বেরিলি জিআরপি (Government Railway Police) থানাকেও শশব্যস্ত থাকতে হয় চব্বিশ ঘণ্টাই। দিনে গড়ে দশটা মিসিং ডায়রি হবেই। বাচ্চাদের অনেকেই দলছুট হয়ে যায় রোজ, কপাল নেহাত খারাপ না হলে পাওয়া যায় খোঁজাখুঁজির পর। আর বড় স্টেশন মানেই, কে না জানে, পকেটমারদের যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারাণসী। বেরিলিও ব্যতিক্রম নয়। সকাল-সন্ধে মিলিয়ে পকেটমারির অভিযোগ জমা পড়ে ডজন ডজন। রাত বাড়লে সাইডিং-এর আধো-অন্ধকারে মদ-জুয়ার মোচ্ছব তো রোজকার উপদ্রব। প্ল্যাটফর্মের এমাথা-ওমাথা টহলদারি চালাতেই হয় তিন শিফটে। মর্নিং, ইভনিং, নাইট। ঢিলেমির জো নেই এতটুকু।
সন্ধে তখন রাতের চৌকাঠে পা দেব-দেব করছে। প্ল্যাটফর্মে টহল দিতে দিতেই বড় স্টিলের ট্রাঙ্কটা নজরে এল দুই কনস্টেবলের।
এখানে এভাবে পড়ে কেন? কুলি নিয়ে এসে রেখেছিল? ট্রেনে ওঠাতে ভুলে গেছে, আর যার জিনিস সে-ও খেয়াল করেনি? না কি কেউ রেখে গিয়ে কিছু কিনে-টিনে আনতে গেছে, চলে আসবে শিগগির? কিন্তু এভাবে কোনও পাহারা ছাড়া মালপত্র ফেলে রেখে গেলে হাওয়া হয়ে যেতে আর কতক্ষণ? থানায় নিয়ে যাওয়াই ভাল, না হলে একটু পরেই হয়তো কেউ এসে কান্নাকাটি জুড়বে, আমার ট্রাঙ্ক চুরি হয়ে গেছে, অমুক প্ল্যাটফর্মের তমুক জায়গায় রাখা ছিল। মালপত্র আকছার চুরি হয় এই স্টেশনে, নতুন কিছু নয়।
ধরাধরি করে ট্রাঙ্ক আনা হল থানায়। ওসি এবং অন্য অফিসাররা উলটেপালটে দেখলেন। নাহ, কোথাও এমন কিছু লেখা নেই, যা থেকে মালিকের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। ওসি সিদ্ধান্ত নিলেন, খুলেই দেখা যাক কী আছে ভিতরে, জিনিসপত্র থেকে যদি সন্ধান মেলে মালিকের।
তালা ভাঙা হল এবং ট্রাঙ্কের ভিতরের দৃশ্যে আঁতকে উঠলেন বেরিলি জিআরপি থানার কর্মী-অফিসাররা। যাঁরা লাশ দেখে অভ্যস্ত এবং হঠাৎ মৃতদেহ দেখে যাঁদের বিচলিত হওয়ার কারণ নেই কোনও।
হারুন রশিদ হত্যা মামলা। পার্ক স্ট্রিট থানা, কেস নম্বর ৫৩৯। তারিখ ১৫/৮/৯৪। ধারা ৩৬৪/৩০২/২০১/৩৪ আইপিসি। খুনের উদ্দেশ্যে অপহরণ, খুন, প্রমাণ লোপাট এবং একই অপরাধের উদ্দেশ্যে একাধিকের সম্মিলিত পরিকল্পনা। মহম্মদ হাদিস সপরিবারে থাকতেন পার্ক স্ট্রিট থানা এলাকার ২২/২এ, ব্রাইট স্ট্রিটে। আদি বাড়ি বিহারের গয়া জেলায়। চাকরির সন্ধানে আটের দশকের মাঝামাঝি চলে আসেন কলকাতায়। চেষ্টাচরিত্রের পর চাকরি জোটে অজন্তা লেদার্স ফ্যাশন লিমিটেডে। ইলিয়ট রোডের কাছে সিরাজুল ইসলাম লেনে কোম্পানির ফ্যাক্টরি, তৈরি হয় চামড়ার জিনিসপত্র। কাজে ফাঁকি দেওয়া হাদিসের ধাতে ছিল না। দক্ষ কর্মী হিসেবে অল্পদিনেই মালিকের অত্যন্ত বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছিলেন।
