কিন্তু ওই যে লিখলাম, মালাটি গাঁথা হয়েছিল নিপুণ। ১৯৯৯ সালে আলিপুরের জেলা ও দায়রা আদালত বিমলা খেতওয়াত, খোকন গিরি, কামিনীকুমার রায় এবং জগদীশ যাদবকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করল। রাজসাক্ষী রাজু আগাগোড়া সহযোগিতা করেছিল। মুক্তি দেওয়া হয় ‘প্রসিকিউশন’-এর আবেদনের ভিত্তিতে।
মামলা গড়ায় হাইকোর্টে। যেখানে রাষ্ট্রের আর-এক প্রস্থ লড়াই এক ডজন নামজাদা আইনজীবীর সঙ্গে। হাইকোর্টও নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখল বিস্তর সওয়াল-জবাবের পর। সেটা ২০০৬ সাল।
পরের ধাপ সুপ্রিম কোর্ট। ততদিনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বিমলা খেতওয়াত। দেহের একটি দিক প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত, আরও নানা ব্যাধি বাসা বেঁধেছে শরীরে। স্বাস্থ্যজনিত কারণে বিমলাকে জামিন দেয় সর্বোচ্চ আদালত। একটু সুস্থ হলেই আত্মসমর্পণ করতে হবে ফের, এই শর্তে। বিমলা ফেরেন শরৎ বোস রোডের ফ্ল্যাটে।
সুপ্রিম কোর্টও শেষমেশ হাইকোর্টের রায়ের সঙ্গেই সহমত হয়। তার আগেই অবশ্য জাগতিক আদালতের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিলেন বিমলা। ২০০৮-এর জুনের এক দুপুরে দশতলার বারান্দা থেকে ঝাঁপ দেন নীচে। মৃত্যু ঘটে মাটি ছোঁয়া মাত্রই। দেহের পাশে ওঁর ক্রাচটি পড়ে ছিল, যেটি সঙ্গে নিয়েই মরণঝাঁপ দিয়েছিলেন।
কেন আত্মহনন? ফের কারাবাসের আতঙ্ক? সামাজিক অসম্মানের গ্লানি, নাকি বিবেকদংশন? নাকি ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’, মুক্তি এভাবেই আসে ‘করুণাধারায়’?
১.০৭ মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে
[বিশ্বনাথ দত্ত হত্যামামলা
তদন্তকারী অফিসার অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়]
ভ্রু তুলিয়া একটু বিস্মিতভাবে ব্যোমকেশ বলিল –“বিজ্ঞাপন পড় না? তবে পড় কি?”
“খবরের কাগজে সবাই যা পড়ে, তাই পড়ি—খবর।”
“অর্থাৎ মাঞ্চুরিয়ায় কার আঙুল কেটে গিয়ে রক্তপাত হয়েছে আর ব্রেজিলে কার একসঙ্গে তিনটে ছেলে হয়েছে, এই পড়। ওসব পড়ে লাভ কী? সত্যিকারের খাঁটি খবর যদি পেতে চাও, তাহলে বিজ্ঞাপন পড়।”
আমি খোঁচা দিবার লোভ সামলাইতে পারিলাম না, বলিলাম— “ও, তাই না কি? কিন্তু খবরের কাগজওয়ালারা তাহলে ভারি শয়তান, সমস্ত কাগজখানা বিজ্ঞাপনে ভরে না দিয়ে কতক গুলো বাজে খবর ছাপিয়ে পাতা নষ্ট করে।”
ব্যোমকেশের দৃষ্টি প্রখর হইয়া উঠিল। সে বলিল— “তাদের দোষ নেই। তোমার মত লোকের চিত্তবিনোদন না করতে পারলে বেচারাদের কাগজ বিক্রি হয় না, তাই বাধ্য হয়ে ঐ সব খবর সৃষ্টি করতে হয়। আসল কাজের খবর থাকে কিন্তু বিজ্ঞাপনে। দেশের কোথায় কি হচ্ছে, কে কি ফিকির বার করে দিন-দুপুরে ডাকাতি করছে, কে চোরাই মাল পাচার করবার নতুন ফন্দি আঁটছে— এই সব দরকারী খবর যদি পেতে চাও তো বিজ্ঞাপন পড়তে হবে। রয়টারের টেলিগ্রামে ওসব পাওয়া যায় না।”
বড়তলা থানায় ফোনটা বেজেছিল কাকভোরে, পৌনে পাঁচটা নাগাদ।
—এখানে গণ্ডগোল হচ্ছে স্যার, প্রচুর লোক জমে গেছে। তাড়াতাড়ি আসুন।
—এখানে মানে?
