১৫ অগস্টের রাত সাড়ে ন’টা তখন।
রাত পৌনে এগারোটায় যখন বেরিলি থেকে ফোন এল হারুনের স্কুলে, ধরার লোক বলতে শুধু একজন দারোয়ান। যিনি ঘুমচোখে ফোন তুললেন এবং খবর শুনে সঙ্গে সঙ্গে জানালেন প্রিন্সিপালকে। যিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে খবর দিলেন হাদিসকে। বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজন নিয়ে হাদিস ছুটলেন থানায়।
পার্ক স্ট্রিট থানার তৎকালীন ওসি ব্যোমকেশ ব্যানার্জি ট্রাঙ্ককলে কথা বললেন বেরিলি
জিআরপি-র ওসি-র সঙ্গে। সিদ্ধান্ত হল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাদিসকে নিয়ে পার্ক স্ট্রিট থানার একটি দল রওনা দেবে বেরিলিতে। অজন্তা লেদার্স ফ্যাক্টরির মালিক খবর পেয়ে মাঝরাতেই চলে এসেছিলেন থানায়। বললেন, হাদিসের প্লেনভাড়া তিনি দেবেন, সকালের ফ্লাইটে দিল্লি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে বেরিলি বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যাবে।
সাততাড়াতাড়ি টিকিট জোগাড়ে সাহায্য করল থানা, প্লেনেই যাওয়া হল ১৬ অগস্টের ভোরে। হাদিসের সঙ্গে সামসুদ্দিন ছাড়াও গেলেন আলমগির। হাদিসের স্ত্রী ততক্ষণে শয্যা নিয়েছেন, অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করেছেন। সামলানোর জন্য কলকাতায় থেকে গেলেন কুদ্দুস-একলাখ।
বেরিলি পৌঁছতে ১৬ অগস্ট বিকেল হয়ে গেল। ছেলের দেহ শনাক্ত করলেন হাদিস, এবং করেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। পোস্টমর্টেম বেরিলিতেই হল। যেমন ভাবা গিয়েছিল, শ্বাসরোধ করেই মারা হয়েছিল হারুনকে। শরীরের অন্য কোথাও কোনও ক্ষতচিহ্ন ছিল না।
দিনেদুপুরে একটা বাচ্চা ছেলেকে কিডন্যাপ করল কে বা কারা, এবং দেহ পাওয়া গেল কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের বেরিলি স্টেশনে, ট্রাঙ্কবন্দি অবস্থায়! এমনটা কখনও ঘটেনি কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে। কারা ঘটাল?
১৫ অগস্টের মাঝরাতেই ঘণ্টাখানেক আলাদা করে হাদিসের সঙ্গে কথা বলেছিলেন অফিসাররা। পরের দিন সকালে ফ্লাইট, পুত্রশোকে বাক্রুদ্ধ। তবু কিছু প্রশ্ন তো না করলেই নয়।
—কোনও শত্রু ছিল আপনার?
—না স্যার, ছাপোষা মানুষ, বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকি। কোনও শত্রুতা নেই।
—কাউকে সন্দেহ হয়?
—না স্যার। হারুনকে কেন মারল স্যার? ও তো কোনও ক্ষতি করেনি কারওর। আমার সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কাউকে সন্দেহ হয় না। কাকে সন্দেহ করব? আচ্ছা বডি কি সত্যিই হারুনের? কোথাও কোনও ভুল হচ্ছে না তো?
