আট, ঘুরেফিরে আটকে যাওয়া সেই প্রথম প্রশ্নেই, যে বা যারাই কাজটা করুক, টাকা তো হাতে আসেইনি। তার আগেই মেরে দিল? টাকা হাতে পাওয়ার পর মেরে ফেলার ঘটনা আছে। অপহৃতের পক্ষে যাতে পরে কিডন্যাপারদের চিনিয়ে দেওয়ার সুযোগ না থাকে, অনেক গ্যাং টাকা পাওয়ার পর খুন করে সেই সম্ভাবনাটুকুও নির্মূল করে দেয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তো সেই থিয়োরিও খাটছে না। তা হলে?
নয়, বাবা-মাকে বাদ দিলে হারুনের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল কুদ্দুস। হারুনের সঙ্গে রোজই ফুটবল মাঠে অনেকটা সময় কাটাত কুদ্দুস, গল্পগুজব করত। হারুনের ব্যাপারে কুদ্দুসের সঙ্গে কালই কথা বলা দরকার। কে সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল, কী খেতে ভালবাসত, অন্য পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি, জানা জরুরি।
যেমন দরকার সামসুদ্দিন, আলমগির আর একলাখকেও জিজ্ঞাসাবাদের। ওঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন হাদিসের। পরিবারের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এবং শোক সামলে কিছুটা ধাতস্থ হলে হাদিসের স্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলা দরকার। বাইরে থেকে আর কতটুকুই বা বোঝা যায়, কে বলতে পারে খুনের মোটিভ হয়তো আদৌ মুক্তিপণ নয়, অজানা অভাবিত কিছু?
১৬ অগস্ট, ১৯৯৪, সোমবার সকাল পৌনে আটটা। সপ্তাহের প্রথম কাজের দিনে আড়মোড়া ভাঙছে শহর।
ফার্স্ট পিরিয়ড চলছে Progressive Day School-এ। আশিক পৌঁছলেন জনাদুয়েক অফিসারকে নিয়ে, ডেকে নিয়েছেন কুদ্দুসকেও। প্রিন্সিপালের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা সেরে নিলেন আশিক। ঘটনার কথা এখনও কাগজে বেরোয়নি, তবে আজকের মধ্যে জানাজানি হবেই। কাল ফলাও করে বেরবেই ন’বছরের স্কুলছাত্রের অপহরণ এবং খুনের খবর। তার আগে ছাত্রদের কিছু না জানাতে অনুরোধ করলেন স্কুল কর্তৃপক্ষকে। স্কুলের শিক্ষক-অশিক্ষক সমস্ত কর্মীদের তালিকা প্রয়োজন। আর, ক্লাস ওয়ানের ছাত্রদের সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার, কখন সম্ভব?
—এখনই চলুন, তবে বাচ্চারা যাতে ভয় পেয়ে না যায়, সেটা একটু …
—শিয়োর।
ক্লাসে ঢুকেই আশিক বুঝতে পারেন, বোকার মতো কাজ করে ফেলেছেন। ইউনিফর্ম পরে আসা ঠিক হয়নি, সিভিল ড্রেসে আসা উচিত ছিল। ক্লাস ওয়ান, কতই বা বয়স ওদের? বইখাতা নিয়ে কচিকাঁচার দল, বসে আছে বেঞ্চে। পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে গেছে, চোখেমুখে শঙ্কার জ্যামিতি।
—এই পুলিশ আঙ্কল তোমাদের সঙ্গে কিছু কথা বলবেন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
ক্লাসটিচার শাহনাজের আশ্বাসে যে বিশেষ কাজ হয়নি, বাচ্চাদের দেখেই বোঝেন আশিক। লাভ হবে না জেনেও মুখ খোলেন, এসেই যখন পড়েছেন।
—হারুন, তোমাদের বন্ধু, আজকেও অ্যাবসেন্ট। ও বোধহয় দুষ্টুমি করে বাড়িতে না বলে অন্য কোথাও একটা লুকিয়ে রয়েছে। ওর বাবা-মা খুব চিন্তা করছেন। লাস্ট ফ্রাইডে যখন ছুটি হয়েছিল, তোমরা কি কেউ ওর সঙ্গে বেরিয়েছিলে?
