আলমগির একটা গাড়ির যন্ত্রাংশ মেরামতির দোকান চালান ইলিয়ট রোডের কাছে। থাকেন সপরিবারে ব্রাইট স্ট্রিটে, হাদিসের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক। সুখ-দুঃখে একে অন্যের পাশে থাকেন নিঃস্বার্থ।
হারুনের হারিয়ে যাওয়ার খবরে সবচেয়ে বিচলিত কুদ্দুস আলম। যিনি ভীষণ প্রিয় ছিলেন বালক হারুনের। ‘কুদ্দুস চাচা’ বলতে অজ্ঞান। ফুটবলের নেশা চাচাই ধরিয়েছিলেন। আগা মেহেন্দি রোডে সামসুদ্দিন-হাদিসের ভাড়ার ফ্ল্যাটে থাকতেন। হাদিস অস্থায়ী পার্টটাইম কাজ জুটিয়ে দিয়েছিলেন কুদ্দুসকেও, ওই অজন্তা লেদার্স ফ্যাক্টরিতেই।
সারারাত ছোটাছুটি করেও যখন খোঁজ মিলল না হারুনের, পরের দিন সকালে, ১৪ অগস্ট, পার্ক স্ট্রিট থানায় মিসিং ডায়রি করলেন হাদিস। GDE (জেনারেল ডায়রি এন্ট্রি) নম্বর ১৫১৫। পুলিশকে জানালেন না, আগের দিন, ১৩ অগস্ট, বিকেল সোয়া তিনটে নাগাদ ফ্যাক্টরিতে একটা ফোন এসেছিল।
—হাদিসভাই, আপনার ফোন…
অজন্তা লেদার্সের বহুদিনের কর্মী ফজলুল ডাক দেন কাজে ব্যস্ত হাদিসকে।
—আমার? কে?
বলল না। আপনাকে খুঁজছে।
হাদিস রিসিভার কানে দেন। ওপার থেকে ভাঙাভাঙা গলায়, থেমে থেমে বলতে থাকে অপরিচিত।
—আপনার ছেলে আমাদের কাছে। আজ রাত দশটা নাগাদ পার্ক সার্কাসের ৪ নম্বর ব্রিজের মুখে দাঁড়াবেন। পঁচিশ হাজার টাকা একটা কালো ব্যাগে নিয়ে আসবেন। আমাদের লোক থাকবে। মাথায় লাল টুপি, ডানহাতে ঘড়ি। ওকে ব্যাগটা দিয়ে দেবেন। পুলিশে জানাতে পারেন। তবে জানালে আর ছেলেকে জীবিত পাবেন না। টাকা পেলে কাল সন্ধের মধ্যে ছেলেকেও পাবেন। আর একটা কথা, একা আসবেন। চালাকি পছন্দ করি না আমরা।
ফোন কেটে যাওয়ার পর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল হাদিসের। পঁচিশ হাজার? মাসমাইনের চাকরি, চলে যায় মোটামুটি। এখন বিকেল সোয়া তিনটে। রাত দশটার মধ্যে এত টাকা জোগাড় হবে কী করে? ফোনে একবার হারুনের সঙ্গে কথা বলতে চাওয়ার কথাও মাথায় এল না। একবার ‘আব্বা’ ডাকটা শুনতে পেলে মনটা শান্ত হত একটু।
সামসুদ্দিন হাজার দুয়েক দিলেন, কুদ্দুস-একলাখ দিলেন হাজার খানেক করে। আলমগির জোগাড় করলেন চার হাজার। ফ্যাক্টরির মালিক খুবই পছন্দ করতেন হাদিসকে, বিপদে পাশে দাঁড়ালেন। দিলেন পাঁচ হাজার। পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে ধার আর নিজের সঞ্চয় থেকে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেল পঁচিশে। ব্রাইট স্ট্রিটের বাড়ি থেকে পার্ক সার্কাস আর কতটুকু? রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ হেঁটেই রওনা দিলেন কালো ব্যাগ হাতে। একাই।
সোয়া দশটা বাজল, ক্রমে সাড়ে দশটা, অপেক্ষা করতে করতে একসময় ঘড়ির কাঁটা দশকে অগ্রাহ্য করে এগারো ছুঁল। কোথায় সেই মাথায় লাল টুপি, ডানহাতে ঘড়ি? সাড়ে এগারোটা অবধি ধৈর্য ধরেও যখন কেউ এল না, একরাশ উদ্বেগ-আশঙ্কা-দুশ্চিন্তা নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন হাদিস।
মাথা কাজ করছে না আর। কোথায় গেল ছেলেটা? কারা কিডন্যাপ করল? কেন? বাড়িতে ইতিমধ্যেই অবস্থা সঙ্গিন। স্ত্রী নাওয়া-খাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন। মেয়ে বারবার জানতে চাইছে দাদার কথা। কী করবেন এখন?
