বিমলা খেতওয়াত ঠিক সাড়ে ন’টা নাগাদ বেল বাজালেন নওলাখাদের ফ্ল্যাটে। দরজা খুললেন বীণা নওলাখা। বিমলা বললেন, তাঁর স্বামী বোধহয় সকালে পানপরাগের কৌটোটা ফেলে গিয়েছেন, বাড়িতে খুঁজে পাচ্ছেন না,একটু যদি দেখা যায়। বীণা দেখেশুনে জানালেন, ‘না, এখানে তো নেই।’ ততক্ষণে বিমলার যা দেখার ছিল, দেখা হয়ে গিয়েছে। নিশ্চিত হয়ে গিয়েছেন, বাড়ির গৃহকর্মীরা কেউ নেই। প্রতিমা-মনিকা-শম্ভু কাজ শেষ করে বেরিয়ে গিয়েছে।
খোকন অপেক্ষা করছিল বিমলার নির্দেশমতো, নীচে ইন্টারকমের কাছে। ঠিক দশটায় বিমলার ফোন আসার কথা। যথাসময়ে ফোন এল। বিমলা জানালেন, লাইন ক্লিয়ার, এটাই মোক্ষম সময়। যুগলকিশোর ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছেন। পুত্র অনিল বেরিয়েছে পার্টিতে, রাত হবে ফিরতে।
খোকন সিঁড়ি দিয়ে সাততলায় উঠল, ডেকে নিল রাজু-জগদীশ-কামিনীকে। একটি বড় ব্যাগে সঙ্গে ছিল লোহার ব্লেড, শাবল ইত্যাদি। দশটা পাঁচে বেল বাজল নওলাখাদের ১০সি-র ফ্ল্যাটে। গিরিশ নওলাখা আইহোল দিয়ে দেখলেন খোকনকে, বহুদিনের পরিচিত মুখ। খুলে দিলেন দরজা, ঝাঁপিয়ে পড়ল খোকন আর দলবল। প্রতিরোধ ব্যর্থ হল গিরিশের। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ছিলেন, শাল ছিল গায়ে। ওই শালই গলায় পেঁচিয়ে খুন করল খোকন।
বেডরুমে ছিলেন বীণা, বেরিয়ে এসে চেষ্টা করলেন টেলিফোনের কাছে যাওয়ার। বৃথা চেষ্টা। ফোনের তার ততক্ষণে কেটে দিয়েছে দুষ্কৃতীরা। বীণাকে যথেষ্ট শারীরিক হেনস্থা করা হল, বেডরুমে পড়ে থাকা একটি শাড়ির প্রান্ত দিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা হল, অন্য প্রান্ত সিলিংফ্যানে বেঁধে। চেষ্টা বিফল হওয়ায় বালিশ মুখে চেপে কেড়ে নেওয়া হল প্রাণবায়ু। এরপর গেস্ট রুমের আলমারি ভেঙে যথেচ্ছ লুঠপাট এবং সরে পড়া, দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে।
খোকন-রাজু-জগদীশ ফিরে গেল নিজেদের কোয়ার্টারে, স্নান করে শুয়ে পড়ল দিব্যি। কামিনীই একমাত্র বহিরাগত, ভোর হওয়ার আগে ব্যাগভরতি লুঠের সামগ্রী সমেত পালাল পাঁচিল টপকে, ঝিমোতে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের এড়িয়ে। ঠিক ছিল, লুঠের মাল পরে ভাগ হবে।
খোকনের জবানবন্দির ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হল বিমলা খেতওয়াতকে। বিমলা অপরাধ স্বীকার করলেন। কয়েকদিনের মধ্যে পুলিশের জালে ধরা পড়ল রাজু আর কামিনী। জগদীশ পালিয়েছিল বিহারের প্রত্যন্ত জেলার বাড়িতে, ধরে আনলেন গোয়েন্দারা। লুঠ করা জিনিস খুনের পরের রাতেই ভাগ করে নিয়েছিল চারমূর্তি। উদ্ধার হল প্রচুর গয়নাগাটি, ঘড়ি, ঘর সাজানোর বহু দামি সামগ্রী। যা শনাক্ত করলেন প্রয়াত নওলাখা-দম্পতির পুত্র ও পুত্রবধূ।
১৯এ, শরৎ বোস রোডের বহুতল বাড়িটির প্রবেশপথ
আশ্চর্যের, ঘটনার পরের দু’দিনও খোকন-রাজু-জগদীশ ওই অ্যাপার্টমেন্টে কাজ করে গিয়েছে নির্বিকার। বিন্দুমাত্র স্নায়ুর চাপ ছাড়াই। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের উত্তর দিয়েছে, চা এনে দিয়েছে তদন্তকারী দলের জন্য। একেই কি বলে ‘ক্রিমিনাল মাইন্ড’?
