ঘুমচোখে দরজা খুললেন অলোক, চমকে গেলেন দাদাদের ওই গভীর রাতে দেখে।
—তোমরা?
—অনেকদিন আসা হয়নি, খোঁজখবর নিতে এলাম। উপরে গিয়েছিলাম, ধাবুর ঘর দেখলাম ভিতর থেকে বন্ধ। ধাক্কা দিতে কেউ আওয়াজ দিল ভিতর থেকে, ‘বাদ মে আইয়েগা।’ ধাবু কই?
—ওহো, তোমাদের বলা হয়নি, ধাবুদা তো দিন পনেরো হল বারাসতে ঘরভাড়া নিয়ে চলে গেছে।
—মানে? হঠাৎ বারাসতে কেন?
—বলল, কিছুদিনের মধ্যেই ইউবিআই-এর বারাসত ব্রাঞ্চে বদলি হয়ে যাবে। এখান থেকে যাতায়াতের অসুবিধে হবে। তাই আগে থেকেই ওখানে একটা আস্তানা…
মাঝপথে থামিয়ে দেন অমরনাথ।
—তোর গল্পটা দাঁড়াচ্ছে না। কী হয়েছে বল? আর আমাদের ঘরগুলোও ভিতর থেকে বন্ধ কেন? খোলাই তো থাকে সবসময়। ধাবু কোথায়?
—বললাম তো বারাসত! বিশ্বাস না হয় দেখে এসো। ১১/১ ঝাউতলা লেন, বারাসত চৌরাস্তার কাছে। শুধুশুধু চোটপাট করছ কেন?
—করছি কি আর সাধে! আমাদের ঘর বন্ধ কেন? ধাবুর ঘরেই বা কারা? এসব কী করেছিস তুই? আমরা বারাসত থেকে ঘুরে এসে তোর সঙ্গে বোঝাপড়া করছি।
ততক্ষণে তর্কাতর্কি আর চেঁচামেচিতে বেরিয়ে এসেছেন একতলার ভাড়াটেরা। দু’তলা–তিনতলার ভিতর থেকে বন্ধ ঘরগুলি থেকেও বেরিয়ে এসেছেন এক অবাঙালি পরিবারের সদস্যরা। সমরনাথ পরিচয় জানতে চাইলে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন, ‘মেরা নাম নন্দলাল সিং। অলোকবাবু আর বিশ্বনাথবাবু আপনা আপনা হিস্যা মুঝে বেচ দিয়া থোড়ে দিন পহেলে।’
—তার মানে? ওই ঘরগুলোর মালিক আমরা, কিনে নিয়েছেন মানে?
—আপ অলোকবাবুসে পুছিয়ে না! এগ্রিমেন্ট হ্যায় মেরে পাস। দেখ লিজিয়ে।
বাড়ি বিক্রির দলিল আনতে ঘরে ঢুকলেন নন্দলাল, আর সমরনাথ কলার চেপে ধরলেন ছোটভাইয়ের। অলোকনাথ তখন দৃশ্যতই কোণঠাসা, মুখে টুঁ শব্দটি নেই। মমতাও নিশ্চুপ, নতমস্তক। অমরনাথ নিরস্ত করলেন সমরনাথকে।
—আগে বারাসত যাই চল। ধাবুটার কী হল কে জানে! ফিরে এসে বাকি বোঝাপড়া করছি।
অমরনাথ–সমরনাথ-অভিজিৎ ট্যাক্সি করে রওনা দিলেন বারাসত, ফিরলেন রাত সোয়া চারটে নাগাদ। অলোক যে ঠিকানা বলেছিলেন, সেখানে অন্য পরিবার বাস করে। বিশ্বনাথের খোঁজ পাওয়া যায়নি। আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে, ডাহা মিথ্যে বলেছেন অলোক।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল দুই দাদার। চড়থাপ্পড়ের অকৃপণ বৃষ্টিপাত হল অলোকের উপর, ‘বল কী করেছিস? পিটিয়েই মেরে ফেলব না হলে!’ চেপে ধরলেন একতলার ভাড়াটেরাও।
মিনিটপাঁচেকের বেশি ওই ঝড়ঝাপটা সহ্য করতে পারলেন না অলোক, স্বীকারোক্তি এল।
—ধাবুদাকে মেরে পুঁতে দিয়েছি।
—মানে?
