জেরায় নাজেহাল অলোকনাথ মাঝেমাঝেই কেঁদে ফেলছেন, জবানবন্দিতে ছেদ টানছে স্বগতোক্তি, ‘এ আমি কী করলাম! ক্ষমা করে দিন স্যার!’
এসব কুম্ভীরাশ্রু অনেক দেখেছেন গোয়েন্দারা, বাকিটা বলতে বাধ্য করছেন নির্মোহ নৈপুণ্যে, তারপর কী হল?
—ব্রোকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। খদ্দেরও পেয়ে গেলাম কয়েকজন। মৃণাল আমার শালা, আমি আর মমতা মিলে বোঝালাম মৃণালকে, ধাবুদার নামে সই করতে হবে বেচাকেনার দলিলে, বিশ্বনাথ দত্ত সেজে। প্রথমে রাজি হচ্ছিল না, কিছু টাকা দিলাম। মৃণাল সামান্য চাকরি করত, রাজি হয়ে গেল।
—তারপর?
—নন্দলাল সিং নামে এক অবাঙালি খদ্দেরের সঙ্গে চুক্তি ফাইনাল হল। বাড়ি দেখতে এলেন নন্দলাল। ধাবুদা যখন অফিসে, তখন দেখালাম। মৃণালকে পরিচয় দিলাম বিশ্বনাথ দত্ত হিসেবে, আর মমতাকে নিজের দিদি অনুরাধা হিসেবে। দোতলা আর তিনতলার ঘরগুলো বেচার এগ্রিমেন্ট হল, সইসাবুদ জানুয়ারির মাঝামাঝি। মৃণাল-মমতা সই করল বিশ্বনাথ-অনুরাধা হিসেবে। অ্যাডভান্স হিসেবে ষাট হাজার মতো পেলাম।
নন্দলালদের তাড়া ছিল। তাগাদা দিচ্ছিলেন, কবে পজেশন পাবেন? দখল পাওয়ার এবং রেজিস্ট্রেশনের পর বাকি লাখদুয়েক দেওয়ার কথা হয়েছিল। ধাবুদা থাকলে কী করে পজেশন দেব? অ্যাডভান্স নিয়ে ফেলেছি, বাগুইআটির অশ্বিনীনগরে ফ্ল্যাট ভাড়াও হয়ে গেছে, যেখানে উঠে যাব ঠিক করেছিলাম বাড়ি বিক্রির পর।
—এর পর?
—ধাবুদাকে মেরে ফেলা ছাড়া তো আর উপায় ছিল না স্যার।
—তা কী উপায় করলেন?
—২২ জানুয়ারি রাতে ধাবুদা সাড়ে দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরল। বললাম বাড়িতে মিস্ত্রি লেগেছে, আমাদের বারান্দায় শুয়ে পড়ো। সরল মানুষ ছিল, বিশ্বাস করল। রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ আমি-শিবশঙ্কর-মৃণাল মিলে কম্বল চাপা দিয়ে মেরে ফেললাম। পরের দিন বিকেলেই পজেশন দিলাম নন্দলালকে। ওঁরা চলে এলেন, দখল নিলেন ঘরগুলোর। আমি বললাম, আমার ঘরটা কয়েকদিন পরেই ছেড়ে দেব। জিনিসপত্র শিফট করতে একটু সময় দরকার। নন্দলাল রাজি হয়ে গেলেন।
—বডি কোথায়?
—পুঁতে দিয়েছি স্যার।
—সে তো বুঝলাম, কিন্তু কোথায়?
অলোক নিরুত্তর। কলার ধরে ঝাঁকুনি দিতে কথা বেরল অস্ফুটে।
—নিমতলা ঘাটের কাছে স্যার।
—জায়গা দেখাতে পারবেন?