পিনড্রপ সাইলেন্স।
—কেউ বলতে পারবে মনে করে, স্কুল থেকে বেরনোর পর হারুন কোনদিকে গিয়েছিল? তোমরা কেউ ছিলে সঙ্গে?
বাচ্চারা স্পিকটি নট।
আশিক বেরিয়ে আসেন। নাহ, এভাবে হবে না। কাল-পরশু অন্য অফিসারকে সিভিল ড্রেসে পাঠিয়ে টিফিন টাইমে কয়েকজন বাচ্চার সঙ্গে আলাপ জমাতে হবে। ব্রাইট স্ট্রিটের আশেপাশে, মানে হারুনের বাড়ির কাছাকাছি, স্কুলের অন্য কোন কোন ছাত্রের বাড়ি, সেটা বার করতে হবে স্কুলের রেজিস্টার থেকে। ওদের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
প্রিন্সিপালের ঘরে ফিরে আসা হল। রয়েছেন আরও দু’-তিনজন সিনিয়র টিচার। ছাত্রদের
নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করার প্রয়োজন, অভিভাবকদের ছাড়া ছুটির পর বাচ্চাদের বেরতে দেওয়া না-দেওয়া নিয়ে নতুন নিয়ম চালু করার সময় হয়েছে, এইসব আলোচনা চলছে টুকটাক। কথাবার্তায় ছেদ পড়ে শাহনাজের আওয়াজে।
—স্যার, একটা কথা ছিল।
প্রিন্সিপাল তাকান। শাহনাজের পাশেই একটু ভীতসন্ত্রস্ত মুখে দাঁড়িয়ে এক ছাত্রও।
—স্যার, সাব্বির, হারুনের ক্লাসমেট। কিছু বলতে চায় মিস্টার আশিককে। তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিল হঠাৎ পুলিশ দেখে।
আশিক ঝটিতি উঠে দাঁড়ান। বাচ্চাটা কিছু দেখেছিল? কী বলতে চায়? ক্লু বলতে এখনও পর্যন্ত কিছুই হাতে নেই। বাচ্চাটার থেকে মিলতে পারে আদৌ?
—আঙ্কল, ফ্রাইডে ছুটির পর আমি আর হারুন একসঙ্গে বেরিয়েছিলাম। রোজই একসঙ্গে যাই।
—ফ্রাইডেতে কী হল?
—বাড়ির কাছে এসে হারুনকে ‘বাই’ বলার সময় একটা লোক হারুনকে ডাকল।
—তোমার বাড়ি কোথায়?
—কাছেই।
—তারপর?
—তারপর হারুন খুশি মনে লোকটার সঙ্গে চলে গেল।
—খুশি মনে?
—খুশি মনে।
—লোকটাকে দেখলে চিনতে পারবে?
—ইয়েস স্যার।
—স্যার নয়, আঙ্কল।
আশিক গাল টিপে দেন সাব্বিরের। দ্রুত চিন্তা করতে থাকেন। বলছে, দেখলে চিনতে পারবে। মানে চেহারাটা মনে আছে। ছবি আঁকানো দরকার। একটা আলোর রেখা দরকার ছিল, সেটা বাচ্চাটা দিয়েছে। ক্যাডবেরি চকোলেট তো প্রাপ্যই একটা।
বাচ্চাটির হাত ধরে বেরিয়ে আসেন শাহনাজ। পিছুপিছু আশিক, প্রিন্সিপাল এবং অন্যান্য শিক্ষকরা। আশিক হাঁক দেন, কুদ্দুস, একটা ক্যাডবেরি কিনে আনো তো চটপট।
কুদ্দুস দাঁড়িয়ে ছিলেন গেটের কাছে, পুলিশের গাড়ির পাশেই। আশিকের ডাকে পিছন ফেরেন এবং ফুট বিশেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কুদ্দুসকে দেখে শাহনাজের হাত জোরে চেপে ধরে সাব্বির।
