আপনি এই মামলায় পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন আপনার প্রতি কি কোনও দৈহিক বা মানসিক অত্যাচার হয়েছে? দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন থাকলে দেখাতে পারেন।
আপনি দোষ স্বীকারে বাধ্য নন, আবার বলছি। তবু যদি চান স্বীকার করতে, চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি আবার ভেবে দেখার। তারপরও যদি স্বীকারোক্তি দিতে চান, লিপিবদ্ধ করব।
দেখতেই পাচ্ছেন, এজলাসে পুলিশ নেই। অনুরোধ, যা বলবেন, সত্যি বলবেন এবং স্বেচ্ছায় বলবেন। যদি স্বীকারোক্তির ব্যাপারে মত পরিবর্তন করেন, জানাবেন কাল, চব্বিশ ঘণ্টা ভেবে দেখার পর। আপনার মতই গ্রাহ্য হবে।’
উপরে যা যা পড়লেন, সবই দেবাশিসকে জিজ্ঞাসা করলেন বিচারক। দেবাশিস অনড় থাকলেন স্বীকারোক্তিতে। “কেন দোষ স্বীকার করছেন”— এর উত্তরে যা বললেন, হুবহু তুলে দিচ্ছি।
—পরিস্থিতি এমন হয়ে গেছে যে আমি যা করেছি তাতে বাইরের জগতে সবাই আমাকে ঘৃণা করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি সাজা না পাই, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কিছুতেই শান্তি পাব না। যখন আমাকে অ্যারেস্ট করে আমার বাড়ি নিয়ে যায়, তখন আমার মা বলেছিলেন, এর থেকে যদি মরার খবর শুনতাম তা হলে খুশি হতাম। আমি যা অন্যায় করেছি তার সাজা আমি পেতে চাই।
দেবাশিস শুধু নন, গোপাল এবং ভোদাও স্বীকারোক্তি দিল আদালতে।
তদন্তকারী অফিসার দুলালবাবু তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজটা করলেন অসামান্য। ঘটনাপ্রবাহ নিখুঁত উঠে এল চার্জশিটে। বিরল মামলা, শুরুতে লিখেছি। অপহরণ এবং হত্যার কেস অনেক হয়েছে এদেশে। আলোচ্য মামলা বিরল, কারণ দেহই পাওয়া যায়নি খুন হওয়া অপহৃতের। পুলিশি পরিভাষায়, ‘corpus delicti’, অর্থাৎ ‘body of crime’-ই মেলেনি। লাতিন শব্দবন্ধ, সোজা বাংলায়, অপরাধ যে আদৌ ঘটেছে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। একজন নিখোঁজ হয়ে গেল এবং আর খুঁজে পাওয়া গেল না। দেহ না পাওয়া পর্যন্ত কী করে প্রমাণ হবে যে নিখোঁজ নিহত হয়েছে?
