বিশ্বনাথ দত্ত-র কঙ্কাল
২২ জানুয়ারি, ১৯৯৪। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরলেন বিশ্বনাথ, ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে ব্যাংকের একটি বিচিত্রানুষ্ঠান দেখে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাবেন, মুখোমুখি অলোকনাথের সঙ্গে।
—ধাবুদা, আজ তুই আমাদের ঘরের লাগোয়া বারান্দাটায় শুয়ে পড়বি?
—কেন রে?
—না, ঘরগুলোর যা অবস্থা, মিস্ত্রি লাগিয়েছি একটু চুনকামের জন্য। তাড়াহুড়োয় বলা হয়নি আগে। আজ তিনতলাটা ধরেছে, কাল-পরশু দোতলাটা করবে।
বিশ্বনাথ দেখতেও পেলেন কয়েকটি সিমেন্টের বস্তা দু’তলা থেকে তিনতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখে। ভাইকে বিশ্বাস করলেন। খাওয়াদাওয়া সেরে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়লেন দু’তলায় ভাইয়ের ঘরের লাগোয়া বারান্দায়। মৃণাল পূর্বপরিকল্পনা মাফিক সাড়ে ন’টার মধ্যেই এসে পৌঁছলেন, অপেক্ষা করলেন অলোকনাথের ঘরে। যেখানে তখন উপস্থিত শিবশঙ্করও। এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল অলোকের পুত্র-কন্যারা। ঘড়ির কাঁটা যখন পেরল সাড়ে বারোটা, অলোক বেরলেন ঘর থেকে। ফিরলেন মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই।
—দাদা ঘুমিয়ে পড়েছে। মমতা, কম্বলটা দাও।
কম্বল নিয়ে শিবশঙ্কর, মৃণাল আর অলোক এলেন বারান্দায়, যেখানে বিশ্বনাথ গভীর
নিদ্রাচ্ছন্ন। শিবশঙ্কর দুই পা চেপে ধরলেন বিশ্বনাথের, মৃণাল হাত দুটো। অলোক কম্বল চাপা দিলেন দাদার মুখে, সর্বশক্তি প্রয়োগে চেপে ধরে থাকলেন প্রায় মিনিটসাতেক। হাত-পায়ের নিষ্ফল ছটফটানি ক্রমে থেমে এল বিশ্বনাথের। কম্বল মুখ থেকে তুলে নাকের কাছে হাত নিয়ে পরীক্ষা করলেন অলোকনাথ। চোখের পাতা টেনে দেখলেন…
নাহ্, নিশ্বাস পড়ছে না আর, কাজ হয়ে গেছে।
কাজ আরও বাকি ছিল, সম্পূর্ণ করলেন চক্রী-চতুষ্টয়, অলোক-মমতা-মৃণাল-শিবশঙ্কর। মিস্ত্রিদের দিয়ে কিছুদিন আগেই অলোক দু’তলার একটি ঘরে নতুন করে ভিত করিয়ে রেখেছিলেন ঠাকুরের বেদির। যেমন বেদি দেয়ালের সঙ্গে ছিল বিডন স্ট্রিটের বাড়ির অধিকাংশ ঘরেই। মজুত ছিল পর্যাপ্ত সিমেন্ট-বালিও।
বিশ্বনাথের নিস্পন্দ দেহকে বেদির মধ্যে পা মুড়িয়ে ঢোকানো এবং অতঃপর গাঁথনি, প্রমাণ লোপাটে ভোর হয়ে গেল প্রায়। মৃণাল ফিরে গেলেন নিমতার বাড়িতে, শিবশঙ্কর রোজকার মতো শুয়ে পড়লেন বারান্দায়, যেখানে ঘণ্টাখানেক আগেই ঘুমোচ্ছিলেন বিশ্বনাথ। এবং পাশের ঘরের দেওয়ালে দাদার মৃতদেহ গেঁথে দেওয়ার পর অলোকনাথ-মমতা ঘরে ফিরে নিদ্রা গেলেন নির্বিকার।
অলোক-মমতা-শিবশঙ্কর গ্রেফতার হয়েছিলেন মৃতদেহ আবিষ্কারের দিনই। মৃণাল ধরা পড়লেন পরের দিন, নিমতার বাড়ি থেকে।
