বয়ান নেওয়া হল আইনজীবী বিকাশ পালেরও, যিনি আনন্দবাজারে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। বিকাশকে নিয়োগ করেছিলেন নন্দলাল, সম্পত্তি বেচাকেনায় কোনও আইনি জটিলতা রয়েছে কি না খতিয়ে দেখতে। বিক্রয়প্রক্রিয়া চলাকালীন অলোক আগাগোড়া বলে এসেছিলেন, তাঁরা দুই ভাই, এক বোন। বাড়ির দলিলপত্র পুরসভায় ‘সার্চ’ করে অন্য তথ্য পেয়েছিলেন বিকাশ। নথি বলেছিল, চার ভাই, এক বোন। প্রশ্ন করায় অস্বীকার করেছিলেন অলোক, এড়িয়ে গিয়েছিলেন উত্তর। অবধারিত সন্দেহের উদ্রেক হয়, কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিকাশ। যে বিজ্ঞাপন দেখা দিয়েছিল রহস্যভেদের প্রধান অনুঘটক রূপে। বিকাশও আদালতে চিহ্নিত করেছিলেন অলোক-মমতা-মৃণালকে।
মূল কাজটি অবশ্য তখনও অসমাপ্ত। প্রায় কঙ্কালে পরিণত দেহ যে বিশ্বনাথেরই, তার সন্দেহাতীত প্রমাণ।
ময়নাতদন্ত করেছিলেন অধ্যাপক ডা. অপূর্বকুমার নন্দী, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক অ্যান্ড স্টেট মেডিসিন বিভাগের তৎকালীন প্রধান। দীর্ঘ কর্মজীবনে কয়েক হাজার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ডা. নন্দী রিপোর্টে লিখলেন, “Death in my opinion was caused by compression of neck, for example, throttling ante-mortem and homicidal in nature.” জানালেন, মৃতের বয়স আনুমানিক তেতাল্লিশ। বিশেষ তাৎপর্যের, অমরনাথ-সমরনাথ-অনুরাধা জানিয়েছিলেন, গজদাঁত ছিল বিশ্বনাথের। সেই গজদাঁতেরও উল্লেখ ছিল রিপোর্টে, যা চিহ্নিতকরণের পক্ষে অন্যতম পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য হয়েছিল বিচারপর্বে।
দেহ শনাক্তকরণে তর্কাতীত প্রমাণ অবশ্য মিলেছিল ‘photographic superimposition’ পদ্ধতিতে। তদন্তকারী অফিসারের আর্জিতে যার সফল প্রয়োগ করেছিলেন কলকাতার Central Forensic Science Laboratory (CFSL)-র তৎকালীন ডেপুটি ডিরেক্টর ড. ভি কে কশ্যপ। ১৯৬০ সালে পঞ্চম শুক্লা হত্যা মামলায় কলকাতা তথা ভারতে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল ‘সুপারইমপোজ়িশন’ পদ্ধতি। বিশ্বনাথ দত্তের খুনের মামলায় যার প্রয়োগ কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে হয়েছিল দ্বিতীয়বার, চৌত্রিশ বছর পরে।
মৃতের করোটি। গজদাঁতের চিহ্নিতকরণের অন্যতম প্রমাণ
রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, “The super-imposition test suggests that the skull and the mandible belonged to a person whose photographs were forwarded to me for test.”