—২সি, বিডন স্ট্রিট। খুন করে ফেলেছে স্যার।
—খুন?
ডিউটি অফিসার ফোন নামিয়ে রাখেন। সবে মিনিট পনেরো হল সকালের শিফটে বসেছেন। প্রথম ফোনটাতেই খুনের খবর? সাধে কি বলে, ‘মর্নিং শোজ় দ্য ডে!’ সকালই বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাকি দিনটা কেমন যাবে?
বড়তলা থানা থেকে কতই বা দূরত্ব ঘটনাস্থলের? এক কিলোমিটার বড়জোর। পুলিশের জিপ যখন থামল ২সি বিডন স্ট্রিটের সামনে, অত ভোরেও অন্তত শ’তিনেক লোক। চিৎকার-চেঁচামেচিতে বোঝা দায়, ঠিক কী ঘটেছে। পুলিশের আবির্ভাবে সমবেত কোলাহল নিমেষে আরও উচ্চকিত, জানোয়ারটাকে আমরাই ফাঁসি দেব স্যার, আপনারা ফিরে যান!
২সি, বিডন স্ট্রিট
অপরাধের সুলুকসন্ধান পরে। পরিস্থিতি যা, এ তো আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হতে যাচ্ছে। এমনিতেই জনবসতিপূর্ণ এলাকা, কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমাট বাঁধছে দ্রুত। অফিসার ওয়ারলেস সেট হাতে নিলেন, বার্তা পাঠালেন থানায়। থানা থেকে যা অবিলম্বে পৌঁছল লালবাজার কন্ট্রোলে, “Commotion at Beadon Street over suspected murder. Reinforcement required as early as possible. Please inform superiors.”
থানা জানাল ওসিকে, লালবাজার জানাল ডিসি নর্থ আর ডিসি ডিডিকে। ওসি সাততাড়াতাড়ি ছুটলেন, হোমিসাইড শাখার অফিসাররাও। পার্শ্ববর্তী থানাগুলি থেকে বাড়তি ফোর্স রওনা দিল বিডন স্ট্রিটের উদ্দেশে। কন্ট্রোল রুম ঘটনাস্থলে অফিসারদের জানিয়ে দিল, “DC North and DC DD on way. Situation report every five minutes please.”
বিশ্বনাথ দত্ত হত্যা মামলা। বড়তলা থানা, কেস নম্বর ৬২/৯৪। তারিখ ৬/৩/৯৪, ভারতীয়
দণ্ডবিধির ১২০ বি/৩০২/২০১ ধারায়। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, খুন এবং প্রমাণ লোপাট।
সূচনায় শরদিন্দুর ‘পথের কাঁটা’-র প্রারম্ভিক অংশের একটি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করেছি।
উপায়ান্তর ছিল না। আলোচ্য মামলার ঘটনাপ্রবাহে নির্ণায়ক ভূমিকা ছিল সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের, যেখানে ব্যোমকেশের ভাষায়, “আসল কাজের খবর” ছিল।
৩১ জানুয়ারি, ১৯৯৪, সোমবার। চন্দননগরের বাড়িতে বসে আনন্দবাজার পত্রিকার সারিবদ্ধ বিজ্ঞাপনের পাতায় চোখ বুলোচ্ছিলেন অভিজিৎ। চাকরির সন্ধানে আছেন, কর্মখালির বিজ্ঞাপন খুঁটিয়ে পড়েন। লিখে রাখেন, কোথায় কোথায় আবেদনপত্র পাঠাবেন। দেখতে দেখতেই নজর পড়ল জমি/বাড়ি বিক্রয়-এর কলামে। এটা কী?