আত্মীয়স্বজন-পাড়াপ্রতিবেশী সবাই গতকাল থেকে একই কাটা রেকর্ড বাজিয়ে চলেছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাল লাগছে না আর শুনতে। কী ঠিক হয়ে যাবে? হারুনকে ফিরে না পেলে কীভাবে ঠিক হয়ে যাবে সব? যার যায়, তারই যায়। অন্যরা কী করে বুঝবে হারুনের মুখটা মনে পড়লেই ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কোথায় আছে, কেমন আছে ছেলেটা?
পুলিশে জানানো দরকার এবার। মুক্তিপণ চেয়ে ফোনের কথাটা বলব? না কি আপাতত মিসিং ডায়েরি করে রেখে অপেক্ষা করা উচিত পরের ফোনের? কিডন্যাপাররা হয়তো আজ ইচ্ছে করেই টাকাটা নিল না, দূর থেকে নজর রাখছিল? না, আর একদিন দেখি, পুলিশকে বললে যদি জানতে পেরে যায় ওরা, মেরে ফেলে হারুনকে? আর ভাবতে পারেন না হাদিস।
মুক্তিপণের ফোনের ব্যাপার চেপে যাওয়া হল ১৪ তারিখ সকালের মিসিং ডায়েরিতে। কিন্তু সারাদিন অপেক্ষার পরও যখন আর ফোন এল না টাকা চেয়ে, বিপর্যস্ত হাদিসকে নিয়ে সামসুদ্দিন-কুদ্দুস-একলাখ-আলমগির এবং কয়েকজন সহকর্মী পার্ক স্ট্রিট থানায় এলেন সেদিনই সন্ধেবেলায়। সব খুলে বললেন হাদিস, অভিযোগ দায়ের হল। তদন্তের দায়িত্ব নিলেন সাব-ইনস্পেকটর আশিক আহমেদ, যিনি বর্তমানে তপসিয়া থানার ওসি।
থানা থেকে যখন বেরচ্ছেন লেখাজোকা শেষ হওয়ার পর, হাদিস দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, পরের
দিনই ফিরে আসতে হবে আবার, চরম দুঃসংবাদ পেয়ে।
যা যা সঙ্গে থাকে ওই বয়সের স্কুলছাত্রের সঙ্গে, সব ছিল। খাতাবই স্কুলব্যাগের ভিতর, ওয়াটারবটল, টিফিনবক্স। স্কুলের ইউনিফর্ম পরা বালকের নিথর দেহ পড়ে ট্রাঙ্কের ভিতর।
শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে, গলায় আঙুলের স্পষ্ট দাগ দেখে অনুমান করতে অসুবিধে হয় না বেরিলি থানার ওসি-র। পরিচয়ও জানা যায় সহজেই, প্রত্যেকটি খাতায় নাম লেখা আছে গোটা গোটা অক্ষরে।
—স্যার লড়কা কা নাম হারুন রশিদ, কলকাত্তা কা কোই Progressive Day School কা স্টুডেন্ট লাগতা হ্যায়।
—স্কুল কা ফোন নম্বর পতা করো য্যায়সে ভি হো … অউর কলকাত্তা ট্রাঙ্ককল বুক করো জলদি ….