সুজিত মিত্র, লিখেছি আগেই, তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। পদোন্নতির পর দীর্ঘদিন ওসি হোমিসাইড পদে চাকরি করেছেন সুনামের সঙ্গে। বছরদুয়েক আগে অবসর নিয়েছেন ডিসি স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চ হিসেবে। যত্নশীল এবং লড়াকু তদন্ত করেছিলেন।
যত্নের অংশবিশেষ প্রথমে বলে নিই। গড়ফা মেইন রোডের কমল স্টুডিয়ো থেকে খোকন ও রাজু কিনেছিল দুটি ইয়াশিকা ক্যামেরা। সেই স্টুডিয়ো থেকে বাজেয়াপ্ত করা হল সংশ্লিষ্ট ক্যাশমেমো দুটি। কামিনী অগ্রিম থেকে পাওয়া ভাগের টাকায় একটি বড় সুটকেস কিনেছিল ভবানীপুরের দোকান থেকে। সেই ক্যাশমেমোও বাজেয়াপ্ত হল। কামিনী গ্রেফতার হওয়ার পর দেখা গিয়েছিল, ডান পায়ের পাতায় ক্ষতচিহ্ন। পাঁচিল টপকে পালানোর সময় লোহার শলাকায় আঘাত লেগেছিল। পাঁচিলে দাগ ছিল রক্তের। সেই রক্ত যে কামিনীরই, প্রমাণ করতে হল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়। ঘটনাস্থলের নানা জায়গা থেকে নেওয়া হাত-পায়ের ছাপ পাঠানো হল ফরেনসিক পরীক্ষায়, মিলে গেল চার আততায়ীর সঙ্গে। আদালতে গোপন জবানবন্দিতে দোষ কবুলও করল খোকন এবং রাজু।
পড়তে যতটা সহজ মনে হল, আদতে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংহত করার কাজটি তার চেয়ে ঢের বেশি কঠিন ছিল। গ্রেফতার-পরবর্তী তদন্ত আসলে মালা গাঁথার মতোই। ঠান্ডা মাথায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি একটি করে প্রমাণ ঘটনা-পরম্পরা অনুযায়ী সাজিয়ে তবেই তৈরি হয় এধরনের জটিল মামলার চার্জশিট। মালাটি নিখুঁত গাঁথতে পারলে জাল কেটে বেরনোর রাস্তা থাকে না অভিযুক্তের, আইনের কাছে নতজানু হতে হয় নিরুপায়ভাবে।
তদন্তের প্রেক্ষিতে ‘লড়াকু’ শব্দটি লিখেছি আগের এক অনুচ্ছেদে, সচেতনভাবেই। তিন মাসের মধ্যেই পেশ হল চার্জশিট, শুরু হল বিচারপর্বের লড়াই। অন্যতম অভিযুক্ত রাজু নিজেই ইচ্ছে প্রকাশ করল রাজসাক্ষী হওয়ার। কাজ কিছুটা সহজ হল পুলিশের।
খেতওয়াত পরিবার অত্যন্ত বিত্তশালী ছিলেন। বিমলার জামিনের জন্য রাজ্যের এবং ভিনরাজ্যের প্রথিতযশা আইনজীবীদের লাগানো হয়েছিল। কলকাতা পুলিশের পক্ষে ছিলেন অভিজ্ঞ পাবলিক প্রসিকিউটর শিশির ঘোষ। অন্যদিকে আইনি দুনিয়ার তারকাদের ছড়াছড়ি। বিচার চলাকালীন তীব্র চাপান-উতোরের সাক্ষী থাকল আদালত।
