কৌতূহলী জনতার লাগামছাড়া ভিড় তখন অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে, সামাল দিতে গলদঘর্ম পুলিশ। জটিল কেসে যা সচরাচর হয় কলকাতা পুলিশে, প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে স্থানীয় থানার পুলিশ। গুরুত্ব বুঝে কখনও রহস্যভেদের দায়িত্ব দেওয়া হয় গোয়েন্দা বিভাগকে, কখনও থানার অফিসাররাই তদন্ত চালান। নগরপাল অকুস্থলে দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত নিলেন, এই জোড়া খুনের তদন্ত করবে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট। হোমিসাইড শাখার তৎকালীন সাব-ইনস্পেকটর সুজিত মিত্র তদন্তকারী অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হলেন।
গিরিশবাবুর দেহের পাশে পড়ে থাকা চপ্পল আর গ্লাস, বীণাদেবীর হাউসকোট, ভাঙা আলমারির কাঠের টুকরো এবং ঘটনাস্থলের ডাইনে-বাঁয়ে-সামনে-পিছনের আদ্যোপান্ত খানাতল্লাশি করে তৈরি হল বাজেয়াপ্ত সামগ্রীর নথি। পুলিশি পরিভাষায় ‘seizure list’। মোটামুটি ‘ডেভেলপ’ করার যোগ্য হাতের আর পায়ের ছাপ পাওয়া গেল কিছু, বিভিন্ন মাপের। সংগ্রহ করা হল সযত্নে। লুঠ এবং জোড়া খুনে যে একাধিক ব্যক্তি জড়িত, সেই ধারণা বদ্ধমূল হল গোয়েন্দাদের। খুনি কে বা কারা, সে-সূত্র অবশ্য তখন পর্যন্ত অধরাই।
এখানে ‘রামেশ্বর অ্যাপার্টমেন্টস’-এর একটু বিবরণ প্রয়োজন। ১৯এ, শরৎ বোস রোডের বহুতলটি তৈরি করেছিলেন যুগলকিশোর খেতওয়াত সাতের দশকের শেষাশেষি। খেতওয়াত পরিবারের নানাবিধ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ছিল, তবে গৃহনির্মাণ আর পরিবহণ-ব্যবসাই প্রধান। নিজে সপরিবারে থাকতেন ডুপ্লে ফ্ল্যাটে, দশতলার ১০এ আর এগারোতলার ১১এ মিলিয়ে। একতলায় যুগলকিশোর আর তাঁর ভাই প্রহ্লাদের আলাদা দুটি অফিস ছিল। যথাক্রমে রামেশ্বর ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড এবং ভারত রোডওয়েজ় লিমিটেড। আর ছিল রিসেপশন সেন্টার, কেয়ারটেকারের অফিস এবং একটি কমিউনিটি হল। দুই থেকে দশ, অন্য প্রতিটি তলায় চারটি করে আবাসিক ফ্ল্যাট।
আবাসিকরা সকলেই অর্থবান ছিলেন, সুরক্ষা-সতর্কতায় কার্পণ্য করেননি একটুও। উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা প্রাঙ্গণ, লোহার সূচিমুখ শলাকা পাঁচিল বরাবর। দুটি গেট বাইরে। একটি ঢোকার, অন্যটি বেরনোর। ভিতরেও মজবুত নিরাপত্তা। দুটি সিঁড়ি, একটি আবাসিকরা ব্যবহার করেন, অন্যটি ফ্ল্যাটগুলির স্থায়ী বা অস্থায়ী কাজের লোক, সাফাইকর্মী, ড্রাইভার, দুধওয়ালা, খবরের কাগজ দেওয়ার লোক ইত্যাদি। দুটি স্বয়ংক্রিয় লিফট, সেখানেও একই নিয়ম। আবাসিকদের জন্য একটি, বাকিদের অন্যটি।
সুরক্ষা নিশ্ছিদ্র করতে বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আবাসিকরা। National Security and Detective Agency-র উর্দিধারী রক্ষীরা তিন শিফটে পাহারায় থাকতেন চব্বিশ ঘণ্টা। ঢোকা-বেরনোর গেটে তো বটেই, বেসমেন্টের পার্কিং স্পেসে এবং একতলার রিসেপশনে সতর্ক প্রহরা ছিল। ইন্টারকমে রিসেপশনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল প্রতিটি ফ্ল্যাটের।
