ঠিকই। অপরাধীরা শয়তানের প্রতিরূপ তো ছিলই, না হলে তরতাজা এক কিশোরকে ওভাবে খুন করে ভাসিয়ে দেওয়া যায় গঙ্গাবক্ষে? তবে তার চেয়েও বেশি বোকা ছিলেন দেবাশিস-বিজন| যদি প্রথম বারের মুক্তিপণের টাকায় সন্তুষ্ট থাকতেন, আশি হাজার পাওয়ার পরও বেসামাল লোভে যদি আর ফোন না করতেন আগরওয়াল পরিবারে, ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল শূন্য। কে ধরত, কীভাবে ধরত, সূত্র পেত কোথায়? খুনের চিত্রনাট্য-সংলাপ-পরিচালনা অজানাই থেকে যেত, পুলিশও একটা সময় উৎসাহ হারিয়ে ফেলত কূলকিনারা না পেয়ে, অদৃষ্টকে শাপশাপান্ত করা ছাড়া আর কী-ই বা করার থাকত অনুরাগের আত্মীয়-পরিজনের, আর দিব্যি ঘুরে বেড়াত খুনিরা। নিরাপদে, নিরুপদ্রবে।
এমনই হয়। কখনও অতিচালাকি, কখনও অতিলোভ কাল হয়ে দাঁড়ায় অপরাধীর।
ধর্মের কল। বাতাসে তো নড়বেই।
১.০৬ করুণাধারায় এসো
[নওলাখা হত্যামামলা
তদন্তকারী অফিসার সুজিত মিত্র]
এমন তো হওয়ার কথা নয়, আগে কখনও হয়নি!
সকাল সাড়ে আটটা হবে তখন। রোজকার মতো প্রতিবেশী দম্পতির ফ্ল্যাটের বেল বাজালেন মিস্টার খেতওয়াত। অন্যদিন একবার বাজালেই হয় মিস্টার নওলাখা দরজা খুলে দেন, নয় মিসেস নওলাখা। সকালের চা-বিস্কুট প্রায় রোজই নওলাখা পরিবারের সঙ্গেই খান যুগলকিশোর খেতওয়াত। বছরভর একই রুটিন। এদিন হঠাৎ অন্যথা, টানা বেল বাজিয়ে গেলেও কোনও সাড়াশব্দ নেই কেন? কী এমন হল? শরীর খারাপ? যদি হয়-ও, একসঙ্গে দু’জনের? নাহ, গোলমাল লাগছে।
সাধারণত পৌনে ন’টা থেকে ন’টার মধ্যে রোজকার গৃহকর্মীরা চলে আসেন নওলাখা-দম্পতির ফ্ল্যাটে। সবার আগে আসেন প্রতিমা। দীর্ঘদিন কাজ করছেন এ বাড়িতে, খুবই বিশ্বাসী। ফ্ল্যাটের একটি ডুপ্লিকেট চাবিও তাঁর কাছে রাখা থাকে, কখনও যদি মালিক-মালকিনের অনুপস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজন হয় ঘর খোলার।
প্রতিমা এলেন, দরজার বাইরেই অপেক্ষা করছিলেন উদ্বিগ্ন মিস্টার খেতওয়াত। আর এক প্রস্থ বেল বাজানোতেও যখন দরজা খুলল না, ব্যবহার করা হল ডুপ্লিকেট চাবি। ভিতরের দৃশ্য মর্মান্তিক, বীভৎসও বলা চলে। পুলিশে খবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে মিনিটখানেকও লাগল না অন্য আবাসিকদের।
ভবানীপুর থানার ঘটনা, প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে। কেস নম্বর ৫৬৩, তারিখ ২৫/১২ /৯১, ধারা ১২০ বি/ ৩০২/ ৩৯৪ /৩৪ আইপিসি। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, খুন, লুঠ করতে গিয়ে ইচ্ছাকৃত কাউকে আঘাত করা এবং একই অপরাধের উদ্দেশ্যে একাধিকের সম্মিলিত পরিকল্পনা।
শরৎ বোস রোডের উপর এগারো তলার অভিজাত বহুতল ‘রামেশ্বর অ্যাপার্টমেন্টস’। সেন্ট জনস ডায়াসেশন স্কুলের লাগোয়াই প্রায়। দশতলায় ফ্ল্যাট নম্বর ১০সি-তে থাকতেন নওলাখা-দম্পতি। যাঁদের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হল দরজা খোলার পর। প্রশস্ত ফ্ল্যাট, ঢুকেই একটা বড় হলঘর। দুটো বেডরুম, অ্যাটাচড বাথ সহ। একটা গেস্টরুম। রান্নাঘর যেমন থাকে তেমন। হলঘরের একটা দিক ডাইনিং রুম হিসেবে ব্যবহার হত। আর এক কোণায় ছোট্ট একফালি জায়গায় পার্টিশন করে লাইব্রেরি-কাম-স্টাডিরুম। সম্পন্ন পরিবারে যেমন হয়, ফ্ল্যাট জুড়ে দামি আসবাবপত্র সাজানো-গোছানো পরিপাটি।