‘মানে’ উদ্ধারে অবিলম্বে বড়তলা থানার নম্বর ডায়াল করলেন অভিজিৎ।
অতিরিক্ত পুলিশবাহিনী পৌঁছনোর পর ভিড় ঠেলে ঢোকা গেল ২সি বিডন স্ট্রিটের অন্দরমহলে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছেন অলোকনাথ দু’তলার বারান্দায়, এক কোণে প্রস্তরবৎ দাঁড়িয়ে মমতা। একতলার ভাড়াটেদের অনেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বারান্দার এদিক-সেদিক। অমরনাথ থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে। সমরনাথ বিধ্বস্ত, চোখের জল মুছছেন। অভিজিৎ সামলাচ্ছেন শোককাতর কাকাকে। ওসিকে দেখে অমরনাথ এগিয়ে এলেন।
—আসুন বড়বাবু, আমার নাম অমরনাথ দত্ত।
—কী হয়েছে? শুনলাম খুন…
কাঁদতে কাঁদতে সমরনাথ ছুটে যান অলোকনাথের দিকে। কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে থাকেন ছোটভাইয়ের।
—স্যার, এ খুন করেছে, এ! ধাবুকে খুন করে পুঁতে দিয়েছে। নিজের দাদাকে খুন করে জাল দলিল বানিয়ে বাড়ি বিক্রি করেছে, কুলাঙ্গার একটা, ফাঁসি দিন স্যার…কিছুতেই বলছে না কোথায় পুঁতে রেখেছে আমাদের ধাবুকে…
অফিসাররা বুঝলেন, এভাবে কাজের কাজ কিছু হবে না। একান্তে জিজ্ঞাসাবাদ দরকার। ক্রোধোন্মত্ত জনতার ভিড় ঠেলে অলোকনাথকে কোনওমতে নিয়ে যাওয়া হল বড়তলা থানায়।
‘ঘটনাটা পুরোটা বলুন। আপনি কলকাতা পুলিশের কর্মী। পুলিশের কায়দাকানুন জানেন। সত্যিটা তাড়াতাড়ি বললে ভাল। যত দেরি করবেন, তত বেশি ক্ষতি, এটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।’
অলোকনাথ বিস্তর মারধর খেয়েছেন দাদাদের হাতে একটু আগেই। ঠোঁট ফুলে গিয়েছে, চুল উস্কোখুস্কো, হাঁফাচ্ছেন। বলতে শুরু করলেন। রহস্য ক্রমে উন্মোচিত হল।
প্রায় পঁচিশ বছর আগে কতই-বা বেতন ছিল একজন কনস্টেবলের? স্ত্রী এবং তিন সন্তানের সংসার সামলে বেহিসাবি বিলাসব্যসন অসম্ভব। ইন্দ্রিয়ের তাড়নাকে সংযত রাখার ক্ষমতা অবশ্য কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল অলোকনাথের অনায়ত্ত ছিল। রেস-জুয়া-মদ-নারীসঙ্গের অভ্যাস ত্যাগ করার অক্ষমতা বাধ্য করেছিল ধারদেনায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়তে। পরিত্রাণের পথ খুঁজছিলেন মরিয়া অলোকনাথ।
পথের দিশা পেলেন একটাই, অনেক ভাবার পর। বাড়ির দু’তলা-তিনতলাটা যদি বেচে দেওয়া যায়, অর্থাগম হবে যথেষ্ট। কিন্তু বড়দা-মেজদা আর দিদি রাজি হবে? সম্ভাবনা শূন্য। ধাবুদা? বলে দেখা যেতে পারে একবার। বললেনও ’৯৩-এর নভেম্বরের শেষদিকে এবং হতাশ হয়ে পড়লেন বিশ্বনাথের প্রতিক্রিয়ায়।
—না না, বাড়ি বেচার প্রশ্ন আসছে কেন হঠাৎ? দিব্যি আছি তো।
বিশ্বনাথ ‘দিব্যি’ থাকতে পারেন, ধারদেনায় বিপর্যস্ত অলোকনাথ মোটেই স্বস্তিতে ছিলেন না। ভ্রাতৃহত্যার ষড়যন্ত্রের বীজ বপনে দেরি করলেন না বিশেষ। আশ্রিত ভায়রাভাই শিবশঙ্করকে শরিক করলেন পরিকল্পনার। চিত্রনাট্য রচনায় থাকল স্ত্রী মমতারও সক্রিয় অংশগ্রহণ। টাকার লোভে চক্রান্তে যুক্ত হলেন শিবশঙ্করের ভগ্নিপতি মৃণাল দত্ত। বাড়ি নিমতায়, পেশায় ব্যাংককর্মী। নিয়মিত যাতায়াত ছিল বিডন স্ট্রিটের বড়িতে।