এই যুক্তিতেই তর্ক সাজালেন অভিযুক্তদের আইনজীবী।
‘Corpus Delicti’ ছাড়াই খুনের ঘটনা প্রমাণ এবং অপরাধীদের শাস্তিদানের নজির আছে অতীতে। খুব অল্পসংখ্যক মামলায়। তদন্তকারী অফিসারের পক্ষে কাজটা ছিল অসম্ভব কঠিন, অক্সিজেন মাস্ক ছাড়াই দুর্গম পাহাড়ে চড়ার মতোই। আদালতে দেবাশিস-ভোদা-গোপালের দেওয়া জবানবন্দি ছিল, কিন্তু শুধু তার ভিত্তিতে অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করতে প্রয়োজন ছিল ওই জবানবন্দির প্রতিটি দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ( circumstantial evidence) মাধ্যমে নিখুঁত উপস্থাপনার। যাতে ঘটনার শুরু থেকে শেষ, ফাঁক না থাকে কোনও, বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় তর্কাতীত।
অনুরাগের ব্যাগ থেকে যা যা নিয়েছিল যে যে, উদ্ধার হল সব। ঘটনার দিন হাওড়ার লঞ্চঘাটে দেবাশিস ও বিজন যে এক কিশোরকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বেশ কিছুক্ষণ, তার সমর্থন পাওয়া গেল এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে। তিনজনের ছবি জেটির সমস্ত কর্মীদের বারবার দেখানোর পর। বস্তাবন্দি দেহ নিয়ে চারজন যখন গঙ্গার পথে সে-রাতে, মাঝরাস্তায় দেখে ফেলেছিলেন একটি স্থানীয় গ্যারেজের দুই কর্মী। যাঁরা গাড়ি সারাচ্ছিলেন ল্যাম্পপোস্টের আলোয়। যাঁদের কৌতূহলী দৃষ্টি নজরে পড়ায় ভোদা ধমকেছিল, ‘মুখ বাড়িয়ে দেখা বার করে দেব হারামজাদা! বেশি চালাক, না?’ সেই দুই কর্মী বয়ান দিলেন।
বয়ান দিলেন দারোয়ান ভগবতীও, ধরে আনা হল বিহারের বাড়ি থেকে| যাকে ঘটনার পর ভোদা বলেছিল, ‘তুনে বহুত কুছ দেখ লিয়া| ভাগ যা ইহাঁসে, নেহি তো খালাস কর দেঙ্গে।’
গুদামের ভিতর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল বেশ কিছু পায়ের ছাপ, যার অধিকাংশই ‘ডেভেলপ’ করা যায়নি| কিছু অবশ্য ‘ডেভেলপ’ করা গিয়েছিল, যা মিলে গিয়েছিল দেবাশিসের পায়ের ছাপের সঙ্গে।
শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াও চলল বিচারপর্বে, আইনের ভাষার ‘Test Identification Parade’। যাতে অংশ নিল অনুরাগের বন্ধু সমীর প্যাটেল, চিনিয়ে দিল মেট্রো স্টেশনে আলাপ হওয়া দেবাশিসকে। যে দোকানগুলি থেকে কেনা হয়েছিল লিউকোপ্লাস্ট, Pethidine এবং air purifier mask, তার কর্মচারীরাও শনাক্ত করলেন দেবাশিস-বিজনকে।
সিটি সেশনস কোর্টের বিচারক ৭৭ জন সাক্ষীর বয়ান নথিবদ্ধ করলেন। দেবাশিস-গোপাল-অশোকের আদালতে স্বীকারোক্তি এবং সমস্ত তথ্যপ্রমাণ বিবেচনা করে ’৯১-এর ১৪ ডিসেম্বর রায় দিলেন। পাঁচ অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা ঘোষণা হল যাবজ্জীবন কারাবাসের। আবেদন দাখিল হল হাইকোর্টে। শুনানি চলাকালীনই, এগারো বছর কারাবাসের পর নিম্ন আদালত থেকে জামিন পেয়েছিল বিজন বড়ুয়া বাদে বাকি চারজন। সে জামিন নাকচ করে দিল হাইকোর্ট। যাবজ্জীবন কারাবাসের রায় বহাল রেখে আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ জারি হল জামিনে মুক্ত চারজনের উপর।
রায়ে বিচারপতিরা লিখলেন, “We are of the considered view that prosecution successfully established a complete chain of circumstances from its oral and documentary evidence which taken as a whole unerringly established the guilt of each and every appellant.”
Robert Louis Stevenson তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস ‘Kidnapped’-এ লিখছেন, “I have seen wicked men and fools, a great many of both; and I believe they both get paid in the end; but fools first.” (দু’ধরনের লোকই দেখেছি আমি। শয়তান আর বোকা, দুই-ই দেখেছি অনেক| উভয়কেই মূল্য চোকাতে হয়। তবে আগে বোকাদের)|
