—কী হল?
—মিস, ওই আঙ্কলটা! ওর সঙ্গেই হারুন খুশি মনে চলে গেছিল ফ্রাইডে।
আশিক মুহূর্তে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। কুদ্দুসও। দু’জনে চোখাচোখি হয়। কয়েক সেকেন্ড মাত্র, কুদ্দুস রাস্তার দিকে দৌড় শুরু করার উপক্রম করতেই চিৎকার শুনতে পান গাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সহকর্মী অফিসার।
—ধরো ওকে!
থানার গাড়ির ড্রাইভারও ব্যাপার বুঝে লাফিয়ে নামেন। পালাবার পথ ছিল না কুদ্দুসের। কত দৌড়বে? উসেইন বোল্ট তো নন।
শেষমেশ কুদ্দুস? হারুনের কুদ্দুসচাচা? কিন্তু কেন?
—একা করিনি স্যার! একলাখও ছিল।
পার্ক স্ট্রিট থানার ওসি-র চেম্বারে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকা কুদ্দুসের মুখ থেকে অস্ফুটে বেরোয় কথাগুলো। সঙ্গে সঙ্গে থানার গাড়ি স্টার্ট দেয় দেদার বক্স লেনে, একলাখের ঠিকানায়।
—কেন করলি ওইটুকু বাচ্চাকে খুন?
কুদ্দুসের জবানবন্দিতে খুলতে থাকে রহস্যের জট। এবং মোটিভের বৃত্তান্ত শুনে তাজ্জব হয়ে যান অফিসাররা। এত তুচ্ছ কারণে ন’বছরের একটা ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলা যায়?
—হাদিসভাইয়ের জন্যই একলাখ আর আমি চাকরিটা পেয়েছিলাম। সামসুদ্দিনভাই, আমার আর একলাখ, দু’জনেরই দূরসম্পর্কের আত্মীয় হন। হাদিস খুব মানত সামসুদ্দিনভাইয়ের কথা। উনি অনুরোধ করায় ফেলতে পারেননি। মালিককে অনেক বলেকয়ে আমাদের চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছিল হাদিসভাই।
—বেশ, তা সেই হাদিসের ছেলেকেই খুন করে কি ঋণশোধ করলি?
ফের দু’হাতে মুখ ঢাকে কুদ্দুস।
—মাথায় শয়তান ভর করেছিল স্যার। আমি চাইনি এর মধ্যে জড়াতে, একলাখের কথাতে করে ফেলেছি…
—ওটা তুই আগে ধরা পড়েছিস বলে বলছিস। একলাখ আগে ধরা পড়লে বলত, তোর কথাতে করেছে। দেখা আছে ওসব। মারলি কেন বাচ্চাটাকে?
—চাকরি পাওয়ার পর হাতে কিছু পয়সা আসত স্যার মাস গেলে। আগে তো এর থেকে ওর থেকে চেয়েচিন্তে চালাতে হত। আমি আর একলাখ প্রায় রোজই মদ খেতাম চাকরি জোটার পর। কাজে যেতে দেরি হয়ে যেত প্রায়ই। একদিন সুপারভাইজার খুব বকাবকি করল, কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য নোটিস ধরাল। আমরা দু’জন সামসুদ্দিনভাইকে বললাম হাদিসভাইকে বলতে। হাদিসভাই মালিককে বোঝাল, আর একবার শেষ সুযোগ দিতে। মালিক অন্ধের মতো ভালবাসতেন হাদিসভাইকে। সুযোগ দিলেন, চাকরিটা বেঁচে গেল।
—তারপর?