একমাত্র ছেলের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে ট্রাঙ্কে, সুদূর উত্তরপ্রদেশে। মাথা কাজ না করারই কথা। এই মানসিক অবস্থায় কিছু জানতে চাওয়া এবং ঠিকঠাক উত্তরের প্রত্যাশা করাটাই অনুচিত। হাদিসকে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসেন তদন্তকারী অফিসার আশিক। থানায় ফেরার পথে মাথায় পাক খেতে থাকে একাধিক সম্ভাবনা।
প্রথম প্রশ্ন, কিডন্যাপ যে বা যারা করেছে, সে বা তারা মুক্তিপণের টাকা নিতে এল না কেন পার্ক সার্কাসে চার নম্বর ব্রিজের কাছে? টাকা না পেয়েই মেরে দিল? এমন তো হওয়ার কথা নয়।
প্রশ্ন নম্বর দুই, পঁচিশ হাজার টাকার জন্য অপহরণ এবং খুন? পেশাদার গ্যাং খোঁজখবর নিয়ে কাজে নামে। যার থেকে মুক্তিপণ চাইব, তার সেটা দেওয়ার মতো সামর্থ্য আছে কি না সেটা নিশ্চিত জেনে নেয় আগেভাগে খোঁজখবর করে। হাদিস সামান্য চাকুরে, মাস গেলে সাকুল্যে মাইনে হাজার তিনেক। তিনি কোত্থেকে পঁচিশ হাজার দেবেন এক কথায়? ন্যূনতম হোমওয়ার্ক করল না অপহরণকারীরা?
তিন, মোটিভটা কী? টাকা যে নয়, বোঝাই যাচ্ছে। হাদিস অল্পক্ষণের জেরায় বলেছেন, কোনও শত্রু নেই। তা হলে? বেরিলি থেকে ফিরুন, তারপর হাদিসকে আর একবার বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ না করলেই নয়। পারিবারিক কোনও ঝামেলা, যার উৎস আদৌ কলকাতাতেই নয়, গয়ার বাড়িতে? বা অন্য কোথাও? ফ্যাক্টরিতে কোনও গোলমাল?
চার, মৃতদেহ বেরিলি স্টেশনে পৌঁছল কী করে? এত জায়গা থাকতে বেরিলি কেন? দেহ লোপাটের অনেক জায়গা আছে শহরে বা তার কাছেপিঠে। হারুন স্কুল থেকে ১৩ তারিখ বেরিয়েছিল ছুটির পর। আর বাড়ি ফেরেনি। বডি পাওয়া গিয়েছে ১৫ তারিখ রাতের দিকে বেরিলি স্টেশনে। অপহরণের পর হারুনকে নিয়ে ট্রেনে করে বেরিলি রওনা দিয়েছিল কিডন্যাপাররা? খুনটা ট্রেনে হয়েছিল?
পাঁচ, দিনের বেলা, রিপন স্ট্রিটের মতো জনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটা ছেলেকে কে বা কারা তুলে নিয়ে গেল, কেউ দেখল না? অস্বাভাবিক নয়? তা হলে কি পরিচিত কেউ যুক্ত? কাল প্রথম কাজ, স্কুলে যাওয়া। হারুনের ক্লাসে এবং অন্য ছাত্রদের কাছে জানতে চাওয়া, কেউ কিছু দেখেছিল? দারোয়ান এবং অন্যান্য কর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
ছয়, পুরনো ক্রাইম রেকর্ড আজই ঘাঁটতে হবে, প্রয়োজনে রাত জেগে। শহরে গত পাঁচ বছরে কতগুলো কিডন্যাপিং হয়েছে, কেসগুলোর সমাধান হয়েছে কি না, হলে অভিযুক্তরা এখন কোথায়, জেলে না জামিনে বাইরে, খোঁজ নিতে হবে। পুরনো কিডন্যাপারদের ছবি জোগাড় করতে হবে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের CRS (Crime Record Section) থেকে।
সাত, নতুন কোন গ্যাং? কিডন্যাপিং ছিঁচকে অপরাধীর কম্মো নয়। সাধারণত পেশাদার এবং পোড়খাওয়া গ্যাং-ই করে থাকে। পঁচিশ হাজারের জন্য একটা বাচ্চাকে তুলে নিয়ে গিয়ে মেরে দেওয়া, নাহ, হিসেব মিলছে না। একেবারে আনকোরা কোনও চক্র হলে অবশ্য অন্য কথা। পঁচিশ হাজার খুব বেশি টাকা নয় হয়তো, কিন্তু নেহাত কমও না, বিশেষ করে যদি কোনও বেপরোয়া উঠতি গ্যাং হয়।