নিয়ম ছিল, পরিচিত আবাসিক বা কর্মী অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি বা লিফটে উঠলে নিরাপত্তারক্ষীরা কোনওরকম বাধা দেবেন না। পরিচিতের সঙ্গে অপরিচিত কেউ থাকলেও নয়। সম্পূর্ণ অপরিচিত কেউ ঢুকলে আটকানো হবে রিসেপশনে। নাম কী, কোন ফ্ল্যাটে যেতে চান, কী প্রয়োজন ইত্যাদি জেনে ইন্টারকমে যোগাযোগ করা হবে সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটে। সবুজ সংকেত পেলে তবেই লিফট বা সিঁড়িতে ওঠার অনুমতি মিলবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটে ছিল ইয়েল লক, আইহোল আর কলিং বেল।
এত কিছু, তবু খুন হয়ে গেলেন নওলাখা-দম্পতি! আজকের নিরিখে ভাবলে মনে হয়, সবই ছিল, শুধু সিসিটিভি-র ব্যবস্থাটা যদি থাকত! এখন শুধু অভিজাত এলাকায় বা ঝাঁ-চকচকে শপিং মলেই নয়, সিসিটিভি লাগানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ছোট-বড় অসংখ্য আবাসনে ক্যামেরা লাগিয়েছেন নিরাপত্তা-সচেতন শহরবাসী। এতে অপরাধীকে চিহ্নিত করতে সুবিধে হয় আমাদের, ক্যামেরা আছে আন্দাজ করতে পারলে অবচেতনে একটা ভয়ও কাজ করে দুষ্কৃতীদের। এই সুবিধেটা থাকলে আলোচ্য জোড়া খুনের কিনারা নিশ্চিত সহজতর হত, মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হত না গোয়েন্দাদের।
মাথার ঘাম পায়ে ফেলার পর্বে ঢোকার আগে বলে নেওয়া ভাল, দু’তলা থেকে দশতলা, স্থায়ী গৃহকর্মীদের জন্য কোয়ার্টার ছিল প্রতি ফ্লোরেই। দশতলায় চারটি ফ্ল্যাটে ১০সি-র নওলাখা পরিবার ছাড়া থাকতেন ১০এ-তে খেতওয়াতরা, ১০বি আর ১০ডি-তে যথাক্রমে রাজেশ মেহতা আর দীপক মোঘানির পরিবার। নওলাখাদের তিনজন স্থায়ী কাজের লোক ছিলেন। প্রতিমা, যাঁর কথা শুরুতে বলেছি, মনিকা এবং শম্ভু। তিনজনই নির্দিষ্ট কোয়ার্টারে থাকতেন দশতলাতেই।
ময়নাতদন্ত সাঙ্গ হল বড়দিনের বিকেলেই। শ্বাসরোধ করেই খুন। দম্পতির মৃত্যুর আনুমানিক সময় রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে।
জিজ্ঞাসাবাদ দিয়ে শুরু হল তদন্ত। গিরিশবাবু বা বীণাদেবী, যে-ই দরজা খুলে থাকুন, পরিচিত না হলে নিশ্চয়ই খুলতেন না। আইহোলে দেখেছেন চেনা মুখ, অতএব খুলেছেন। সে বাসিন্দাই হন বা কর্মী, আবাসিকের কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা অবশ্যম্ভাবী অপরাধের নেপথ্যে। পুলিশি পরিভাষায় যাকে বলে ‘insider job’। ৩৬টি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা, যাঁরা সে-রাত্রে ছিলেন বা ছিলেন না, সমস্ত স্থায়ী-অস্থায়ী গৃহকর্মী, বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাটির লোকজন, জেরা থেকে বাদ গেলেন না কেউ। চলল বড়দিনের রাতভর, তার পরের দিনও লাগাতার। কিন্তু বিধি বাম, শত চেষ্টাতেও ভরসাযোগ্য সূত্র মিলল না। কেউ স্বীকার করলেন না কিছু, এগোনোর মতো খড়কুটোও এল না হাতে। কেউ না কেউ মিথ্যে বা অর্ধসত্য বলছিলেন, এটা আন্দাজ করা যাচ্ছিল। কিন্তু প্রমাণহীন আন্দাজ খুনের তদন্তে মূল্যহীন।