ছোট পরিবার, সুখী পরিবার। স্ত্রী, নয় বছরের ছেলে হারুন আর বছর চারেকের ফুটফুটে মেয়ে। যার সেভাবে নামই ঠিক হয়নি এখনও। বাবা-মা-দাদা যে যেমন খুশি ডাকে আদর করে।
ছেলেমেয়েকে কলকাতায় পড়াবেন, ইচ্ছে ছিল হাদিসের। হারুন একটু বড় হতেই গয়ার স্কুল থেকে ছাড়িয়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। একটু বেশি বয়সেই হারুনকে ভরতি করলেন রিপন স্ট্রিটের ‘Progressive Day School’-এ ক্লাস ওয়ানে। হারুন তখন নয়। সালটা ১৯৯৪।
স্কুল শুরু হত সকাল সাড়ে সাতটায়। ছুটি বারোটায়। ট্রামে করে হারুনকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন হাদিস। ছুটির পর কখনও হেঁটে, কখনও ট্রামে, একাই সাধারণত বাড়ি ফিরত হারুন। খেয়েদেয়ে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়েই বিকেলে পাড়ায় ফুটবল পেটাতে ছুটত।
১৩ অগস্টের বিকেলে অন্যরকম হল। ফুটবল নিয়ে দাপানো তো দূরের কথা, স্কুল থেকে বাড়িই ফিরল না হারুন। সাড়ে বারোটার মধ্যে যে ছেলে চলে আসে, তিনটে পেরিয়ে সাড়ে তিনটে বেজে গেলেও তার পাত্তা নেই। কোথায় গেল? কী হল হারুনের?
খবর গেল হাদিসের কাছে, সব কাজ ফেলে বাড়ি ফিরলেন তড়িঘড়ি।
হারুনের স্কুল
খোঁজ-খোঁজ। স্কুলে ছোটা হল প্রথমে। দারোয়ান জানালেন, ছাত্ররা সবাই রোজকার মতো বেরিয়ে গিয়েছে। আলাদা করে হারুনকে খেয়াল করেননি। বন্ধুদের বাড়ি যেতে পারে? খোঁজখবর হল। নেই। পাড়াপ্রতিবেশীরা ভিড় জমালেন, এলেন অফিসের সহকর্মীরাও। হাদিস খবর দিলেন চার ঘনিষ্ঠ শুভানুধ্যায়ীকে। ছুটে এলেন মহম্মদ সামসুদ্দিন, কুদ্দুস আলম, মহম্মদ একলাখ এবং দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী আলমগির।
চারজনই বহুদিনের পরিচিত হাদিসের। সবারই বয়স তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। একলাখ ছাড়া গয়ারই বাসিন্দা সবাই, কর্মসূত্রে কলকাতায়। সামসুদ্দিন অনেকদিনের বন্ধু, ছোটখাটো কাপড়ের ব্যবসা আছে। বন্ধুর সঙ্গে যৌথভাবে ৩৬, আগা মেহেন্দি লেনে একটা ছোট দু’কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন হাদিস বছরখানেক হল। গ্রামের বাড়ি থেকে আত্মীয়পরিজনরা প্রায়ই আসে, থাকতে দেওয়ার তো একটা জায়গা চাই। সেই উদ্দেশ্যেই বাড়ি ভাড়া।
মহম্মদ একলাখের বাড়ি বিহারের ছাপড়ায়। কাজ করতেন অজন্তা লেদার্সেই, হাদিসের সুপারিশেই চাকরি। কৃতজ্ঞ ছিলেন স্বাভাবিক কারণেই, হাদিসের পরিবারের যে-কোনও বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন সবার আগে। দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে ফ্যাক্টরির চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন সম্প্রতি, টুকটাক ব্যবসাপাতিতে দিন গুজরান। অবিবাহিত, বাবার সঙ্গে থাকেন ৪, দেদার বক্স লেনের একটা দু’কামরার ভাড়াবাড়িতে।
