—বেশ, পুরোটা বল এবার, কীভাবে করলি, কেন করলি?
উত্তরে খোকনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া মুহূর্তের জন্য বাক্রুদ্ধ করে দিল দুঁদে গোয়েন্দাদেরও,
—লোভে পড়ে করেছি, খুন করার জন্য ম্যাডাম এক লাখ টাকা দেবেন বলেছিলেন।
—ম্যাডাম!! কোন ম্যাডাম?
—বিমলা ম্যাডাম, খেতওয়াত সাহেবের স্ত্রী।
বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে জেরা শুরু হল খোকনকে। জানা গেল, যা ঘটেছিল, যেভাবে ঘটেছিল, যে কারণে ঘটেছিল।
খেতওয়াত পরিবার ও নওলাখা পরিবারের সামাজিক পরিচয় আটের দশকের শুরু থেকেই। নওলাখারা তখন থাকতেন বালিগঞ্জের মুলেন স্ট্রিটে। একসঙ্গে বাইরে খাওয়াদাওয়া, উৎসব-উদ্যাপন, ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল ক্রমশ। বিমলা খেতওয়াত এসব পছন্দ করতেন না। অন্তর্মুখী স্বভাবের মহিলা ছিলেন, একটু রক্ষণশীল মানসিকতারও। পুজো-আর্চা ঘর-সংসারেই বেশি স্বচ্ছন্দ। নওলাখা-দম্পতি আবার জীবনকে পূর্ণ মাত্রায় উপভোগে বিশ্বাসী, ক্লাব-পার্টিতে যাতায়াত নিয়মিত। যুগলকিশোর খেতওয়াতও তা-ই, হইহুল্লোড় তাঁরও মনপসন্দ।
নিয়মিত সামাজিক মেলামেশা চলতে চলতেই যুগলকিশোর আকৃষ্ট হলেন বীণা নওলাখার প্রতি। একতরফা ছিল না আকর্ষণ, বিবাহ-বহিৰ্ভূত প্রণয়ে সম্মতি ছিল বীণারও। দু’জনেই তখন মধ্যচল্লিশ। বালিগঞ্জের বাড়ি বেচে ১৯৮৬-তে রামেশ্বর অ্যাপার্টমেন্টে উঠে এলেন নওলাখারা। প্রণয়িনীকে প্রতিবেশিনী হিসেবে পাওয়ার তাগিদে জলের দরে দশতলার ফ্ল্যাটটি বেচলেন যুগলকিশোর। গিরিশ-বীণা দু’জনেই বেসরকারি সংস্থার উচ্চপদস্থ চাকুরে ছিলেন। স্বচ্ছলতা ছিল, কিন্তু ওই বহুতলে ফ্ল্যাট কেনাটা ছিল সামর্থ্যের বাইরে। গিরিশ নির্বোধ ছিলেন না, কেন সস্তায় ফ্ল্যাট দিচ্ছেন খেতওয়াত সাহেব, বিলক্ষণ বুঝেছিলেন। সম্ভবত পারিবারিক শান্তির কারণেই সব জেনেও মেনে নিয়েছিলেন, মানিয়েও নিয়েছিলেন।
মেনে নিতে পারেননি বিমলা খেতওয়াত, মানিয়ে নিতেও না। পরকীয়া থেকে স্বামীকে দূরে সরিয়ে আনতে চেষ্টার কসুর করেননি। ঝগড়া করেছেন স্বামীর সঙ্গে, প্রবল অশান্তি হয়েছে দিনের পর দিন, ঘরে ওঝা ডাকিয়ে তন্ত্রমন্ত্রেরও শরণ নিয়েছেন মরিয়া হয়ে। লাভ হয়নি কোনও। যুগলকিশোরের ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ বেড়েছে মিসেস নওলাখার সঙ্গে। রোজ সকালে নওলাখাদের বাড়িতে চা-বিস্কুট, সন্ধেবেলা তাস-আড্ডা-মদ্যপান, চোখের সামনে দেখতে দেখতে একটা সময় প্রায় অসুস্থই হয়ে পড়েন বিমলা। খেতওয়াতদের একমাত্র পুত্র অনিল চাকুরিজীবী, নিজেকে নিয়ে থাকতেন। মা-বাবার দাম্পত্য অশান্তির ব্যাপারে ছিলেন চূড়ান্ত উদাসীন।
‘নারীচরিত্র দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যা।’ মানসিক অশান্তিতে নিত্যদিন ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা বিমলা ঠিক করলেন, পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেবেন নওলাখা-দম্পতিকে। বীণার প্রতি আক্রোশ সহজবোধ্য। গিরিশের উপর তীব্র রাগ পরকীয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি একা অশক্ত মহিলা, কাজটা করবে কে?
