্রাঙ্ক নিয়ে উঠেছিল গাড়িতে।
যে রিকশা করে ট্রাঙ্ক নিয়ে আগা মেহেন্দি লেন থেকে একলাখের দেদার বক্স লেনের বাড়িতে এসেছিলেন কুদ্দুস, খোঁজ মিলল তার চালকেরও। মহম্মদ সামসাদ, যার বয়ান পেশ হল আদালতে এবং যিনি দেখেই চিহ্নিত করলেন কুদ্দুসকে।