—হ্যাঁ স্যার।
কালবিলম্ব না করে গাড়ি ছুটল নিমতলা ঘাটে। অলোক একবার এ-জায়গা দেখাচ্ছেন, একবার ও-জায়গা। যেন দিকভ্রান্ত, অকস্মাৎ স্মৃতিভ্রষ্ট।
অপরাধীর এহেন অকাল স্মৃতিভ্রংশের সঙ্গে পরিচিত গোয়েন্দারা। বুঝলেন, সহজে কবুল করবেন না অলোকনাথ। একে লালবাজারে নিয়ে যাওয়া দরকার, থানায় হবে না। তবে তার আগে অলোকনাথের এবং বিশ্বনাথের ঘরটা সার্চ করা প্রয়োজন, সকালের তাড়াহুড়োয় আর হট্টগোলে করা যায়নি। স্থির হল, ঘরগুলো তল্লাশি করে seizure list তৈরি করে তারপর সোজা লালবাজার। অনেক সময় আছে, কতক্ষণ চেপে রাখবে সত্যিটা?
ফের বিডন স্ট্রিট। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা ততক্ষণে দখল নিয়ে ফেলেছেন বাড়ির।
বারান্দার এবং বাড়ির বাকি অংশের স্কেচম্যাপ তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। শিবশঙ্কর এবং মমতাকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। দু’জনেরই মুখে কুলুপ। মৃণালের নিমতার বাসস্থানের খোঁজে টিম বেরিয়ে গিয়েছে। কাদের কাদের জেরা করা আশু প্রয়োজন, তৈরি হচ্ছে তালিকা। তদারকিতে ডিসি ডিডি স্বয়ং, সহায়তায় ডিসি নর্থ।
হোমিসাইড বিভাগের টিমে ছিলেন অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন আটাশ বছরের তরুণ সাব-ইনস্পেকটর, অধুনা ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার। অতনু ছিলেন অনুসন্ধিৎসু স্বভাবের, সজাগ মস্তিষ্ক এবং ক্ষুরধার বুদ্ধির সুবাদে প্রিয়পাত্র ঊর্ধ্বতন অফিসারদের।
তন্নতন্ন করে প্রতিটি ঘর খুঁজে যখন প্রস্তুতি চলছে seizure list-এর, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা খুঁজছেন বারান্দায় হাত বা পায়ের ছাপের নমুনা, অতনুও ঘুরে দেখছিলেন এঘর-ওঘর। হঠাৎই চোখ আটকে গেল নন্দলালের ঘরের দেওয়ালে। ঠাকুরের বেদি, যেমন আছে এবাড়ির অধিকাংশ ঘরে। কিন্তু এটার রং একটু অন্যরকম লাগছে না? একটু কাঁচা মনে হচ্ছে না চোখের দেখায়? বাকি দেওয়ালের রঙের সঙ্গে একটু তফাত যেন? ঘরের সমস্ত অংশ সাদা, এই বেদিটা একটু ক্রিমরঙা, সামান্য লালচেও না? বিদ্যুৎঝলক খেলে যায় অতনুর মাথায়।
—স্যার, একবার এদিকে আসবেন?
সিমেন্ট করা সেই বেদিটি, যার নীচে মৃতদেহ ছিল
তড়িঘড়ি এলেন ডিসি ডিডি সহ বাকিরা। আরে, সত্যিই তো! রং সামান্য আলাদা, আর কাঁচাও। অলোকনাথকে নিয়ে আসা হল বেদির সামনে। মিনিটদুয়েকের ধমকধামক এবং মৃদু চড়চাপড়ের পর ভেঙে পড়লেন দত্তবাড়ির কনিষ্ঠ পুত্র।
—ওখানেই ধাবুদাকে পুঁতে দিয়েছিলাম স্যার।
নিজেদেরই বাড়ির দেওয়ালে দাদাকে খুন করে পুঁতে দিয়ে বাড়ি বিক্রি, ‘পথের কাঁটা’-কে সরিয়ে দেওয়া? বাক্রুদ্ধ অভিজ্ঞ অফিসাররাও, সংবিৎ ফিরতে সময় লাগল কিছু। মিস্ত্রি ডাকা হল, বেদিতে কোদালের প্রথম কোপ পড়ার কিছু পরেই দুর্গন্ধ দখল নিল ঘরের। উদ্ধার হল দেহ, মৃত্যুর দেড় মাস পরে। ঘাড়ে-গলায়-বুকে সামান্য মাংস লেগে রয়েছে, শরীরের অবশিষ্ট প্রায় কঙ্কালে পর্যবসিত। জেরায় প্রকাশ্যে এল, কখন কীভাবে মৃত্যু এসেছিল তেতাল্লিশ বছরের বিশ্বনাথের, সহোদরের চক্রান্তে।