তদন্তের দায়িত্ব ন্যস্ত হল অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরই। পুলিশকর্মী নিজের দাদাকে হত্যা করে পুঁতে রেখেছিলেন বাড়ির দেওয়ালে, অশ্রুতপূর্ব এই ঘটনায় শহর জুড়ে তুমুল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিকই ছিল। যেমন স্বাভাবিক ছিল দ্রুত চার্জশিট পেশ করে শাস্তিবিধানের চাপ। অলোকনাথ যে প্রকৃতির মানুষ, পুলিশকে দেওয়া বয়ান সম্পূর্ণ অস্বীকার করবেন আদালতে, অনায়াসে অনুমেয়। পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতেই দোষী সাব্যস্ত করতে হবে অভিযুক্তদের, স্পষ্ট ছিল গোড়া থেকেই।
তদন্ত হল ম্যারাথন। অভিযুক্তদের গ্রেফতারির অর্থ, বিয়াল্লিশ কিলোমিটারের মধ্যে অতিক্রান্ত মাত্র দশ। বাকি বত্রিশে প্রমাণ সংগ্রহ, চার্জশিট পেশ এবং আদালতে বিচারান্তে শাস্তিপ্রাপ্তি। দৌড় শুরু করলেন অতনু। প্রমাণ একত্রিত করার জরুরি কাজটি সম্পন্ন করলেন নিখাদ নিষ্ঠায়, প্রত্যয়ী পরিশ্রমে।
বাগুইআটির অশ্বিনীনগরে অলোকনাথের ভাড়া করা ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হল বিশ্বনাথের তিনটি ট্রাঙ্ক। যাতে ছিল পোশাকআশাক, প্রচুর পুরনো মুদ্রা আর গানের রেকর্ড-ক্যাসেট। অর্থলোভ কতটা অতলগামী করে ফেলে মানুষকে, তার প্রমাণ মিলল ২৪/এ, নিমতলা ঘাট স্ট্রিট-নিবাসী গোবিন্দ সর্দারের বাড়িতে। যাঁকে বিশ্বনাথের পাম্পসেট এবং কিছু আসবাবপত্র বেচে দিয়েছিলেন অলোকনাথ এবং কবুল করেছিলেন জেরায়।
বাড়ি বিক্রির দলিলে সই করেছিলেন অলোক-মৃণাল-মমতা। ত্রয়ীর হস্তাক্ষরের নমুনা (Specimen hand writing) সংগ্রহ করে পাঠানো হল ফরেনসিক পরীক্ষায়, প্রত্যাশিতভাবেই মিলে গেল হুবহু।
পুলিশ ট্রেনিং স্কুলের অস্ত্রাগারে (Armoury) কর্মরত ছিলেন অলোকনাথ। হাজিরা খাতা খুলে দেখা গেল, ২৩ জানুয়ারি ডিউটিতে এসে কিছু পরেই মেয়ের অসুস্থতার অজুহাতে বেরিয়ে যান। ফের কাজে যোগ দেন সপ্তাহখানেক পর। খুনটা হয়েছিল ২২-র রাতে। পরের সাতদিন অলোক ব্যস্ত থেকেছিলেন নন্দলালদের মালিকানা দেওয়ায় এবং অন্য সম্ভাব্য প্রমাণ লোপাটে। পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কর্মক্ষেত্রে ওই ঘটনা-উত্তর অনুপস্থিতি।
সিমেন্ট-বালি অলোকনাথ কিনেছিলেন সৌমিত্র নায়ক নামের এক ইমারতি সামগ্রী বিক্রেতার থেকে, জানুয়ারির মাঝামাঝি। দোকান এবং দোকানের মালিক, দুই-ই চিহ্নিত হল। আদালতে রাখঢাকহীন বয়ান দিলেন সৌমিত্র, চিহ্নিত করলেন ক্রেতা অলোকনাথকে।
গ্রেফতারির পর থেকেই মৃণাল দত্ত তদন্তকারীদের বলে আসছিলেন, যে পাপ করেছি, তার ক্ষমা নেই। অভিনয় নয়, বাস্তবিকই অনুতাপদগ্ধ ছিলেন মৃণাল, মনে হয়েছিল অতনুর। মৃণাল সম্মত হয়েছিলেন আদালতে বিচারপতির কাছে জবানবন্দি (judicial confession) দিতে। ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন পুঙ্খানুপুঙ্খ। যা চূড়ান্ত সহায়ক হয়েছিল শাস্তিবিধানে।
