প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেল ঘটনার, অন্ধকারে ঢিল ছোড়াতেই তখনও আটকে আছে তদন্ত। পুলিশি ব্যর্থতা নিয়ে মিডিয়ায় চলতে থাকল কাটাছেঁড়া, যেমনটা হয়ে থাকে। পুলিশ পি সি সরকার নয়, জাদুদণ্ড নেই কোনও রাতারাতি কিনারার, সেটা ভুলে গিয়েই।
বর্তমান সময়ে তদন্তের একটা সুবিধে আছে। প্রযুক্তির সুবিধে, ‘electronic surveillance’ -এর সুবিধে। মোবাইল ফোনের সূত্রে অনেক অপরাধের কিনারা হয়, সকলেই জানেন। দুর্ভাগ্য, ঘটনা ১৯৯১-এর, এদেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুরু যার চার বছর পর।
‘যেটা ছিল না ছিল না, সেটা না পাওয়াই থাক’ ধরে নিয়েই সে-সময়ে এগোতে হত গোয়েন্দাদের। কত যে অপরাধের কিনারা হয়েছে স্রেফ নিবিড় ‘সোর্সওয়ার্ক’ দিয়ে আট আর নয়ের দশকে, তালিকা শেষ করা যাবে না লিখে।
সোর্স বড় বিষম বস্তু পুলিশি দুনিয়ায়। ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারলে নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে সিদ্ধিলাভ অবধারিত, না পারলে লবডঙ্কা। অপরাধ জগতের খবর কোনও সাধু-সন্ন্যাসী দেবেন না, দেবে অপরাধীরাই, যাদের নিত্য বিচরণ অন্ধকার জগতের অভ্যন্তরে। লালমোহনবাবুকে মনে পড়ছে লিখতে গিয়ে। প্রদোষচন্দ্র মিত্রের উদ্দেশে বলেছিলেন, “আপনাকে তো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে মশাই।” সোর্স অবশ্য শুধু ‘কাল্টিভেট’ করলেই হয় না, ‘নার্চার’-ও করতে হয়। সোর্স লালন করাটাও এক বিশেষ শৈলী, সবাই পারেন না। যাঁরা পারেন, রহস্যভেদে তাঁরা এগিয়ে থাকেন। কিছু সতর্কতাও নিতে হয় সোর্স ব্যবহারে। সোর্সের মধ্যেই ভূত যাতে তৈরি না হয়ে যায়, সেটা খেয়াল রাখতে হয়। সোর্স আদৌ খাটাখাটনি করছে কি না, অফিসারের মন রাখতে গাঁজাখুরি গল্প শোনাচ্ছে কি না, নজরে রাখতে হয় তা-ও। কখনও কখনও সোর্সের পিছনে লাগানো হয় দ্বিতীয় সোর্স!
সত্যিটা স্বীকার করা যাক, গল্পের ফেলুদা-ব্যোমকেশ-এরকুল পোয়ারো-শার্লক হোমসের রহস্যভেদের রোমাঞ্চ-রোম্যান্স বাস্তবের তদন্তে থাকে কদাচিৎ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনাস্থলে আধপোড়া সিগারেটের টুকরো থাকে না, থাকে না বাগানের ঝোপঝাড়ের কাদায় পায়ের ছাপ, থাকে না হুমকি-চিরকুট বা সমগোত্রীয় কিছু। সূত্র কিছুতেই না মিললে ভরসা করতে হয় সোর্সের উপর। কল্পনার গোয়েন্দা গল্প খুবই উপভোগ্য, গোগ্রাসে গেলার মতো। বাস্তবের তদন্ত কিন্তু ভিন্ন, অন্তত নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে। প্রতি পদে উত্তেজনার আঁচ পোহানো নেই, নির্মোহ পরিশ্রম আছে। রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চ নেই, আপ্রাণ অধ্যবসায় আছে। আপন মনের মাধুরী নেই, মরিয়া একাগ্রতা আছে। নির্মাণের জগৎ মূলত, সৃষ্টির নয় ততটা।