গিরিশকুমার নওলাখার (৫৯) নিথর দেহ পড়ে আছে স্টাডিরুমের কার্পেটের উপর। পাজামা-পাঞ্জাবি শরীরে। গলায় একটি দামি শাল দিয়ে ফাঁস দেওয়া। নাকমুখ দিয়ে চুঁইয়ে পড়েছে রক্তবিন্দু। সন্দেহ নেই কোনও, শ্বাসরোধ করে খুন। একজোড়া পুরনো ফুটিফাটা চপ্পল, যা দৃশ্যতই গিরিশবাবুর হতে পারে না, পড়ে আছে মৃতদেহের পাশে। একটু দূরে একটি খালি গ্লাস।
বীণা নওলাখার (৫৫) প্রাণহীন দেহ দুটি বেডরুমের একটিতে, পড়ে আছেন উপুড় হয়ে। প্রায় বিবস্ত্রা, রাতপোশাকটি ছিন্নভিন্ন। চোখেমুখে আঘাতের চিহ্ন, রক্তপাতও হয়েছে একটু। পেটের নীচে একটি বালিশ। গলায় শাড়ি দিয়ে ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করেছে আততায়ী বা আততায়ীরা। শাড়ির একটি প্রান্ত গলায় জড়ানো, অন্যপ্রান্ত বাঁধা সিলিংফ্যানে। মৃতার হাউসকোট ভাসছে লাগোয়া বাথরুমের কমোডে। হলঘরের টেলিফোন এবং ইন্টারকম সংযোগ-বিচ্ছিন্ন, তার কেটে দিয়েছে যে বা যারা ঢুকেছিল।
রামেশ্বর অ্যাপার্টমেন্ট
এক পুত্র এবং এক কন্যা ছিল নওলাখা-দম্পতির। কন্যা থাকেন ইন্দোরের শ্বশুরবাড়িতে। পুত্র নীলেশ আর পুত্রবধূ অনুরাধা ১১ ডিসেম্বর বেড়াতে গিয়েছিলেন উত্তর ভারতে। ফেরার কথা ছিল ২৪ তারিখ। ফোন করে দিনদুয়েক আগে মা-বাবাকে জানিয়েছিলেন, প্লেনের টিকিট না পাওয়ায় ২৬ তারিখ ফিরবেন। সস্ত্রীক নীলেশ যে ঘরটিতে থাকতেন, সেটি অক্ষত, তালাবন্ধ।
বাকি ঘরগুলি অবশ্য অক্ষত ছিল না। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আসবাবপত্র। ভেঙে তছনছ করা হয়েছে গেস্টরুমের কাঠের আলমারিটি। ইতস্তত পড়ে আছে কাঠের টুকরোটাকরা। বেশ কিছু জিনিসপত্র যে লুঠ হয়েছে, অনায়াসে অনুমেয়।
কেসের তারিখটি শুরুতে লিখেছি, খেয়াল করবেন। ২৫/১২/ ৯১। বড়দিনের সকাল। ক্রিসমাস ইভের নিশিযাপন শেষে একটু দেরি করে ঘুম ভাঙছে কলকাতার। রাস্তাঘাটে মানুষজন, গাড়িঘোড়া কম। দেরি আছে ভিক্টোরিয়া-চিড়িয়াখানা-পার্ক স্ট্রিটে-রেস্তোরাঁ-ক্লাবে জনপ্লাবন শুরু হতে।
দম্পতি-হত্যার জেরে শুভদিনের সকাল অশুভ হয়ে দেখা দিল কলকাতা পুলিশের কাছে। প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তৎকালীন নগরপাল, খবর পেয়ে দ্রুত এলেন ঘটনাস্থলে। এলেন ডিসি ডিডি (গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান)। ভবানীপুর থানার পুলিশ এবং গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড শাখার অফিসারেরা ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছেন। লালবাজার কন্ট্রোল রুম খবর পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট সবাইকে বার্তা দিয়েছে দ্রুত, “couple found murdered in Sarat Bose Road apartment, reach the spot at the earliest.”
