‘নোটিস
কলিকাতা মিউনিসিপ্যালের অন্তর্ভুক্ত/ ২/সি, বিডন স্ট্রীট, কলিকাতা-৬, বড়তলা থানার অধীন বাড়ী বিক্রয় হইবে। উক্ত ঠিকানার বাড়ীর দুই অংশিদার ছাড়া, যদি কোন অংশিদার বা দাবিদার থাকেন, তাহা হইলে উক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ৭ দিনের মধ্যে এসে নিম্ন লিখিত ঠিকানায় যোগাযোগ করুন। বিকাশ পাল এডভোকেট স্মল কজেজ কোর্ট। ২/১, কিরণ শংকর রায় রোড, কলিকাতা-১’
একবার নয়, দু’বার পড়লেন অভিজিৎ। কাগজ হাতে নিয়েই সোজা পাশের ঘরে, ‘বাবা! এটা দেখেছ?’
সকাল সোয়া ন’টা তখন। প্রাতরাশ সেরে অফিসযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন অমরনাথ। ছেলেকে বিচলিত দেখে একটু অবাকই হলেন। অভিজিৎ আশৈশব শান্ত প্রকৃতির, অকারণ উত্তেজনার প্রকাশ তার স্বভাববিরুদ্ধ। কাগজটা টেনে নিলেন ছেলের হাত থেকে।
‘কী হল? কী বেরিয়েছেটা কী? দেখি…’
অমরনাথ দেখলেন, এবং অফিসে হাজিরার ব্যস্ততা সাময়িক অগ্রাধিকার হারাল। বসার ঘরের ল্যান্ডলাইন থেকে তৎক্ষণাৎ ফোন করলেন কলকাতার নম্বরে।
—সমর, আজকের আনন্দবাজার দেখেছিস? আটের পাতা, বিজ্ঞাপনের কলাম… জমিবাড়ি…
বিডন স্ট্রিটের তিনতলা বাড়িটি সাতের দশকের শেষাশেষি তৈরি করেছিলেন জগন্নাথ দত্ত। তিনি গত হলেন ’৯০-এর শুরুতে। স্ত্রী-ও প্রয়াত হলেন বছরতিনেকের মধ্যেই। উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়ির মালিকানা পেলেন চার পুত্র, এক কন্যা।
বাড়ি বিক্রির নোটিস
বড় অমরনাথ ব্যাংকের আধিকারিক। সপরিবারে বাস চন্দননগরে। স্ত্রী সংসারধর্মে ব্রতী, পুত্র অভিজিৎ পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরিপ্রত্যাশী। মেজো সমরনাথ পৈতৃক বাড়িতে থাকেন না, তবে কলকাতারই বাসিন্দা, চাকুরিজীবী। পরের ভাই বিশ্বনাথ, অকৃতদার। ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার ধর্মতলা শাখার কর্মী। নির্বিরোধী মানুষ, নেশা বলতে দুটি, গান আর বিভিন্ন দেশের পুরনো মুদ্রা সংগ্রহ। রেকর্ড-ক্যাসেট কিনতেই ব্যয় হয়ে যায় বেতনের অর্ধাংশেরও বেশি। তিনতলায় দুটি ঘর নিয়ে অন্তর্মুখী জীবনযাপন।
পরের সন্তান অনুরাধা, বিবাহিতা। শ্বশুরবাড়ি কলকাতারই ফকির চক্রবর্তী লেনে।
সর্বকনিষ্ঠ অলোকনাথ কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল। স্ত্রী মমতা, এক শিশুপুত্র এবং দুই নাবালিকা কন্যাসহ থাকেন দোতলার দুটি ঘরে একটি আচ্ছাদিত বারান্দাসহ। অলোকনাথের ভায়রাভাই শিবশঙ্কর, ডাকনাম বাবু। কর্মহীন। ওই বারান্দাতেই তার নিশিযাপন।
একতলার ঘরগুলিতে ভাড়াটেরা থাকেন। মাসান্তে ভাড়ার সমবণ্টন হয় ভাইবোনদের মধ্যে। অমরনাথ-সমরনাথ-অনুরাধার ভাগের কয়েকটি ঘর খালিই পড়ে থাকে দু’তলা–তিনতলায়।
আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপন নজরে আসার পর কালক্ষেপের প্রশ্ন ছিল না। অমরনাথ যোগাযোগ করলেন সমরনাথ ও অনুরাধার সঙ্গে। বিডন স্ট্রিটের বাড়ির মালিকানার অংশীদার তাঁরাও এবং তাঁদের অনুমতি ব্যতিরেকে বাড়ি বিক্রি আইনসিদ্ধ নয়, উকিলকে জানিয়ে দিলেন যৌথ চিঠিতে। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে।
প্রশ্ন ওঠা সংগত, বিশ্বনাথ এবং অলোকনাথকে কিছু জানালেন না কেন, কেন কিছু জানতে চাইলেন না? উত্তরে ভাইবোনদের সম্পর্কের সমীকরণ বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত জরুরি।
বিশ্বনাথ, পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন, নিজের জগতে থাকতে ভালবাসতেন। নিস্তরঙ্গ দিনাতিপাত, সামাজিক মেলামেশায় তীব্র বীতস্পৃহা। বৈষয়িক আলোচনায় বরাবরের অনাগ্রহী। অলোকনাথের মানসিক অবস্থান অবশ্য আমূল বিপ্রতীপে। ভোগবিলাসে আকর্ষণ মজ্জাগত, অনায়াস বিচরণ রেসের মাঠে, দিনান্তে মেজাজি মদ্যপান, নিষিদ্ধপল্লিতে পরিচিত মুখ নিয়মিত যাতায়াতের সৌজন্যে।
বিশ্বনাথ ভাইয়ের জীবনযাত্রায় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকতেন। কিন্তু সমরনাথ-অমরনাথ-অনুরাধার সঙ্গে অত্যন্ত তিক্ত সম্পর্ক ছিল অলোকনাথের। ছোটভাইয়ের উচ্ছৃঙ্খল স্বভাবের তীব্র বিরোধী ছিলেন ওঁরা। পারস্পরিক বাক্যালাপ বন্ধই ছিল একরকম, বাবা-মা গত হওয়ার পর বিডন স্ট্রিটের পৈতৃক বাড়িতেও আর পা-ই রাখেননি অন্যত্র বসবাসকারী ভাইবোনরা।
বিজ্ঞাপন দেখে ওঁরা ভাবলেন, আপনভোলা বিশ্বনাথকে ভুল বুঝিয়ে নিশ্চয়ই বাড়ি বিক্রির মতলব ফেঁদেছেন অলোকনাথ। উকিলকে তথ্যপ্রমাণসহ প্রতিবাদপত্র পাঠিয়ে আশ্বস্ত হলেন তিন ভাইবোন। যাক, বাড়ি বিক্রির সম্ভাব্য চক্রান্ত সমূলে বিনষ্ট করা গেল।
সমরনাথের কলকাতার বাইরে কাজ ছিল অফিসের, ফেরার কথা ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে। অমরনাথ ঠিক করলেন, সমরনাথ ফিরলে মার্চের প্রথম সপ্তাহে দু’জনে মিলে বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে যাবেন। একটা হেস্তনেস্ত অলোকের সঙ্গে এবার না করলেই নয়। কী ভেবেছেটা কী? ‘ধাবু’কেও (বিশ্বনাথের ডাকনাম) বোঝানো দরকার। কাউকে কিছু না জানিয়ে রাজি হয়ে গেল অলোকের কথায়? টাকাপয়সার লোভ তো ধাবুর কোনওকালেই ছিল না, তা হলে?
‘তা হলে’-র উত্তর মিলল ৬ মার্চের ভোরে। আগের রাতেই অমরনাথ পুত্র অভিজিৎকে নিয়ে চন্দননগর থেকে পৌঁছলেন কলকাতায়। উঠলেন সমরনাথের বাড়িতে। ঠিক হল, তিনজনে রাত দুটো-আড়াইটে নাগাদ যাবেন বিডন স্ট্রিটে। অলোকের মর্নিং ডিউটি থাকলে ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে যাবে। দেখাই হবে না সকালে গেলে। আর দেখা হলেও ডিউটির অজুহাতে আলোচনাটা হতে দেবে না। বেরিয়ে গিয়ে আর ফিরবেই না হয়তো দু’-তিনদিন। ধরতে হবে ঘুমনোর সময়।