তদন্তে ফিরি। সোর্স লাগানো হল একাধিক, প্রত্যেকে পোড়খাওয়া। বলে দেওয়া হল দুটো কথা। এক, জোড়া খুন নিয়ে অপরাধ-জগতে কিছু কানাকানি হচ্ছে কি না, খবর চাই। দুই, খোঁজখবর দরকার। অন্ধকার দুনিয়ার হোক বা না-হোক, আশেপাশের মহল্লায় কেউ কি হঠাৎ বেশি টাকা খরচ করছে? জীবনযাত্রায় চোখে পড়ার মতো বদল এসেছে কারও? মোদ্দা কথা, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। পাইলে পাইতে পারো অমূল্য রতন’। এবং দ্রুত পাওয়াও গেল বহুপ্রতীক্ষিত সূত্র। সৌজন্য, তদন্তকারী অফিসারের দুর্ধর্ষ সোর্স নেটওয়ার্ক। খবর এল ২৭ তারিখ গভীর রাত্রে।
পদ্মপুকুরের কাছাকাছি এক ঠেকে মদ-জুয়ার আসর চলছে। যেখানে জাঁকিয়ে বসেছে ‘সোর্স’। এই ঠেকে তার দীর্ঘদিনের যাতায়াত। এসব আড্ডায় মোটামুটি সবাই সবার পরিচিতই হয় সচরাচর। সে-রাতের মোচ্ছবে মধ্যমণি এক অপরিচিত যুবক, জুয়ার বোর্ডে টাকা ওড়াচ্ছে দেদার। নতুন কেনা দামি ইয়াশিকা ইলেকট্রো-৩৫ ক্যামেরা দেখাচ্ছে বাকিদের। কিনে এনেছে বিলিতি মদের বোতল, ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। নেশা চড়তেই জড়ানো গলায় হিন্দি গান, ঘুরেফিরে একটাই বারবার, “তদবির সে বিগড়ি হুয়ি তকদির বানা লে, তকদির বানা লে/ আপনে পে ভরোসা হ্যায় তো ইয়ে দাঁও লাগা লে, লাগা লে দাঁও লাগা লে…”। ১৯৫১-য় মুক্তিপ্রাপ্ত গুরু দত্ত পরিচালিত সুপারহিট ছবি ‘বাজি’-র সেই সুপারহিট গান। শচীন দেববর্মণের সুরে গীতা বালির লিপে গীতা দত্তের সেই আশ্চর্য জাদুকরী কণ্ঠে।
গানে অবশ্য সোর্সের মন ছিল না, রুচিও না। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ততক্ষণে সজাগ, এই চ্যাংড়া-টাইপ ছেলেটা এত টাকা পেল কী করে? আর এক পেগ বানানোর মাঝে নেহাতই হালকা চালে প্রশ্ন ছুড়ে দিল অপরিচিত যুবককে, ‘এখানে নতুন দেখছি, কী কাজ করো গুরু তুমি?’ যুবক ততক্ষণে নিরাপদ রকমের মাতাল, উত্তরও দিল হালকা চালেই, ‘পিয়নের কাজ করি বড়লোকের বাড়ি, ও কাজ আর করব না শালা!’
সোর্স-মারফত খবর পেয়ে সেই রাতেই তোলা হল ‘বড়লোকের বাড়ির পিয়নকে’। অপরাধ-জগতে কথিত আছে, লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের ইন্টারোগেশন রুমে ঢুকলে সমস্ত রকম নেশা নিমেষে কেটে যায়। আকণ্ঠ মদ্যপান করে এলেও সংবিৎ ফিরতে সময় লাগে না বিশেষ। নতুন অতিথির ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হল না। ‘আদরযত্ন’ করার আগেই স্বীকারোক্তি এল স্বতঃস্ফূর্ত, ‘স্যার, আমি খোকন গিরি, খেতওয়াত সাহেবের অফিসে পিয়নের কাজ করি। খুন আমি একা করিনি। রাজু, কামিনী আর জগদীশও ছিল স্যার।’