—কিছুদিন আমরা মন দিয়ে কাজ করলাম, তারপর আবার যেই কে সেই। একলাখ শরীরের উপর এত অত্যাচার করত যে অসুস্থই হয়ে পড়ল। ফিরে গেল ছাপড়ার বাড়িতে। প্রায় ছ’মাস পরে ফিরল এই মাসখানেক আগে। ফ্যাক্টরিতে গেল, মালিক বলল, আর কাজে নেবে না। একলাখ কাজের মধ্যেই মদ খেত, হাদিসভাই অনেক বারণ করা সত্ত্বেও শুনত না। মালিক কিছুতেই আর কাজে নিল না।
একলাখ আবার ধরল সামসুদ্দিনভাইকে। এবার আর হাদিসভাই রাজি হল না মালিককে অনুরোধ করতে। স্পষ্ট বলে দিল, অনেকবার সাবধান করেছি, শুধরোসনি। আমার কথায় মালিক শেষ সুযোগ দিয়েছিল, সেই কথার দাম দিসনি, আমি এখন কোন মুখে বলব? তুই অন্য চাকরি খুঁজে নে। তর্কাতর্কি হল খুব।
—একলাখের ব্যাপারটা বুঝলাম। কিন্তু তুই তো দিব্যি চাকরি করছিলি…
—কোথায় আর করছিলাম স্যার? চাকরি তো টেম্পোরারি, পার্টটাইম। মালিক কিছুতেই পার্মানেন্ট করছিল না। সুপারভাইজার রিপোর্ট দিয়েছিল, দেরি করে আসি, কাজে ফাঁকি দিই। একলাখকে যখন আর কাজে রাখল না কোম্পানি, আমিও চিন্তায় পড়ে গেলাম। দরবার করলাম হাদিসভাইয়ের কাছে, তুমি একবার বললেই চাকরিটা পাকা হয়ে যায়। মাইনেটা বাড়ে। এত অল্প টাকায় আর চলছে না।
হাদিসভাই মুখের উপর বলে দিল, এখন বছরখানেক মুখ বুজে কাজ কর। দেখলি তো
একলাখের অবস্থা। সবাই জানে তোর আর একলাখের ব্যাপারস্যাপার। এখন কোনও চান্সই নেই পার্মানেন্ট হওয়ার, বেশি হইচই করলে যেটা আছে, সেটাও যাবে।
ভীষণ রাগ হয়ে গেল আমার। সেদিনই চাকরি ছেড়ে দিলাম। হাদিসভাইকে বললাম, তোমার দয়ার চাকরি আমি পায়ের তলায় রাখি। হাদিসভাইও রেগে গেল। বলল, তোদের দু’জনকে চাকরি জোগাড় করে দেওয়াই ভুল হয়েছে আমার।
—হুঁ…
—অমন ঝামেলা তো কতই হয়। আমি অত মনে রাখিনি স্যার। মিটমাট হয়ে গিয়েছিল। হাদিসভাইদের বাড়ি তারপরও যেতাম, হারুনকে ফুটবল খেলতে নিয়ে যেতাম। একলাখ কিন্তু চাকরি যাওয়াটা ভুলতে পারছিল না। একদিন ওর দেদার বক্স লেনের বাড়িতে ডাকল। মদ কিনে এনেছিল, অনেক রাত অবধি খেলাম। একলাখ আমার মনে বিষ ঢোকাল।
—আর তুই সে-বিষ ঢুকতে দিলি?
—মাথার ঠিক ছিল না স্যার। হাতে কাজকম্মো কিছু নেই। একলাখ বোঝাল, আমাদের দু’জনের চাকরি ইচ্ছে করলেই হাদিসভাই বাঁচাতে পারত। কিন্তু করেনি। শোধ নেব ওর জীবনটাও তছনছ করে দিয়ে। আমার যে কী ভূত চেপেছিল মাথায়, রাজি হয়ে গেলাম।
ছক কষলাম দু’জনে মিলে। হারুনকে কিডন্যাপ করব, পঁচিশ হাজার চাইব। টাকা নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে ব্যবসা করব। হারুনকে মেরে ফেলতেই হবে, ছেড়ে দিলে তো বলেই দেবে আমাদের নাম।
—কিন্তু টাকা তো আনতেই গেলি না … কেন?
—কী করে যাব স্যার? যেদিন দুপুরে হারুনকে তুললাম, সেদিন সন্ধে থেকে তো হাদিসভাইয়ের সঙ্গে। এখানে খুঁজছি, ওখানে খুঁজছি হারুনকে, কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে। হাদিসভাই টাকা নিয়ে বেরল সাড়ে ন’টায়, আমাদের বলল, তোরা থাক, ভাবিজানকে সামলা। মেয়েটাকে দ্যাখ।