ঘটনার ‘কী-কেন-কখন-কীভাবে’ এত নিখুঁত উঠে এসেছিল অতনুবাবুর চার্জশিটে, অভিযুক্তদের আইনজীবী হালে পানি পাননি। অলোকনাথ-মমতা–শিবশঙ্কর-মৃণালকে ফাঁসির সাজা শোনান সেশন কোর্ট, ২০০০ সালে। যা বহাল রাখেন কলকাতা হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট অলোকের সাজা লঘু করে দণ্ডিত করেন যাবজ্জীবন কারাবাসে। বাকিদের, যাঁদের দীর্ঘ কারাবাস ততদিনে সম্পূর্ণ, মুক্তি দেওয়া হয়।
অলোকনাথ সম্প্রতি বহরমপুর জেলে পরলোকগত হয়েছেন। আপাতত ‘সর্বোচ্চ’ আদালতের বিচারাধীন হয়তো।
বিবরণীর সূচনা ‘পথের কাঁটা’-র উদ্ধৃতি দিয়ে। সমাপ্তিতেও নিই শরদিন্দুর শরণ। ব্যোমকেশের সেই বহুপঠিত কাহিনি মনে করুন, যাতে বৃদ্ধ করালীবাবুকে খুন করা হয়েছিল মেডালা আর ফার্স্ট সার্ভিকল ভার্টিব্রার সন্ধিস্থলে ছুঁচ ফুটিয়ে।
কল্পনার করালীবাবুর হত্যার সঙ্গে বাস্তবের বিশ্বনাথের খুনের বাহ্যত মিল নেই কোনও। তলিয়ে ভাবলে মনে হয়, সত্যিই নেই? মোটিভের মোহনায় তো মিলেমিশে গেছেই দুই হত্যাকাণ্ডের কল্পনা আর বাস্তব।
অর্থমনর্থম!
১.০৮ কী বিচিত্র এই দ্বেষ!
[হারুন হত্যামামলা
তদন্তকারী অফিসার আশিক আহমেদ এবং বিকাশ চট্টোপাধ্যায়]
—রোল নাম্বার ওয়ান?
—প্রেজেন্ট মিস!
—রোল নাম্বার টু?
—ইয়েস মিস!
—থ্রি?
—প্রেজেন্ট প্লিজ়!
—রোল নাম্বার ফোর?
উত্তর না পেয়ে অ্যাটেনডেন্সের খাতা থেকে মুখ তোলেন শাহনাজ, রিপন স্ট্রিটের Progressive Day School-এর ক্লাস ওয়ানের টিচার |
—হারুন কোথায়? আসেনি?
—না মিস, অ্যাবসেন্ট।
—ওকে, রোল নাম্বার ফাইভ?
রোল কল চলতে থাকে। সিক্স, সেভেন, এইট…
আমাদের হাওড়া-শিয়ালদায় যেমন অষ্টপ্রহর থিকথিক জনস্রোত, এখানেও তা-ই। একই ছবি মোটামুটি। কাঁধে বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে কুলিদের ব্যস্তসমস্ত যাতায়াত, এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্যতে। ক্লান্তিহীন। হিন্দি-ইংরেজিতে ট্রেনের ঘোষণা মিনিটে মিনিটে, পাল্লা দিয়ে ইঞ্জিনের ধোঁয়ার কুণ্ডলী, আওয়াজের গজরানি। এক একটা ট্রেন থামছে, উগরে দিচ্ছে মানুষের দঙ্গল। এক একটা ছাড়ছে, টইটম্বুর যাত্রীদল সমেত। স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সি-অটোর স্ট্যান্ডে নিত্যদিনের জটলা চালকদের। পান-বিড়ি-সিগারেটের আড্ডা। ওঁরা জানেন, খদ্দেরের অভাব এখানে হওয়ার নয়। সে কাকভোর হোক বা মাঝরাত। নির্জনতার প্রবেশ নিষেধ এ তল্লাটে।
বেরিলি জংশন। দিল্লি থেকে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দূরের স্টেশন। উত্তরপ্রদেশের পাঁচটি ব্যস্ততম স্টেশনের তালিকা বানাতে বসলে বেরিলির অন্তর্ভুক্তি অবধারিত। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রোজ ছোটে দূরপাল্লার ট্রেন। সঙ্গে যোগ করুন যাত্রীবোঝাই লোকাল ট্রেনের দৈনন্দিন কু-ঝিকঝিক আর যথেষ্ট সংখ্যায় পণ্যবাহী গাড়ির প্রাত্যহিক আসা-যাওয়া।