বিমলা ডেকে পাঠালেন খোকনকে। খেতওয়াতদের কোম্পানির দীর্ঘদিনের পিয়ন খোকন গিরি। একতলার অফিসে থাকে। প্রায় রোজই আসে ফ্ল্যাটে, খোকনের হাত দিয়ে খামভরতি টাকা বীণার কাছে মাঝেমাঝেই পাঠান যুগলকিশোর। বিমলা প্রস্তাব দিলেন, গিরিশ-বীণাকে খুনের বিনিময়ে এক লক্ষ টাকা দেবেন, চল্লিশ হাজার অগ্রিম। প্রথমে গররাজি ছিল খোকন, সে তো আর পেশাদার খুনি নয় যে ‘সুপারি’ নিয়ে মানুষ মারবে। বিমলা টাকার লোভ দেখাতেই থাকলেন, হাতে ধরিয়ে দিলেন নগদ চল্লিশ হাজার। মাথা ঘুরে গেল খোকনের। সে-সময়ে এক লাখ মানে অনেক টাকা। পিয়নের চাকরি ছেড়ে নিজের ছোটখাটো ব্যবসা চালু করার পক্ষে যথেষ্টেরও বেশি।
খোকন রাজি হয়ে গেল। একা মুশকিল হবে, শুরু করল সঙ্গীসাথি জোটানোর কাজ। কাঁচা টাকার লোভ বড় সাংঘাতিক, জুটেও গেল তিন শাগরেদ। রঞ্জিত রাও ওরফে রাজু, একসময় খেতওয়াতদের গাড়ি চালাত। চাকরি ছেড়ে দিয়ে কিছুদিন অন্য বেসরকারি সংস্থার গাড়ি চালিয়েছিল। তারপর আবার ফিরে এসে রামেশ্বর অ্যাপার্টমেন্টের-ই ৭ডি-র বাসিন্দা ওমপ্রকাশ ভুয়ানিয়ার ড্রাইভারের চাকরি নিয়েছিল। খোকন-রাজুর সঙ্গে যোগ দিল জগদীশ যাদব, মিস্টার খেতওয়াতের অফিসের সাফাইকর্মী। জগদীশই জোটাল কুকর্মের চতুর্থ শরিককে। কামিনীকুমার রায়, দক্ষিণ কলকাতার একটি গ্যারেজের কর্মী। চুক্তি হল, কাজ শেষ হলে প্রত্যেকে পাবে পঁচিশ হাজার করে। অগ্রিমের টাকা থেকে দশ হাজার করে ভাগ হল। দুটো দামি ইয়াশিকা ক্যামেরা কিনে ফেলল খোকন আর রাজু। কামিনী কিনল দামি সুটকেস।
খুনের ঘটনাপ্রবাহ ছিল এরকম। মনে রাখুন, ক্রিস্টমাস ইভের রাত। গমগম করছে বহুতল-প্রাঙ্গণ। গাড়ির স্রোত সন্ধে থেকেই, ঢুকছে-বেরচ্ছে। কেউ পার্টিতে যাচ্ছেন, কারও আবার বাড়িতেই উৎসবের আয়োজন। অতিথিদের অবিরাম আনাগোনা। কর্মীরাও উঠছেন-নামছেন সর্বক্ষণ। দিনটা ভেবেচিন্তেই বেছে ছিল খোকনরা। নওলাখাদের পুত্র-পুত্রবধূ যে ২৪ নয়, ২৬ তারিখে ফিরবেন, সে-খবর বিমলা আগাম জানিয়ে দিয়েছিলেন খোকনকে।
খোকন, রাজু এবং জগদীশ নিরাপত্তারক্ষীদের বহুদিনের পূর্বপরিচিত কর্মী। অপরিচিত বলতে কামিনী। যাকে সঙ্গে নিয়ে রাজু ন’টা নাগাদ উঠে গেল নিজের সাততলার কোয়ার্টারে, যা বরাদ্দ গৃহকর্মীদের জন্য। নিয়ম অনুযায়ী, রিসেপশনের রক্ষীরা আটকাল না। জগদীশ গেল একটু পরে, যোগ দিল রাজু আর কামিনীর সঙ্গে।
